আজ বিশ্ব ধরিত্রী দিবস, প্রতিপাদ্য ‘পৃথিবী বনাম প্লাস্টিক’

আজ ২২ এপ্রিল, বিশ্ব ধরিত্রী দিবস বা ওয়ার্ল্ড আর্থ ডে। পরিবেশ সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ২২ এপ্রিল বিশ্বের ১৯৩টি দেশে পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। ২০২৬ সালের ধরিত্রী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আওয়ার পাওয়ার, আওয়ার প্ল্যানেট’ বা ‘আমাদের শক্তি, আমাদের ধরিত্রী’। এই বার্তাটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর গভীরে নিহিত রয়েছে এক বিশাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আহ্বান।
ধরিত্রী দিবসের সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৫৬ বছর আগে। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পায়নের ফলে পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছিল। বিশেষ করে ১৯৬৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্টা বারবারায় বিশাল তেল নিঃসরণের ফলে হাজার হাজার সামুদ্রিক প্রাণী মারা যায় এবং সমুদ্রের পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ে। এই ঘটনাটি তৎকালীন মার্কিন সিনেটর গেলর্ড নেলসনকে গভীরভাবে বিচলিত করে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, ছাত্র আন্দোলনের মতো পরিবেশ রক্ষার জন্যও বড় একটি জনজাগরণ প্রয়োজন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় নেমে আসে প্রায় ২ কোটি মানুষ। সেই ঐতিহাসিক পদযাত্রায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ অংশ নিয়ে দূষণমুক্ত পৃথিবীর দাবি জানায়। মূলত সেই আন্দোলন থেকেই জন্ম হয় ‘আর্থ ডে’ বা ‘ধরিত্রী দিবস’। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে ডেনিস হেইসের নেতৃত্বে এই আন্দোলন আন্তর্জাতিক রূপ পায় এবং পৃথিবীজুড়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়।
সেই প্রথম আয়োজনের গতিবেগ যুক্তরাষ্ট্রে একটি মাইলফলক হিসেবে পরিবেশগত আইন প্রণয়নে সাহায্য করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে– মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইউনাইটেড স্টেটস এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি) গঠন এবং ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট ও ক্লিন ওয়াটার অ্যাক্টের মতো আইন।১৯৯০ সালের মধ্যে ধরিত্রী দিবস যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে একটি বৈশ্বিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যা ১৪০টিরও বেশি দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষকে সক্রিয় করে তোলে। বর্তমানে এটি আর্থডে.ওআরজি (EARTHDAY.ORG) দ্বারা পরিচালিত হয় এবং ১৯০টিরও বেশি দেশে পালিত হয়, যা একে বিশ্বের বৃহত্তম নাগরিক অনুষ্ঠানে পরিণত করেছে।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ধরিত্রী দিবসের তাৎপর্য অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে এবং আমরা এক ভয়াবহ জলবায়ু সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। জলবায়ু পরিবর্তন ও বন উজাড় থেকে শুরু করে দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি পর্যন্ত– পৃথিবী আজ নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনকে আমরা প্রায়ই ‘মানবসৃষ্ট’ সংকট হিসেবে চিহ্নিত করি, কিন্তু সেই আলোচনায় ‘যুদ্ধ’ বিষয়টি অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। অথচ আধুনিক যুদ্ধ কেবল প্রাণহানি বা অবকাঠামো ধ্বংসেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশাল মাত্রার কার্বন নিঃসরণ ঘটানো এক অদৃশ্য দূষণযন্ত্র। বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতের কার্বন নিঃসরণ নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব একটি বড় সমস্যা। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বৈশ্বিক মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৫.৫ শতাংশই আসে সামরিক কার্যক্রম থেকে। কিন্তু অধিকাংশ দেশই এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করে না। ফলে এই ‘অদৃশ্য’ নিঃসরণ আমাদের পরিবেশকে নিঃশব্দে আরও বিপন্ন করে তুলছে।
সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায় থেকেই বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। যুদ্ধবিমান ও ট্যাংকের জ্বালানি ব্যবহার, ভারী অস্ত্রের বিস্ফোরণ, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ড—সব মিলিয়ে এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। এর সঙ্গে যোগ হয় যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রম, যা আরও বিপুল কার্বন নিঃসরণের কারণ হয়। হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট নির্গমন ৩১১ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্যেরও বেশি, যা একটি উন্নত দেশের বার্ষিক নিঃসরণের সমান। একইভাবে, গাজা সংকটের কার্বন ফুটপ্রিন্ট প্রায় ৩৩ মিলিয়ন টন, যা জর্ডানের মতো একটি দেশের বার্ষিক নিঃসরণের সঙ্গে তুলনীয়।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। উদাহরণ হিসেবে গাজার কথাই ধরা যায়, যেখানে ৪০ মিলিয়ন টনের বেশি ধ্বংসাবশেষে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান মাটি ও পরিবেশকে স্থায়ীভাবে দূষিত করছে।
সব মিলিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার—যুদ্ধের ক্ষতি তাৎক্ষণিক ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বহন করতে হয়। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু মানবিক প্রয়োজন নয়, এটি জলবায়ু সুরক্ষার ক্ষেত্রেও একান্ত জরুরি।
ধরিত্রী দিবস কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়স্থল এই নীল গ্রহের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার অঙ্গীকার। আমাদের ছোট্ট একটি সচেতন পদক্ষেপ— যেমন একটি গাছ লাগানো বা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন করা— ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে সাহায্য করবে।


