বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
স্বাস্থ্য

চিকিৎসকদের নতুন আতঙ্ক রেজিস্ট্যান্স: শিশুদের শরীরে কাজ করছে না ৯৬% অ্যান্টিবায়োটিক, ভরসা শুধু দুই ওষুধ

asdfgh

বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠার সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (পিআইসিইউ) পরিচালিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য- চিকিৎসাধীন শিশুদের শরীরে ব্যবহৃত প্রায় ৯৬ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকই আর কার্যকর নয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক যে গুরুতর সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় চিকিৎসকদের হাতে কার্যকর বিকল্প হিসেবে এখন মাত্র দুটি অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্ট রয়েছে- টাইজেসাইক্লিন ও কলিস্টিন। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতে কলিস্টিনের বিরুদ্ধেও জীবাণুর প্রতিরোধ গড়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে পিআইসিইউতে ভর্তি ৪৯ জন শিশুর শরীর থেকে সংগৃহীত জীবাণুর নমুনা বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ৩০টি ছিল গ্রাম-নেগেটিভ এবং ১৯টি গ্রাম-পজিটিভ জীবাণু। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, এপ্রিল মাসে শনাক্ত হওয়া সব গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণুই প্রথম সারির ছয়টি প্রধান অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে শতভাগ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেন রামেক হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামালের নেতৃত্বাধীন একটি দল। সহগবেষক ছিলেন ডা. ওয়াহিদা খাতুন, ডা. নাসরিন সুলতানা, ডা. সুলতানা আক্তার, ডা. শামীমা নাসরিন ও ডা. সিরাজুম মুনির। গবেষণা প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে ‘জার্নাল অব টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এ।

Advertisements

গবেষণায় সবচেয়ে বেশি সংক্রমণের জন্য দায়ী হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ‘অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি কমপ্লেক্স’, যা মোট সংক্রমণের ২৪.৫ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ‘ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া’ এবং ‘স্ট্যাফাইলোকক্কাস হিমোলিটিকাস’। এছাড়া ই. কোলাই, সুডোমোনাস ও এলিজাবেথকিংগিয়ার মতো বিপজ্জনক জীবাণুর উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।

অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারানোর চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে বিভিন্ন বহুল ব্যবহৃত ওষুধে। গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণুর বিরুদ্ধে ইমিপেনেমের প্রতিরোধের হার ৯৬.৭ শতাংশ, মেরোপেনেম ও পাইপেরাসিলিন-টাজোব্যাক্টামের ক্ষেত্রে ৯৬.৪ শতাংশ, সিপ্রোফ্লক্সাসিনে ৯০ শতাংশ এবং জেন্টামাইসিনে ৮৯.৩ শতাংশ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে গ্রাম-পজিটিভ জীবাণুর ক্ষেত্রে লাইনেজলিড, ড্যাপটোমাইসিন ও টাইজেসাইক্লিন এখনো কার্যকর থাকলেও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে টেইকোপ্লানিন। এই গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেও ১৫.৮ শতাংশ জীবাণু ইতোমধ্যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পূর্বে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা শিশুদের মধ্যে মাল্টিপল ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট (এমডিআর) জীবাণুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্য শিশুদের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি। এসব শিশুর সুস্থ হয়ে উঠতেও দ্বিগুণ সময় লাগছে। যেখানে সাধারণ সংক্রমণে একটি শিশু গড়ে ছয় দিনে সুস্থ হয়, সেখানে এমডিআর সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে সময় লাগছে প্রায় ১৪ দিন। গবেষকদের মতে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ, অপ্রয়োজনীয়ভাবে ওষুধ ব্যবহার, দীর্ঘ সময় ভেন্টিলেশনে থাকা এবং দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার মতো কারণগুলো এই সংকটকে আরও তীব্র করছে। যদিও গবেষণাটি মাত্র একটি হাসপাতাল ও ৪৯ জন শিশুর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে, তবুও ফলাফল দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গবেষকেরা অকারণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ, হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, শেষ ধাপের অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সীমিত করা এবং জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

গবেষণা দলের প্রধান ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেছেন, শিশুদের শরীরে ওষুধ কাজ না করার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এই গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো শিশুদের এমন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা, যাতে তারা সংক্রমণ ও অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ঝুঁকি থেকে দূরে থাকতে পারে।

Advertisements
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সআতঙ্কওষুধরাজশাহী মেডিকেল কলেজশিশু