২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

পরিত্যক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র আজ নিরাপদ মাতৃত্বসেবার ভরসা

Untitled-4

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরবেষ্টিত বকুলবাড়িয়া ইউনিয়নের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রটি দুই বছর আগেও ছিল প্রায় অচল। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী ছিল না, ওষুধের ঘাটতি ছিল নিয়মিত—ফলে চিকিৎসা নিতে রোগীরা আসতেন না বললেই চলে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের শহরে গিয়ে প্রসব করাতে হতো। তবে এক প্রকল্প বাস্তবায়নের পর বদলে গেছে পুরো চিত্র। এখন এখানে স্বাভাবিক প্রসবের সংখ্যা বাড়ছে, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম মজুত রয়েছে, আর নারী–শিশুরা নিয়মিত সেবা পাচ্ছেন।

স্বাস্থ্যসেবায় বদলে যাওয়া চিত্র

প্রকল্পের আওতায় স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনসচেতনতা কার্যক্রম ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় কেন্দ্রটির সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে স্বাভাবিক প্রসব ১৮ থেকে বেড়ে ৩৫–এ দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মোট সেবাগ্রহণকারী বেড়েছে তিন গুণের বেশি—এ বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এখানে সেবা নিয়েছেন প্রায় তিন হাজার নারী–শিশু।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিদিনই প্রসূতি ও অন্যান্য রোগীর উপস্থিতি চোখে পড়ে। যেখানে আগে গর্ভবতী নারীরা সিজারিয়ান করানোর জন্য উপজেলা বা জেলা সদরে ছুটতেন, এখন তাঁরা স্থানীয় কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসবে আগ্রহী। গর্ভকালীন, প্রসবকালীন, প্রসবোত্তর, নবজাতক পরিচর্যা থেকে শুরু করে যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য—সব ধরনের সেবাই এখন নিয়মিতভাবে পাওয়া যাচ্ছে। রয়েছে স্যালাইন, ইনজেকশন, গ্লাভস, স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ ২২ ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম।

একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী, মানসুরা আক্তার জানান, তাঁর স্বামীর চাকরির জন্য তিনি একাই সংসার সামলান। বাড়ির কাছেই এই কেন্দ্র থাকায় তিনি নিয়মিত চেকআপ করাতে পারেন। পরিদর্শক খাদিজা আক্তারের কাছ থেকে তিনি খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রাম ও রক্তচাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ নিয়মিত পান। তিনি আশা করছেন, এখানেই স্বাভাবিক প্রসব করতে পারবেন।

কেন্দ্রের পরিদর্শক খাদিজা আক্তারও বলেছেন, জনবল ও ওষুধের ঘাটতি দূর হওয়ায় এখন নিয়মিত সেবা দেওয়া যায়, ফলে রোগীর সংখ্যা এবং প্রসবসেবা—দুটোই বেড়েছে।

Advertisements

প্রকল্পের প্রভাব

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটি উপকূলীয় অঞ্চলের নারী, নবজাতক, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়ে এসেছে বড় পরিবর্তন। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষণ, সরবরাহ, সচেতনতা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। প্রকল্প শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেছেন।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, জ্বর ও ত্বকের রোগ বেড়েছে। এসব মোকাবিলায় স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি। পর্যাপ্ত বাজেট, জনবল, প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানো এ মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরেজমিন পর্যবেক্ষণ

গলাচিপা ও বরগুনার বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় এগুলো এখন অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সরঞ্জামে সজ্জিত। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নারী ও শিশুর আনাগোনায় কেন্দ্রীগুলো প্রাণবন্ত। দূরবর্তী কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতেও একই দৃশ্য দেখা যায়। সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার ওপর ভরসা করে অসংখ্য নারী প্রতিদিন সেখানে চিকিৎসা নিতে আসেন।

এক বৃদ্ধা রোগী জানান, বাড়িতে বসে অসুস্থ হওয়ার বদলে তিনি ক্লিনিকে এলেই পরীক্ষা এবং ওষুধ পান—যা তাঁকে কিছুদিন সুস্থ রাখে। অন্যদিকে, নিম্নআয়ের অসংখ্য পরিবার জানায়, শহরের ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্য না থাকায় স্থানীয় ক্লিনিকই তাদের একমাত্র ভরসা।

অন্যত্র সংকট

যদিও প্রকল্প এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা উন্নতি হয়েছে, দেশের অন্যান্য ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখনো চলছে নানা সংকটে—অবকাঠামো ঘাটতি, জনবল অভাব এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা রয়েছে অনেক জায়গায়। তৃণমূল পর্যায়ে মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজননসেবা বাড়াতে সরকার নতুন প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জেলা প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট সংযুক্ত হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে সেবা বিস্তার আরও সহজ হচ্ছে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।

Advertisements