আপনিও ‘গ্লাস স্কিন’ চান? টিকটকের টিপস মানার আগে যা জানা জরুরি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘গ্লাস স্কিন’ বা কাচের মতো মসৃণ ও উজ্জ্বল ত্বক পাওয়ার ট্রেন্ড ব্যাপক জনপ্রিয়। বিশেষ করে টিকটকে কোরিয়ান স্কিনকেয়ার রুটিন অনুসরণ করে এমন ত্বক পাওয়ার নানা পরামর্শ ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এসব ভিডিও দেখে চোখ বন্ধ করে স্কিনকেয়ার রুটিন অনুসরণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা।
ইউরোপিয়ান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি অ্যান্ড ভেনেরিওলজির গবেষকেরা কোরিয়ান স্কিনকেয়ার ও ‘গ্লাস স্কিন’ নিয়ে টিকটকে প্রকাশিত ৩৮টি ভিডিও বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৯৫ শতাংশ ভিডিওতেই অন্তত একটি সম্ভাব্য বিভ্রান্তিকর দাবি ছিল।

গবেষণার প্রধান লেখক ড. মারিয়া লুসিয়া পায়সানো বলেন, ভিডিওগুলোতে ত্বকের যত্নের মৌলিক নিরাপত্তা বিষয়ক তথ্যের অনুপস্থিতির বিষয়টি গবেষকদের বিশেষভাবে অবাক করেছে। ৩৮টি ভিডিওর মধ্যে মাত্র একটি ভিডিওতে ত্বকে জ্বালাপোড়ার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছিল। মাত্র দুটি ভিডিওতে সানস্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে বলা হয়। কোনো ভিডিওতেই কনট্যাক্ট ডার্মাটাইটিসের ঝুঁকি কিংবা প্রয়োজনে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
ত্বকের ধরনও বিবেচনায় নেয়নি বেশিরভাগ ভিডিও
গবেষণার জন্য গবেষকেরা এমন একটি নতুন টিকটক অ্যাকাউন্ট তৈরি করেন, যাতে প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমের প্রভাব যতটা সম্ভব কম থাকে। এরপর কোরিয়ান স্কিনকেয়ার ও ‘গ্লাস স্কিন’ নিয়ে ভিডিও খুঁজে সেগুলো বিশ্লেষণ করা হয়।
দেখা যায়, প্রায় ৮৪ শতাংশ ভিডিওতেই বিভিন্ন ধরনের ত্বকের পার্থক্য বিবেচনা করা হয়নি। আবার ৪৫ শতাংশ ভিডিওতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নির্দেশনা ছাড়াই একাধিক অ্যাকটিভ উপাদান একসঙ্গে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩২ শতাংশ ভিডিওতে ‘তাৎক্ষণিক ফল’ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণ করা কোনো ভিডিওই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের তৈরি ছিল না। এমনকি কোনো ভিডিওতেই বাইরের সূত্র বা তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়নি। ভিডিওগুলোর প্রায় ৮২ শতাংশ তৈরি করেছিলেন ইনফ্লুয়েন্সাররা, ১১ শতাংশ ছিল প্রসাধনী ব্র্যান্ডের এবং বাকি ভিডিওগুলো তৈরি করেছিলেন অন্যান্য বিউটি কনটেন্ট ক্রিয়েটররা।

ড. পায়সানোর ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের কনটেন্টের জনপ্রিয়তার সঙ্গে তথ্যের মানের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে। ব্যক্তিগত ত্বকের ধরন বা সমস্যা বিবেচনা না করে এসব রুটিন অনুসরণ করলে ত্বকে জ্বালাপোড়া, অতিরিক্ত এক্সফোলিয়েশন, ব্রণ বেড়ে যাওয়া এবং ত্বকের প্রাকৃতিক প্রতিরোধী স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি টিকটকের
তবে গবেষণাটির পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে টিকটক কর্তৃপক্ষ। তাদের এক মুখপাত্র বলেন, প্রতিদিন লাখ লাখ ভিডিও প্রকাশিত হওয়া একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে মাত্র ৩৮টি ভিডিও বিশ্লেষণ করে পুরো টিকটক কনটেন্ট সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রতিনিধিত্বমূলক নয়।
