বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে প্রয়োজন টেকসই প্রস্তুতি

জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে প্রয়োজন টেকসই প্রস্তুতি

প্রতিবছর ২৩ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব আবহাওয়া দিবস। ১৯৫০ সালে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা প্রতিষ্ঠার স্মারক এই দিনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং প্রকৃতির ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতীক। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পর্যবেক্ষণ, আগামী দিনের সুরক্ষা’ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমাদের প্রস্তুতি কি সত্যিই যথেষ্ট?

গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক আবহাওয়ার পরিবর্তন স্পষ্ট করে দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয় বরং এটি এখন বর্তমানের বাস্তবতা। প্রাক-শিল্পায়ন সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই ১.১ থেকে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ২০২৩ সাল ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম বছর আর এই ধারা অব্যাহত থাকলে সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের অন্যতম ভুক্তভোগী। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ, হঠাৎ বন্যা এবং ঋতুচক্রের পরিবর্তন মানুষের জীবনযাত্রাকে অনিশ্চিত করে তুলছে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৫ কোটি মানুষ আজ জলবায়ু ঝুঁকির মুখে। লবণাক্ততার কারণে প্রায় ১০ লাখ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ পানিতে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলো এখন দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে, ফলে সতর্কবার্তা দেওয়ার সময় কমে যাচ্ছে। গভীর সমুদ্রে পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ‘ওশান বয়া’ বা স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃত শক্তি নির্ণয় কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

Advertisements

বর্তমানে আবহাওয়ার পূর্বাভাস শুধু ‘বৃষ্টি হবে কি না’ জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন প্রয়োজন ‘ইমপ্যাক্ট-বেসড ফোরকাস্টিং’ অর্থাৎ কোনো আবহাওয়া পরিস্থিতি মানুষের জীবন, কৃষি বা অবকাঠামোর ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্দিষ্টভাবে জানানো। এতে মানুষ আগাম প্রস্তুতি নিতে পারে এবং ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হয়।

আবহাওয়া কোনো সীমান্ত মানে না। হিমালয় অঞ্চলে বৃষ্টি হলে তার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলে। তাই আঞ্চলিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে বিমসটেকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। তথ্য আদান-প্রদানে রাজনৈতিক ও কারিগরি বাধা দূর না হলে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা দুর্বলই থেকে যাবে।

পরিসংখ্যানও আমাদের সতর্ক করে দেয়। ১৯৭০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার বড় অংশ দক্ষিণ এশিয়ায়। এই সময়ে শুধু বাংলাদেশেই প্রাণহানি হয়েছে প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার। যদিও দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত, তবুও এই সংখ্যা প্রমাণ করে যে ঝুঁকি এখনো অনেক বেশি।

তবে কেবল প্রযুক্তি দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বও সমান। সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। কিন্তু বন উজাড় ও পরিবেশ ধ্বংসের ফলে এই প্রাকৃতিক ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।

এক্ষেত্রে তরুণদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ‘সিটিজেন সায়েন্স’ উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ যদি স্থানীয় আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহ ও শেয়ার করে, তবে তা পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে আরও সক্রিয় হতে হবে।

নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় বার্তা হলো—আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়, এটি ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ। উন্নত সতর্কবার্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, জলবায়ু সংকট কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। এটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি। আজকের সঠিক প্রস্তুতি ও সচেতন সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যৎ।

Advertisements
জলবায়ুজলবায়ু ঝুঁকিজলবায়ু পরিবর্তনপ্রকৃতিবিশ্ব আবহাওয়া দিবস