চলন্ত বাসে সন্তান প্রসব, আজীবন ভ্রমণ ‘ফ্রি’

গ্রামের বাড়িতে ফেরার পথেই হঠাৎ শুরু হয় প্রসববেদনা। গন্তব্য তখনও অনেক দূর। হাসপাতালে পৌঁছানোর সুযোগও নেই। শেষ পর্যন্ত চলন্ত বাসটিই হয়ে ওঠে প্রসূতির জন্য অস্থায়ী প্রসূতিসেবা কেন্দ্র। নারী যাত্রীদের সহায়তায় বাসের ভেতরেই জন্ম নেয় এক ফুটফুটে ছেলে শিশু। আর সেই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে শিশুটির নাম রাখা হয় বাসটির নামের সঙ্গে মিলিয়ে—‘আনাস হাসান’।
ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের বুড়িমারীগামী ‘আনাস এন্টারপ্রাইজ’ পরিবহনের একটি বাসে। গত শনিবার ভোররাতে রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকায় চলন্ত বাসে সন্তান প্রসব করেন আবেদা বেগম (২৮) নামে এক নারী।
আবেদা বেগম সাভারের জিরানী এলাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য সময়ের তখনও প্রায় ২০ দিন বাকি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করেই বাবা-মায়ের সঙ্গে লালমনিরহাটের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে বাসে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু পথেই বদলে যায় সব হিসাব। বাসটি মিঠাপুকুর এলাকায় পৌঁছানোর পর হঠাৎ তীব্র প্রসববেদনা শুরু হয় আবেদার। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বাস থামিয়ে পুরুষ যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর নারী যাত্রীদের সহায়তায় বাসের ভেতরেই সন্তান প্রসব করেন তিনি। কিছুক্ষণ পরই শোনা যায় নবজাতকের কান্না। অপ্রত্যাশিত এই ঘটনার পর বাসের যাত্রীদের মধ্যেও তৈরি হয় স্বস্তির আবহ। মা ও নবজাতক দুজনেই সুস্থ থাকায় বাসের মধ্যেই মিষ্টি বিতরণ করা হয়।
আবেদার বাবা আবেদ আলী জানান, চিকিৎসক বলেছিলেন সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য সময় আরও প্রায় ২০ দিন পর। সে কারণে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন তিনি। কিন্তু পথেই বাসের মধ্যে নাতির জন্ম হয়। বাসের ভেতর জন্ম নেওয়ার ঘটনাটিকে স্মরণীয় করে রাখতে পরিবহনের নামের সঙ্গে মিল রেখেই শিশুটির নাম রাখা হয়েছে ‘আনাস হাসান’। শিশুটির জন্মের খবর পৌঁছে যায় ‘আনাস এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক আলহাজ্ব দিপুর কাছেও। বিষয়টি জানার পর তিনি শুধু শুভেচ্ছা জানিয়েই থেমে থাকেননি। নবজাতকের জন্য পাঠিয়েছেন নানা উপহার। গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) পরিবহনের সুপারভাইজার মজনু মিয়ার মাধ্যমে শিশুটির বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় একটি দোলনা, বেবি বেড, মশারি ও প্রসাধনী সামগ্রী।
এর পাশাপাশি শিশুটির জন্য দেওয়া হয়েছে আরও বিশেষ একটি উপহার—আজীবন ওই পরিবহনে বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগ।
বাসটির সুপারভাইজার মজনু মিয়া বলেন, ঢাকা জিরানী থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে ওই অন্তঃসত্ত্বা নারী বাসে উঠেছিলেন। রাত প্রায় ৩টার দিকে মিঠাপুকুর এলাকায় তিনি সন্তান প্রসব করেন। পরে বিষয়টি পরিবহনের মালিককে জানানো হলে তিনি নবজাতকের আজীবন বিনা ভাড়ায় চলাচলের ব্যবস্থা করার ঘোষণা দেন।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ফকিরপাড়া ইউনিয়নের রমনীগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা আবেদা বেগমের পরিবারে তাই এই সন্তান যেন শুধু নতুন সদস্য হয়েই আসেনি, সঙ্গে নিয়ে এসেছে একটি স্মরণীয় গল্পও। যে বাসে যাত্রা শুরু হয়েছিল গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে, সেই বাসই হয়ে উঠেছে তার জন্মের সাক্ষী।
ফকিরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজল রহমান খোকন জানান, ইউপি সদস্যের মাধ্যমে তিনি ঘটনাটি জেনেছেন। বর্তমানে মা ও নবজাতক আনাস হাসান দুজনেই সুস্থ রয়েছেন।