টিকটকের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, তারা ক্ষতিকর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ভুল তথ্য সরাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে এবং বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও তথ্য যাচাইকারী সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করে বিশ্বাসযোগ্য কনটেন্ট প্রচারে কাজ করছে।
ভাইরাল স্কিনকেয়ারে বাস্তবেও দেখা দিচ্ছে ত্বকের সমস্যা
আরেকটি গবেষণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া স্কিনকেয়ার পরামর্শ অনুসরণ করে ত্বকের নতুন সমস্যা তৈরি হওয়া বা আগের সমস্যা বেড়ে যাওয়ার ৯৪ জন রোগীকে নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে।
এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমস্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল AHA বা BHA-যুক্ত কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েন্ট। ৩৪ শতাংশ ক্ষেত্রে এসব পণ্যের ব্যবহার পাওয়া গেছে। এরপর ছিল ওভার-দ্য-কাউন্টার রেটিনয়েড ২৭ শতাংশ, ভিটামিন সি সিরাম ১৪ শতাংশ এবং নিয়াসিনামাইড ১১ শতাংশ।
প্রায় ৪৮ শতাংশ রোগী জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো কনটেন্ট দেখেই তারা নতুন করে সম্পূর্ণ একটি স্কিনকেয়ার রুটিন শুরু করেছিলেন। ৬৩ শতাংশ রোগী একই রুটিনে তিনটির বেশি অ্যাকটিভ উপাদান ব্যবহার করছিলেন।
দ্বিতীয় গবেষণার প্রধান লেখক ড. ওয়িসাল হরমি বলেন, সমস্যাটি শুধু এসব পণ্যের জনপ্রিয়তায় নয়, বরং এগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিতেও। চিকিৎসাবিদ্যায় প্রশিক্ষণ না থাকা ইনফ্লুয়েন্সারদের পরামর্শ অনুসরণ করে অনেকেই একই সময়ে একাধিক অ্যাকটিভ উপাদান ব্যবহার করছেন।
ডার্মাটাইটিস ও ব্রণই বেশি দেখা গেছে
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ইরিট্যান্ট কনট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস—৪২ শতাংশ ক্ষেত্রে। এরপর ছিল ব্রণ ২৮ শতাংশ, রোসেশিয়া বা রোসেশিয়ার মতো ডার্মাটাইটিস ১২ শতাংশ, প্রদাহ-পরবর্তী হাইপারপিগমেন্টেশন ১১ শতাংশ এবং ত্বকের উপরিভাগে কেমিক্যাল বার্ন ৭ শতাংশ।
ড. হরমির মতে, একাধিক অ্যাকটিভ উপাদান একসঙ্গে ব্যবহার করলে ত্বকের প্রতিরোধী স্তরের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ কিছু উপাদানের জ্বালাপোড়া সৃষ্টির প্রভাব একে অপরের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, কোনো স্কিনকেয়ার রুটিন ভাইরাল হলেই সেটি সবার জন্য নিরাপদ, কার্যকর বা উপযোগী—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, সমস্যাটি কোরিয়ান স্কিনকেয়ারে নয়। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সবার জন্য একই ধরনের রুটিন এবং একসঙ্গে অতিরিক্ত অ্যাকটিভ উপাদান ব্যবহারের প্রবণতাই বেশি উদ্বেগের।
বিশেষ করে যেসব ভিডিওতে ‘তাৎক্ষণিক ফল’ বা সবার জন্য একই ফল পাওয়ার দাবি করা হয়, সেগুলো অনুসরণ করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারও আগে থেকেই ত্বকের সমস্যা থাকলে, নতুন কোনো পণ্য ব্যবহারের পর জ্বালাপোড়া বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে কিংবা কোনো রুটিন নিজের ত্বকের জন্য উপযোগী কি না তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।



