আজ বিশ্ব হার্ট দিবস: হৃদরোগ ঠেকাতে সচেতনতাই প্রথম প্রতিরোধ

মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি হৃদযন্ত্র। অথচ অনিয়মিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি, ধূমপান ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানা কারণে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি। বাংলাদেশেও হৃদরোগ এখন জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
হৃদস্বাস্থ্য সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং হৃদরোগ প্রতিরোধে উৎসাহিত করতে আজ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব হার্ট দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, হৃদ্রোগসহ কার্ডিওভাসকুলার রোগ বিশ্বে মৃত্যুর প্রধান কারণ। সাম্প্রতিক হিসাবে প্রতি বছর এসব রোগে প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকজনিত মৃত্যুই বড় অংশ। কার্ডিওভাসকুলার রোগে মৃত্যুর ৮৫ শতাংশের সঙ্গে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক জড়িত।
বাংলাদেশেও হৃদরোগের চিত্র উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে স্ট্রোকে মৃত্যুর হার ৮০ দশমিক ২ এবং ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজে মৃত্যুর হার ৫৮ দশমিক ৫। একই তালিকায় হাইপারটেনসিভ হার্ট ডিজিজও মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে রয়েছে।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন (আইএইচএমই)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ৯ লাখ ৯২ হাজার ৭৩৬ জন হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর হৃদরোগে দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ানোর ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এর পাশাপাশি রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ এবং বায়ুদূষণও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেকের ক্ষেত্রেই এটি দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। ফলে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা না করলে অনেকে নিজের উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে জানতে পারেন না। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
WHO-এর বাংলাদেশের হাইপারটেনশন প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে কার্ডিওভাসকুলার রোগে প্রায় ২ লাখ ৭৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এসব মৃত্যুর ৫৪ শতাংশের সঙ্গে উচ্চ সিস্টোলিক রক্তচাপের সম্পর্ক ছিল। একই তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর প্রাপ্তবয়স্কদের গড় লবণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল প্রতিদিন প্রায় ৯ গ্রাম, যা হৃদস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ঝুঁকির বিষয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভ্যাস করা জরুরি। হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা অন্যান্য উপযোগী ব্যায়াম দৈনন্দিন জীবনের অংশ করা যেতে পারে। বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনও বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট সক্রিয় থাকার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমিয়ে শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং পর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকাণ্ড বজায় রাখাও হৃদরোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। WHO-এর মতে, তামাক ব্যবহার বন্ধ করা, লবণ কমানো, ফল ও সবজি বেশি খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে এমন ব্যক্তিদের নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত। বিশেষ করে পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে, ধূমপান করলে, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি। বুকে চাপ বা ব্যথা, বিশেষ করে বুকের মাঝখানে অস্বস্তি, ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা হঠাৎ দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। WHO বলছে, অনেক ক্ষেত্রে রক্তনালির অন্তর্নিহিত রোগের কোনো আগাম লক্ষণ থাকে না এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকই প্রথম প্রকাশ হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, হৃদরোগের বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য। জীবনযাপনের ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ কোলেস্টেরল দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া গেলে হৃদরোগ ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তাই বিশ্ব হার্ট দিবসে শুধু একটি দিনের সচেতনতা নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনযাপনে হৃদস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। নিয়মিত শরীরচর্চা, পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার, ধূমপান পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হতে পারে হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখার গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস।



