বয়স বাড়ার সঙ্গে বন্ধুরা কেন দূরে সরে যায়?

ছোটবেলায় বন্ধুত্বের জন্য আলাদা কোনো পরিকল্পনা করতে হতো না। একই স্কুলে পড়া, একই মাঠে খেলতে যাওয়া, একই পাড়ায় থাকা কিংবা একই শিক্ষকের কাছে পড়তে যাওয়ার সুবাদে বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিদিনই দেখা হয়ে যেত। ফলে সম্পর্কগুলো স্বাভাবিকভাবেই গড়ে উঠত এবং সময়ের অভাবও তেমন অনুভূত হতো না।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন বদলে যায়। কেউ চাকরির কারণে অন্য শহরে চলে যান, কেউ কর্মব্যস্ততায় ডুবে যান, আবার কারও দিনের বড় অংশ কেটে যায় সংসার ও সন্তানকে ঘিরে। ফলে কোনো বড় ঝগড়া বা মনোমালিন্য ছাড়াই প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ কমে যেতে পারে। একসময়ের নিয়মিত দেখা হয়তো নেমে আসে বছরে এক-দুবারে।
বন্ধুত্ব গড়তে সময়ের প্রয়োজন
যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জেফরি হলের ২০১৯ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, পরিচিতি থেকে সাধারণ বন্ধুত্বে যেতে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ ঘণ্টা একসঙ্গে সময় কাটাতে হয়। ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে ৮০ থেকে ১০০ ঘণ্টা। আর কাউকে সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিসেবে গড়ে তুলতে ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এই পরিমাণ অবসর বের করা অনেকের কাছেই কঠিন। চাকরি, পরিবার, ব্যক্তিগত দায়িত্ব এবং নানা ধরনের ব্যস্ততার কারণে একটানা বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটানো যেন বিলাসিতায় পরিণত হয়।
শৈশবের স্বাভাবিক নৈকট্য বড় হয়ে থাকে না
শৈশবের বন্ধুত্বের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো স্বাভাবিক নৈকট্য। প্রতিদিন দেখা হওয়া, একসঙ্গে খেলা কিংবা একই পরিবেশে থাকার কারণে সম্পর্ক গভীর হতে থাকে। তখন বন্ধুত্ব নিয়ে খুব বেশি হিসাব-নিকাশও থাকে না।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সেই স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশটি আর থাকে না। একজনের অফিসের সময়ের সঙ্গে অন্যজনের সময় মেলে না। কেউ সন্তান বা পরিবারের দায়িত্বে ব্যস্ত, কেউ আবার নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। তাই প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে বন্ধুত্ব ধরে রাখতে হলে সম্পর্কটির জন্য সচেতনভাবে সময় বের করতে হয়।
সব বন্ধুত্বের দূরত্বের পেছনে ঝগড়া থাকে না
২০২২ সালে ‘কারেন্ট অপিনিয়ন ইন সাইকোলজি’তে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার পেছনে ব্যক্তিগত, পারস্পরিক ও পরিস্থিতিগত নানা কারণ কাজ করতে পারে।
অনেক সময় বন্ধুত্ব শেষ করার জন্য কোনো সরাসরি সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় না। বরং জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হয়। নতুন চাকরি, সন্তান, শহর পরিবর্তনসহ নানা পরিস্থিতি এর কারণ হতে পারে। অর্থাৎ প্রতিটি বন্ধুত্বের দূরত্বের পেছনে বিশ্বাসঘাতকতা বা মনোমালিন্য থাকা জরুরি নয়।
অনলাইনে যোগাযোগ থাকলেই কি বন্ধুত্ব অটুট থাকে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এখন আগের চেয়ে সহজ। জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানো, ছবিতে লাইক দেওয়া কিংবা মাঝেমধ্যে মেসেজ পাঠানোর মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় থাকে। কিন্তু এসব ডিজিটাল যোগাযোগ সব সময় গভীর সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রতি ছয়জন মানুষের একজন একাকিত্বের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার মধ্যেও মানুষের গভীর সামাজিক সংযোগের প্রয়োজনীয়তা তাই রয়ে গেছে।
বন্ধুর সংখ্যা নয়, সম্পর্কের মান গুরুত্বপূর্ণ
২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত ৩৮টি গবেষণা নিয়ে ২০২৩ সালের একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বন্ধুত্বের মান এবং একসঙ্গে সময় কাটানোর সঙ্গে মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুও শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
এ ছাড়া ২০১০ সালে তিন লাখের বেশি মানুষের তথ্য নিয়ে করা একটি গবেষণায় শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি বেঁচে থাকার সম্ভাবনার সম্পর্ক পাওয়া যায়। এখানেও বিষয়টি বন্ধুর সংখ্যা নয়; বরং সম্পর্ক কতটা শক্তিশালী ও অর্থপূর্ণ, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার উপায় কী?
ভালো বন্ধুত্ব নিজে থেকেই সব সময় টিকে থাকবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। ব্যস্ত জীবনে সম্পর্ক ধরে রাখতে সচেতন উদ্যোগ দরকার।
বন্ধুকে ফোন করা, নির্দিষ্ট দিনে দেখা করার পরিকল্পনা করা, মাসে একবার একসঙ্গে সময় কাটানো কিংবা ব্যস্ততার মধ্যেও কয়েক মিনিট খোঁজ নেওয়ার মতো ছোট ছোট উদ্যোগ সম্পর্ককে সক্রিয় রাখতে পারে।
তবে সব বন্ধুত্ব যে সারাজীবন একইভাবে থাকবে, এমনটাও নয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের পথ বদলে যায়, অগ্রাধিকার বদলে যায়, সম্পর্কের ধরনও বদলে যেতে পারে।
জীবনকে যদি দীর্ঘ এক যাত্রা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সেখানে কিছু মানুষ শুরু থেকেই পাশে থাকেন, কেউ থাকেন মাঝপথে, আবার কেউ কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পর্যন্ত সঙ্গ দেন। পথ আলাদা হয়ে গেলেও সেই সম্পর্কের গুরুত্ব কিংবা একসঙ্গে কাটানো সময়ের মূল্য কমে যায় না।



