বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬
স্পটলাইট

ত্যাগের মহিমায় এসেছে ঈদুল আজহা, আনন্দে ভাসছে সারাদেশ

90ce177b5ba6c9c6b63a412110f0b768_2

বছর ঘুরে সাম্য, ত্যাগ ও মানবিকতার বার্তা নিয়ে আবার এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলমানদের জীবনে বছরে দুটি প্রধান আনন্দ-উৎসবের একটি ঈদুল আজহা।

আজ ২৮ মে, ১০ জিলহজ বৃহস্পতিবার সারা দেশে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে উদ্‌যাপিত হচ্ছে কোরবানির ঈদ। আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর মেলবন্ধনে আবারও মুখর হয়ে উঠেছে বাঙালির চিরায়ত পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের বন্ধন। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি ও পথের কষ্টকে তুচ্ছজ্ঞান করে মানুষ পৌঁছে গেছে প্রিয়জনের কাছে। এই ত্যাগের মধ্য দিয়েই পাওয়া মিলনের আনন্দ ঈদ উৎসবের রংকে আরও গভীর করেছে।

হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আজহা উদ্‌যাপিত হয়। ঈদুল ফিতরের মতো এ ঈদে আগের দিন চাঁদ দেখা নিয়ে ঔৎসুক্য থাকে না; ১০ দিন আগেই ঈদের তারিখ নির্ধারিত হয়ে যায়। সে অনুযায়ী পশু কেনা থেকে শুরু করে গ্রামের বাড়িতে ফেরা—সব ধরনের প্রস্তুতি আগেভাগেই সেরে নেন মানুষ।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়,

‘ঈদজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ এলো আবার দুস্‌রা ঈদ
কোরবানি দে কোরবানি দে শোন্ খোদার ফর্মান তাকিদ।।’

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। এই দিনে কি ধনী কি নির্ধন—সবাই যার যার সাধ্যমতো নতুন, নয়তো পরিষ্কার কাপড় পরে, গায়ে আতর-সুগন্ধি মেখে মসজিদ কিংবা ঈদগাহে এক কাতারে দাঁড়াবেন। নামাজ শেষে বুকে বুক মিলিয়ে ছড়িয়ে দেবেন ভ্রাতৃত্বের বার্তা।

এরপর মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের আশায় সামর্থ্য অনুযায়ী দেওয়া হবে পছন্দের পশু কোরবানি। প্রত্যেক আর্থিক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি দিল না, সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে।’

আমাদের দেশে সাধারণত গরু, ছাগল বা মহিষ কোরবানি দেওয়া হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে দুম্বা, ভেড়া ও উট কোরবানি দেওয়া হয়ে থাকে। আমাদের এ অঞ্চলে শত বছর বা তারও আগে সাধারণত বকরি বা ছাগল কোরবানি দেওয়া হতো। এ জন্য এই ঈদের পরিচিতি ছিল ‘বকরি ঈদ’ বা ‘বকরিদ’। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এ অঞ্চলে গরু কোরবানি দেওয়া বাড়তে থাকে।

কোরবানি হয়ে গেলে মাংস তিন ভাগ করে যিনি কোরবানি করবেন, তিনি নেবেন এক ভাগ, বাকি দুই ভাগ আত্মীয়স্বজন ও গরিব-দুঃখীর মধ্যে বিলিয়ে দেবেন। এভাবে বণ্টন করতে ইসলাম উৎসাহিত করেছে। সমাজে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্যই ধর্মের এই আহ্বান।

কেউ একা একটি পশু কোরবানি দেন, কেউ আবার অন্যদের সঙ্গে মিলে ভাগে কোরবানি করেন। সামর্থ্যের তারতম্য থাকলেও কোরবানির আনন্দ ও দায়িত্ব সবার মধ্যেই ভাগ হয়ে যায়।

হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত

আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য ও সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এই ঈদুল আজহা। এ উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে ত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত। হজরত ইব্রাহিম (আ.) মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। পরম করুণাময় আল্লাহর অপার মহিমায় ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। ঈদুল আজহা তাই আত্মত্যাগে ডুব দেওয়ার এবং মনের ভেতরের সুপ্ত পশুত্বকে বিসর্জনের দিন। এর শিক্ষা হলো মনের পশুকে জবেহ করে নিজেকে খোদায়ি রঙে সাজিয়ে তোলা। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘মনের মাঝে পশু যে তোর আজকে তারে কর্ জবেহ, পুল্‌সেরাতের পুল হতে পার নিয়ে রাখ্ আগাম রসিদ্।’

সুরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তোমাদের জবাই করা পশুর রক্ত-মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। তিনি দেখেন তোমাদের তাকওয়া। আর এই তাকওয়া হচ্ছে আত্মশুদ্ধি, নিষ্কৃতি লাভ করা, ভয় করা। অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় এবং তাঁর সন্তুষ্টিলাভের আশায় অন্যায় ও আল্লাহর অপছন্দের কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।

শুভেচ্ছা ও ঈদের দিনের আয়োজন

ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘ঈদুল আজহা ত্যাগ, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত বার্তা নিয়ে আবারও মুসলিম বিশ্বের দ্বারে এসেছে। আল্লাহ যেন আমাদের ত্যাগ কবুল করেন এবং মাতৃভূমিসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ও মানবজাতির জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা দান করেন।’

ঈদুল আজহা উপলক্ষে টেলিভিশন ও রেডিওতে সম্প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সংবাদপত্র আয়োজন করেছে বিশেষ সংখ্যার। ঈদের দিন সরকারিভাবে হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা ও শিশুসদনে উন্নতমানের বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হবে।

আনন্দঈদুল আজহাত্যাগ