গ্ল্যামারের বাইরে গিয়ে অন্ধকার মনস্তত্ত্বে জয়া আহসান

ঝকঝকে গ্ল্যামার, রোমান্টিক গল্প কিংবা নিরাপদ বাণিজ্যিক ছকের বাইরে এসে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে জয়া আহসান বরাবরই সাহসী। সেই ধারাবাহিকতায় এবার তিনি যুক্ত হয়েছেন এমন এক ছবিতে যার বিষয়বস্তু দর্শককে স্বস্তি দেওয়ার জন্য নয় বরং অস্বস্তিতে ফেলতে—ভাবতে বাধ্য করতে। ওপার বাংলায় মুক্তির অপেক্ষায় থাকা সিনেমা ‘ওসিডি’ ঠিক সেই ধরনেরই একটি কাজ।
এই ছবিতে জয়া আহসানকে দেখা যাবে একজন চিকিৎসকের ভূমিকায়। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি) এবং শিশু যৌন নির্যাতনের মতো গভীরভাবে সংবেদনশীল ও প্রায় নিষিদ্ধ এক বাস্তবতা। যে বিষয়গুলো সমাজে ঘটছে নিয়মিত কিন্তু আলোচনার বাইরে থেকেই যাচ্ছে—সিনেমাটি ঠিক সেখানেই আলো ফেলতে চায়।
পরিচালক সৌকর্য ঘোষালের সঙ্গে এটি জয়ার তৃতীয় সিনেমা। এই জুটির আগের কাজগুলো যেমন সহজ বিনোদনের পথে হাঁটেনি ‘ওসিডি’ও তেমনই দর্শকের জন্য আরামদায়ক অভিজ্ঞতা নয়। বরং মানসিক অসুস্থতা ও শিশুদের ওপর সহিংসতার মতো বিষয়কে গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে প্রশ্ন ছুড়ে দিতে চায় সমাজের দিকে।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে জয়া আহসান আক্ষেপ করে বলেন, বাংলা সিনেমায় মানসিক রোগ বা পিডোফিলিয়ার মতো বিষয় এতদিন গুরুত্ব দিয়ে উঠে আসেনি। তার মতে, শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন কেবল একটি অপরাধ নয়—এটি একটি ভয়াবহ মানসিক ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ, যার প্রভাব শৈশব পেরিয়ে একজন মানুষের পুরো জীবনকে গ্রাস করে ফেলে।
জয়ার কথায়, এই ধরনের ট্রমা নীরবে কাজ করে—পরিবার, সম্পর্ক এবং আত্মপরিচয়ের ভেতর। তাই শুধু অপরাধ হিসেবে নয় সামাজিক ও মানসিক সমস্যার দৃষ্টিকোণ থেকেও এসব বিষয়কে দেখার প্রয়োজন আছে। ‘ওসিডি’ সেই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির একটি চেষ্টা মাত্র।
সিনেমার আলোচনার ফাঁকে উঠে আসে দুই বাংলার শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ। জয়া আহসান স্পষ্ট করে বলেন, শিল্প কখনো সীমান্ত মানে না। একজন শিল্পীর দায় কোনো রাজনৈতিক বিভাজনের সঙ্গে বাঁধা নয়। তার কাজ তিনি করেন বাংলা ভাষার জন্য—বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গ আলাদা করে নয় বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সব বাঙালির জন্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিদ্বেষ বা বাকযুদ্ধকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চান না জয়া। তার কাছে অনলাইন জগতের এই নেতিবাচকতা বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়। বাস্তবে দর্শকদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা, গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মান তিনি পাচ্ছেন—সেটাই তার কাছে সত্য।
জয়া আহসানের বিশ্বাস, অল্প কিছু মানুষের আওয়াজ কখনো শিল্পের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে না। তাই বিতর্ক বা সাময়িক বিদ্বেষ নয়, বরং অর্থবহ গল্প আর দায়িত্বশীল কাজের মাধ্যমেই তিনি সামনে এগিয়ে যেতে চান।
মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক অন্ধকারকে পর্দায় তুলে ধরার এই প্রচেষ্টা সফল হবে কি না তা সময়ই বলবে। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়—‘ওসিডি’ শুধু আরেকটি সিনেমা নয় এটি জয়া আহসানের ক্যারিয়ারে এক সাহসী অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা।



