বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
স্পটলাইট

বিশ্ব পথশিশু দিবস: অবহেলিত শিশুদের অধিকার ও পুনর্বাসনের জরুরি আহ্বান

c2

আজ বিশ্ব পথশিশু দিবস। সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণি—পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। একটি শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা মায়ের কোল ও পরিবারের স্নেহময় পরিবেশ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন— হাজার হাজার শিশু আজ রাস্তায় বেড়ে উঠছে, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে জীবিকার তাগিদে নেমে পড়ছে কঠিন সংগ্রামে।

বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা নিয়ে নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান না থাকলেও বিভিন্ন সংস্থার মতে, এ সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই রাজধানী ঢাকায় বসবাস করে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, এই সংখ্যা ১০ লক্ষাধিকও হতে পারে। দেশের বিভিন্ন বিভাগের হটস্পটে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৭ হাজার ২০০ শিশুর ওপর পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র।

জরিপ অনুযায়ী, পথশিশুদের ৮২ শতাংশই ছেলে এবং তাদের অধিকাংশই দারিদ্র্য ও কাজের সন্ধানে রাস্তায় নেমে আসে। প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ৬ শতাংশ এতিম বা বাবা-মায়ের অবস্থান সম্পর্কে অজ্ঞ। এসব শিশুদের মধ্যে ৩০ শতাংশেরও বেশি মৌলিক জীবনধারার সুবিধা—যেমন নিরাপদ ঘুমের স্থান বা একটি সুরক্ষিত ঘর—থেকে বঞ্চিত। অনেকেই খোলা আকাশের নিচে বা জনসাধারণের স্থানে রাত কাটায়, যেখানে তাদের নিরাপত্তা সবসময় ঝুঁকির মুখে থাকে।

সহিংসতা ও হয়রানিও তাদের নিত্যসঙ্গী। জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে প্রতি ১০ জনে ৮ জনই পথচারীদের দ্বারা কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে। বিশেষ করে রাতের সময় তাদের ওপর হামলার ঘটনা বেশি ঘটে।

জীবিকার তাগিদে এসব শিশু বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়িয়ে পড়ে—যেমন কুলি, হকার, রিকশা শ্রমিক, আবর্জনা সংগ্রাহক, হোটেল শ্রমিক বা কারখানার কাজ। দিনভর কঠোর পরিশ্রমের পর তারা যে পারিশ্রমিক পায়, তা অত্যন্ত নগণ্য—কখনো দিনে ২০ থেকে ৬০ টাকা, আবার কখনো মাসে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। সামান্য ভুলের জন্য শারীরিক নির্যাতন বা চাকরি হারানোর ঘটনাও ঘটে।

সমাজে পথশিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও উদ্বেগজনক। অনেকেই তাদের অপরাধপ্রবণ হিসেবে বিবেচনা করে, যদিও বাস্তবে অধিকাংশ শিশু শুধুমাত্র বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নেতিবাচক ধারণা তাদের পুনর্বাসনের পথে বড় বাধা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি সরকারকে আরও কার্যকর ও আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে। বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে শিক্ষা, আশ্রয় ও সুরক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

বিশ্ব পথশিশু দিবসে তাই একটাই প্রত্যাশা—এই অবহেলিত শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা হোক।

পথশিশুবিশ্ব পথশিশু দিবসশিশু