দেশ কাঁদানো রামিসা হ’ত্যাকা’ণ্ড: দ্রুত বিচারে সোহেল ও স্বপ্নার মৃ’ত্যুদ’ণ্ড

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার বহুল আলোচিত মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রোববার ঢাকার মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ এবং স্বপ্না আক্তারকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এই অর্থ ভুক্তভোগী রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীদের প্রদান করা হবে। অর্থদণ্ড আদায় না হলে আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রিরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে ছিল কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও দায়িত্ব পালন করেন। সকালেই দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয় এবং বেলা ১১টার দিকে বিচারক রায় পাঠ শুরু করেন।
গত ১৯ মে পল্লবীর একটি বাসায় ঘটে যায় দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিবেশী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কৌশলে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে নিজেদের বাসায় নিয়ে যায়। পরে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করে মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে খণ্ড-বিখণ্ড করার চেষ্টা চালানো হয়।
পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে খুঁজতে গিয়ে সন্দেহজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। একপর্যায়ে দরজা ভেঙে বাসায় প্রবেশ করলে তারা রামিসার নিথর দেহ উদ্ধার করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বপ্না আক্তারকে আটক করে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় পালিয়ে যাওয়া সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে। মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম ছিল ব্যতিক্রমধর্মী দ্রুততার উদাহরণ। মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিতর্ক সম্পন্ন করে রায় ঘোষণা করা হয়। আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম বিচার প্রক্রিয়ার একটি নজির।
মামলায় মোট ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। ভুক্তভোগীর বাবা-মা, স্বজন, প্রতিবেশী, তদন্ত কর্মকর্তা, সুরতহাল প্রস্তুতকারী পুলিশ সদস্য এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সাক্ষ্যে উঠে আসে ঘটনার ভয়াবহ চিত্র। আদালত কক্ষে এসব বর্ণনা উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ফরেনসিক প্রতিবেদনে শিশুটির ওপর যৌন নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া যায়। চিকিৎসকদের মতে, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গলা কেটে হত্যার কারণেই তার মৃত্যু ঘটে। তদন্তে আরও উঠে আসে, অপরাধের আলামত মুছে ফেলা এবং মরদেহ গোপনের চেষ্টা করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রপক্ষ রায়কে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে নিহত শিশুর পরিবারও দ্রুত বিচারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
আইনজীবীরা মনে করছেন, শিশু নির্যাতন ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির এই দৃষ্টান্ত সমাজে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।



