মৌলবাদের টার্গেট নারী ও সংস্কৃতি: সতর্ক হবো কবে?

মৌলবাদী চিন্তার প্রধান দুটি লক্ষ্য খুব স্পষ্ট— নারী এবং সংস্কৃতি। এই দুই ক্ষেত্রকে দুর্বল করতে তাদের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো অল্প বয়সী তরুণরা। তরুণদের প্রভাবিত করতে তারা শিক্ষা কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করে। কয়েক বছর আগে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান, ধারাবাহিক সন্ত্রাসী হামলা এবং লেখক-ব্লগারদের ওপর আক্রমণের সময় আমরা দেখেছিলাম কীভাবে তরুণদের একটি অংশ এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর হাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান সহিংসতা কমে গিয়ে অনেকেই ভেবেছিলেন, সমস্যা যেন মিলিয়ে গেছে। কিন্তু এর আড়ালে যে ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্তির চারা জেগে উঠছিল, তা আমরা অনেকেই উপেক্ষা করেছি।
সমাজকে মৌলবাদমুখী করতে পাড়ায় পাড়ায় ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এসব মাহফিলের অনেক বক্তব্যই ছিল নারীবিদ্বেষী। সাম্প্রতিক সময়ে মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামসহ কিছু বক্তার বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ওয়াজ-মাহফিলে নারীদের নিয়ে কটাক্ষ, নারীর সামাজিক ভূমিকা ছোট করে দেখা এবং নারীদের কেবল স্বামীসেবা ও সন্তান জন্মদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার মতো বক্তব্য প্রকাশ্যে দেওয়া হয়েছে। এমন বক্তব্য সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
নারীর মর্যাদা ছোট করা, নারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার নানা কৌশল জনসমক্ষে প্রচার করা হয়েছে। এসব বক্তব্যে বিভ্রান্ত হয়েছে হাজারো মানুষ। সেই সব বক্তব্য ছড়িয়ে গেছে ইউটিউব–ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে। ফলে অনেক পরিবারের ভেতরের মানসিক কাঠামোই বদলে গেছে, আর এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে পরিবারের কিশোর-তরুণ সদস্যদের ওপর।
অনেকেই ধর্মের বাহারি চেহারা ধরে অসৎ উপার্জনকে বৈধ করতে চাইছে, আর সেই বকধার্মিকতা তাদের সন্তানদের মধ্যে জন্ম দিচ্ছে ধর্মান্ধতা ও বিভ্রান্তি। তারা শিখছে নারীকে মানুষ নয়, বরং অধীনস্ত ভাবতে। তারা বিশ্বাস করছে, দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি নাকি ‘তাদের’ নয়। শিল্প-সংস্কৃতি, নাচ-গান, নাটক কিংবা বিজ্ঞানচর্চাকে তারা হারাম ভাবতে শুরু করেছে। কারণ, সংস্কৃতিচর্চা মানবিকতা ও প্রগতির পথ দেখায় যা উগ্রবাদী রাজনীতির জন্য অসুবিধাজনক।
সম্প্রতি নারীদের নিয়ে কটাক্ষ করে কিছু বক্তব্য সামনে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের কিছু বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ধর্মের নামে এ ধরনের নারীবিদ্বেষী বক্তব্য সমাজে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে।
আজ দেশের নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ বিজ্ঞানবিরোধী, ধর্মীয় কাটছাঁট মানসিকতা গ্রহণকারী, সংস্কৃতিবিমুখ হয়ে উঠছে— এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।
বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আরও অনেক শিক্ষককে হয়রানির মতো উদ্বেগজনক ঘটনাও ঘটেছে। সন্ত্রাসী হামলা আপাতত কমে গেলেও তরুণ প্রজন্মের চিন্তা, বিবেক, মানসিকতা এসব জায়গায় যে ধীরে ধীরে আঘাত লেগেছে, তার গুরুতর ফল এখন আমরা বুঝতে পারছি।
পথে বের হওয়া এক নারীকে ‘টিপ’ দেওয়া নিয়ে পুলিশের একজন সদস্যের হেনস্তা এটিও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং নারীদের প্রতিদিনের নিরাপত্তাহীনতারই প্রতিফলন। শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দিয়ে নারীর আসল উন্নতি হয় না, সমাজের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা জরুরি।
এই বিষয়গুলো নিয়েই সম্প্রতি অনন্যা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমাজে মৌলবাদী চিন্তার বিস্তার রোধে নারী ও সংস্কৃতির প্রশ্নকে নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
এখন গ্রামের পর গ্রাম, শহরের রাস্তায় অনেক মেয়েই হিজাব বা পুরো শরীর ঢেকে ঘুরছে। এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান জরুরি। কেন বাল্যবিবাহ বাড়ছে? কেন স্কুল-কলেজে এগিয়ে যাওয়া মেয়েরাও হঠাৎ সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত পোশাক পরে ফেলে? কেন টিপ্পনি টানা বা হয়রানি কমছে না? এসব নিয়ে গবেষণা, জরিপ এবং খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন।
অদ্ভুত বিষয় হলো এখনও অনেক ওয়াজে বিকৃত বক্তব্য ছড়ানো বন্ধ করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে কিছু বক্তার বক্তব্যে নারীদের নিয়ে কটাক্ষ এবং সমাজে বিভ্রান্তিকর ধারণা ছড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের কিছু বক্তব্য নিয়েও সমালোচনা উঠেছে, যা নতুন করে এই বিতর্ককে সামনে এনেছে।
ধর্ম মানুষের উৎকর্ষের পথ দেখানোর বদলে কেন অনেক ক্ষেত্রে মুখোশে পরিণত হচ্ছে এটিও রাষ্ট্র ও সমাজকে বুঝতে হবে।
মৌলবাদের এই বিষবৃক্ষ একা সরকার তুলতে পারবে না— জনগণকে সঙ্গে নিতে হবে। শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীদের মতামত নিতে হবে, তবে সতর্কতার সঙ্গে, যাতে ভণ্ড প্রগতিশীলদের ফাঁদে আর না পড়া হয়।
সবকিছুর ভেতরেই কোথাও না কোথাও পচন ধরেছে। তাই আরও সতর্কতা, আরও সচেতনতা দরকার। মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিলে তার ফল অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। সময় থাকতে সাবধান হওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।



