বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
স্পটলাইট

এক নারীর হাতে সবুজ বিপ্লব: বিশ্ব পরিবেশ দিবসে ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের অনুপ্রেরণার গল্প

Prof.-Wangari-Maathai-1024×682

আজ ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দিবসটি উদযাপন করা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো— ‘Inspired by Nature. For Climate. For Our Future.’ অর্থাৎ, ‘প্রকৃতি থেকে প্রেরণা, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’

এই জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের সংকটের এই সময়ে পরিবেশ রক্ষার সংগ্রামে যারা ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম কেনিয়ার পরিবেশবাদী ওয়াঙ্গারি মাথাই।

একজন নারী, একটি স্বপ্ন এবং কোটি কোটি গাছ—এই তিনটি বিষয়ই বদলে দিয়েছিল একটি দেশের পরিবেশগত ভবিষ্যৎ।

মুক্তির পথ হলো বৃক্ষ রোপণ

১৯৪০ সালে কেনিয়ায় জন্ম নেওয়া ওয়াঙ্গারি মাথাই ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। সময়ের সঙ্গে তিনি লক্ষ্য করেন, নির্বিচারে বন উজাড়ের কারণে মাটির উর্বরতা কমছে, পানির উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে এবং গ্রামীণ নারীদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

এই সংকট মোকাবিলায় ১৯৭৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গ্রিন বেল্ট মুভমেন্ট (Green Belt Movement)। আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল— গাছ লাগানো। কিন্তু এর প্রভাব ছিল অনেক বিস্তৃত। গাছ রোপণের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নের পথও তৈরি হয়।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন

ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের নেতৃত্বে কেনিয়াজুড়ে লাখো মানুষ গাছ লাগানোর কাজে যুক্ত হন। তার উদ্যোগে কয়েক কোটি গাছ রোপণ করা হয়, যা বন উজাড় রোধ, মাটির ক্ষয় কমানো এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে তার পথ মোটেও সহজ ছিল না। পরিবেশ রক্ষার দাবিতে এবং সরকারি অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাকে বহুবার হয়রানি, গ্রেপ্তার ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি থেমে যাননি।

পরিবেশ ও শান্তির অনন্য সংযোগ

ওয়াঙ্গারি মাথাই বিশ্বাস করতেন, পরিবেশ ধ্বংস হলে শুধু প্রকৃতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়ে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে দেখতেন।

এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্ষ্কা লাভ করেন। তিনি ছিলেন প্রথম আফ্রিকান নারী যিনি এই সম্মান অর্জন করেন।

আজও প্রাসঙ্গিক তার বার্তা

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এমন সময়ে ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের বার্তা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে—পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, প্রত্যেক মানুষের।

তার একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল, ‘It’s the little things citizens do. That’s what will make the difference.’ অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের ছোট ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে দেয়।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের শিক্ষা

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের জীবন আমাদের শেখায়, একজন মানুষের উদ্যোগও সমাজ ও পৃথিবী বদলে দিতে পারে। একটি গাছ লাগানো হয়তো ছোট কাজ মনে হতে পারে, কিন্তু কোটি মানুষের সেই ছোট উদ্যোগই একদিন সবুজ পৃথিবীর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।

আজকের দিনে যখন পরিবেশ রক্ষা মানবজাতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ, তখন ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের সংগ্রাম ও সাহস আমাদের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণা। তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতিকে বাঁচানো মানে ভবিষ্যৎকে বাঁচানো।

অনুপ্রেরণাপরিবেশসবুজ বিপ্লব