আজ আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস

আজ শনিবার, আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। আমাদের দেশে এখনও অনেক কন্যাশিশুর ভয়, বৈষম্য ও নিরাপত্তহীতার মধ্য দিয়ে দিন শুরু হয় । বৈষম্য ও বাল্যবিয়েও দিনদিন বেড়েই চলছে। আর এসবের জন্য তাঁদের ভবিষ্যৎ আজও থমকে থাকে। বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের উচ্চ হার এখনও রয়েছে। শিক্ষার ঘাটতি, কুসংস্কার, যৌতুকের ভয় এবং মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা– এসব কারণে বেড়েই চলছে বাল্যবিবাহ।
তবে এ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না। বিশ্বের প্রতিটি মেয়ের কণ্ঠ, সাহস ও নেতৃত্বকে তুলে ধরতে এবং বৈষম্য দূর করার অঙ্গীকার নিয়ে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। জাতিসংঘের এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য– ‘আমি মেয়ে, পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিই: সংকটের মুখেও মেয়েরা’। কন্যাশিশু নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর উদ্যোগে গঠিত হয়েছে প্রতিপাদ্যটি।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের রোজিনা (ছদ্মনাম) এখনও মাধ্যমিকে ওঠেনি। বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে তাকে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই। তার বাবার ভাষ্যমতে, ‘মেয়ে মানুষ তো, বেশি লেখাপড়া করে কী লাভ! একসময় ডাক্তার হতে চেয়েছিল রোজিনা। এখন গৃহস্থালির চার দেয়ালে বন্দি। বাল্যবিয়ের ফাঁদে রোজিনার মতো হাজারো মেয়ে আজ নিজের ভবিষ্যৎ হারাচ্ছে।
‘মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০১৯’-এ বলা হয়, গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারে বাল্যবিয়ের হার বেড়েছে। বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার ১৫ বছরের নিচে ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ১৮ বছরের নিচে ৫১ দশমিক ৪০ শতাংশ।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের উচ্চ হার উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষার ঘাটতি, কুসংস্কার, যৌতুকের ভয় এবং মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা– সংকটের নেপথ্যে এই চারটি কারণ। এ ছাড়া কৈশোরে পুষ্টির অভাবে শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।
দেশে বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার দিনদিন বেড়েই চলছে। পাশাপাশি বেড়েছে অনলাইনে হয়রানি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক জরিপে দেখা গেছে, ৩৬ শতাংশের বেশি মেয়েশিশু অনলাইনে পুরুষবন্ধু দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়।
ব্র্যাক জাস্টিস অ্যান্ড রাইটস সেন্টারের ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, ১০-১৮ বছর বয়সী প্রতি চারজন মেয়ের একজন অনলাইনে হয়রানির শিকার।
২০২২ সালে সরকার ‘জাতীয় কন্যাশিশু নীতি’ গ্রহণ করলেও আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয় না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
কন্যাশিশুরা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে
ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম সমাপ্ত করে দেশের মাত্র ৬৪ শতাংশ শিশু। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র শিশু, প্রতিবন্ধী এবং দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে বসবাসকারী প্রান্তিক শিশুরা বিদ্যালয়ের শিক্ষা না পাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৩ শতাংশ মেয়ে মাধ্যমিকের শেষ শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
যৌন হয়রানি
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় এক হাজার ৩০০ জনের বেশি শিশু। এর ৭০ শতাংশই কন্যাশিশু। কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বহু গুণ বেশি। এর কারণ লজ্জা, ভয় ও সামাজিক অপবাদে অধিকাংশ পরিবার অভিযোগ করে না। এছাড়াও অনেকে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। মামলা করতে চাইলে গ্রামের প্রভাবশালীরা বলেন, ‘বাড়ির মানসম্মান যাবে।’
কিন্তু মেয়েরাই বদলে দিচ্ছে বাস্তবতা
অনেক মেয়ে বাল্যবিয়ের প্রস্তাবে মুখে নিজেই ‘না’ বলে। তাঁরাই এখন কোথাও না কোথাও নেতৃত্বে কাজ করছে এবং গ্রামে বিভিন্ন সংগঠন চালায়। যেখানে মেয়েরা বসে নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে, সমাধান খোঁজেন। বিভিন্ন জায়গায় মেয়েরাই এখন নিজেদের রক্ষা করছে, অন্যদের সচেতন করছে।
বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতামত
সিরাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এসএম সৈকত বলেন, ‘নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা ভাঙতে হবে। সচেতনতা, নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।
আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রী রোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান ডা. সেহেরীন এফ. সিদ্দিকা বলেন, একজন তরুণীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হলো ১০ থেকে ২৪ বছর বয়স পর্যন্ত সময়টা। এই ট্রানজিশনকে কেন্দ্র করেই তাদের শরীর ও মনের ওপর আসে নানান পরিবর্তন। এই বয়সটা ভালোভাবে না কাটলে মেয়েরা মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে পারে না।
নারীপক্ষের সদস্য জাহানারা খাতুন বলেন, ‘আমাদের কন্যাশিশুরা এখনও নিরাপত্তা, শিক্ষা ও পুষ্টির মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। শুধু আইন নয়, সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন দরকার। মেয়েদের সক্ষমতা বোঝা ও তাদের কণ্ঠকে গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি।’



