রামেক হাসপাতালে অসহায়দের আপনজন আলেয়া

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল প্রতিদিনই বহু রোগী ভর্তি হয়। এদের অনেকেই আসেন সম্পূর্ণ পরিচয়হীন অবস্থায় নেই স্বজন, নেই ঠিকানা। এমন মানুষদের জন্যই প্রায় এক যুগ ধরে আপনজন হয়ে আছেন আলেয়া বেগম। শুধু সেবা নয়, মমতায় মুছে দেন তাঁদের চোখের কোণের দুঃখও। কারও মা, কারও মেয়ে কখনো আবার বন্ধু হয়ে ওঠেন তিনি।
রাজশাহীর হেতেমখাঁ কারিগরপাড়ার বাসিন্দা আলেয়া ২০০৬ সালে আয়া হিসেবে কাজ শুরু করেন রামেকে। চুক্তিভিত্তিক আউটসোর্সিং কর্মী হওয়ায় চাকরিটি স্থায়ী নয়। এ বছর তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিয়োগ পেলেও ২০১২ সাল থেকে তাঁর পরিচয় ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন অজ্ঞাতনামাদের একান্ত আপনজন।
আগে ওয়ার্ডের সামনে বারান্দায় বসেই এসব রোগীর যত্ন নিতেন আলেয়া। পরে তাঁর মানবিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে গত বছর হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফ এম শামীম আহাম্মদ তাঁর জন্য আলাদা একটি অস্থায়ী ওয়ার্ড করে দেন। সাত শয্যার সেই ওয়ার্ডে এখন আলেয়ার সঙ্গে কাজ করছেন দুই নারী সহকারী।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে ওয়ার্ডে গেলে দেখা যায়, সাতটি শয্যাতেই রোগী ভর্তি। পরিপাটি ও শান্ত পরিবেশে দুই বছরের ছেলেকে কোলে নিয়েই রোগীদের সেবা করছেন আলেয়া। একজন বৃদ্ধের পায়ের ব্যান্ডেজ খুলতে খুলতে খোঁজ নিচ্ছেন ‘আজ আরাম লাগছে তো?’ বৃদ্ধ নীরবে মাথা নাড়িয়ে জানান অনুভূতি। অন্য এক বৃদ্ধ তাঁকে দেখিয়ে বলেন, ‘ও আমার মেয়ে।’ আলেয়া হেসে বলেন, ‘নিজের নাম-পরিচয় বলতে পারে না, তবু আমাকে মেয়ে বলে ডাকে।’ কথায় কথায় তাঁর চোখও ভিজে ওঠে।
এক কোণে শোয়া এক মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধাকে উঠে ওষুধ খাওয়ান আলেয়া। অন্য শয্যায় চিকিৎসাধীন এক তরুণীর পায়ে গুরুতর ক্ষত। বাড়ি যাওয়ার জায়গা নেই বলে তিন মাস ধরে আলেয়ার তত্ত্বাবধানে আছে। আলেয়া বললেন, ‘মনে হয়, বল্টুর মতো এটাকেও বাড়ি নিয়ে যেতে হবে।’ বল্টু হলো সেই কিশোর, যার দুই পা ট্রেনে কাটা পড়েছিল—চিকিৎসার পর যাকে নিজের সন্তান করে নিয়েছেন আলেয়া।
অজ্ঞাত রোগীদের পরিচয় শনাক্ত করতে এখন সিআইডির সহায়তা নেন তিনি। আগে শুধু মৃত্যুর পর আঙুলের ছাপ নিয়ে পরিচয় বের করা হতো। আলেয়ার অনুরোধে এখন চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই সিআইডি এসে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে। অনেকের পরিচয় মিললেও কেউ কেউ জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় পরিচয়হীনই থেকে যায়।
হাসপাতালের সমাজসেবা অফিস থেকেও কিছু সহায়তা মেলে। আলেয়া বলেন, ‘নাম না থাকুক, তারাও মানুষ। যত দিন আছি, তত দিন তাদেরই সেবা করে যাব।’
হাসপাতালের পরিচালক শামীম আহাম্মদ বলেন, ‘আলেয়া যে কাজ করছে তা অত্যন্ত মানবিক। তাঁর কাজ সহজ করতে আলাদা ওয়ার্ড করেছি, সহকারী দিয়েছি, আর তাঁদের নিয়মিত বেতনের ব্যবস্থা করেছি।’



