Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

রাজকীয় সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি

সেপ্টেম্বরটা আমার জন্য দুঃখের মাস। আমাদের বাবা ও আমাদের কনিষ্ঠ বোন এই সেপ্টেম্বর মাসেই চলে গিয়েছিল। সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখে রানির অকস্মাত্ মৃত্যুর খবরটি যখন শুনলাম, তখন আমি উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক শহর সমরখন্দে পৌঁছেছি মাত্র। মৃত্যুর খবর শুনে অবাক হলাম, কারণ রানি এলিজাবেথের শারীরিক অসুস্থতার খবর তো আগে শুনিনি! তবে মারা গেলেন কিভাবে? ৯৬ বছর বয়সে সেদিনই তো ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের সঙ্গে তার দেখা করার ছবিও দেখেছি সংবাদমাধ্যমে। রানির মৃত্যুর ওই একই দিনে বাংলাদেশের গুণীজন আকবর আলি খানের জীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। অর্থাৎ, দুজন প্রিয়মুখের পরিসমাপ্তি হলো এই সেপ্টেম্বরে।

রানি মারা গেছেন আরও ১৫ দিন আগে, ৮ সেপ্টেম্বরে। শেষযাত্রাও শেষ হয়ে গেছে। তার পরও আবার রানিকে নিয়ে লেখা কেন? উত্তরটা আমরা অবজেকটিভভাবে দেখতে চেষ্টা করি। এজন্য আমাদের প্রথমে ফিরে যেতে হবে প্রায় ৭০ বছর আগে। দিনটি ছিল ১৯৫৩ সালের ২ জুন। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের বয়স তখন ২৬ বছর। পিতা রাজা ষষ্ঠ জর্জের আকস্মিক মৃত্যুর পর তিনি সিংহাসনে বসবেন। রানির অভিষেকের খুশিতে, আনন্দে, উত্তেজনায় সেদিন রীতিমতো কাঁপছিল লন্ডন শহর। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল তখনকার সীমিত প্রযুক্তিতেই। সোনায় মোড়ানো শকটে আসীন রানির শোভাযাত্রা দেখতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তার দুপাশে লাইনে দাঁড়িয়েছিল। আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছিল, তার পরও অনেকে রাতের সেই বৃষ্টির মধ্যে সেখানেই ঘুমিয়ে ছিলেন রানির অভিষেক দেখবেন বলে। জুনের সেই সকাল কিছুটা ঠান্ডা আর বৃষ্টিভেজা থাকলেও মানুষের মধ্যে উত্তেজনা আর আনন্দের কোনো খামতি ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন শেষ হয়েছে মাত্র আট বছর আগে। যুদ্ধের পর বিষণ্ন লন্ডন নগরী যেন সেই প্রথম কোনো উত্সবের জন্য নানা রঙে বিপুল বিস্ময়ে সেজে উঠল।

তারপর কেটে গেল ৭০টি বসন্ত। এই ৭০ বছরে পৃথিবীতে পরিবর্তন ঘটেছে কত ধরনের। পরিবর্তনের এক্সেলেটরে যেন দিনদিন চাপ বেড়েই চলেছে। কত দ্রুত পালটে যাচ্ছে সবকিছু। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে ৯৬ বছর বয়সে রানির মহাপ্রয়াণ এবং তার শেষযাত্রার শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের আড়ম্বর আমাদের বুঝতে সাহায্য করল বৈশ্বিক মানসিকতা এবং রানির গুরুত্ব। সারা বিশ্ব আগেই দেখেছে, রানির দীর্ঘ ৭০ বছরের রাজত্বকাল জুড়ে ছিল তার কঠোর কর্তব্যপরায়ণতা। ব্রিটেনের রাজা-রানিদের প্রায় বারো শ বছরের ইতিহাসে কেউ এত দীর্ঘ সময় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন না। যদিও তার রানি হওয়ারই কথা ছিল না। ১৯৩৬ সালে ষষ্ঠ জর্জের বাবা রাজা পঞ্চম জর্জের মৃত্যুর পর রাজা হন ষষ্ঠ জর্জের বড় ভাই অষ্টম এডওয়ার্ড। অষ্টম এডওয়ার্ড রাজা হওয়ার পর ওয়ালিস সিম্পসন নামের একজন আমেরিকান ডিভোর্সি নারীর প্রেমে পড়েন। অষ্টম এডওয়ার্ড যখন ওয়ালিস সিম্পসনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন, রাজমাতা এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী একজন ডিভোর্সি নারীর সঙ্গে রাজার এই বিয়ে মানতে পারেননি। রাজমাতা অষ্টম এডওয়ার্ডকে বলে দিলেন—হয় সিংহাসন, না হয় সিম্পসন। রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড সিম্পসনকেই বেছে নিলেন, স্বেচ্ছায় ত্যাগ করলেন সিংহাসন। আর রাজা হওয়ার পথ পরিষ্কার হলো অষ্টম এডওয়ার্ডের ছোট ভাই ষষ্ঠ জর্জের। এবং একই সঙ্গে ষষ্ঠ জর্জের জ্যেষ্ঠ কন্যা দ্বিতীয় এলিজাবেথও হয়ে উঠলেন সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। এজন্য শৈশব থেকেই দ্বিতীয় এলিজাবেথ তার এই ভবিষ্যত্ রাজকীয় দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন হয়েছিলেন। আমরা দেখেছি, দ্বিতীয় এলিজাবেথের সময়কালে নানান জটিলতার পরও ব্রিটিশ রাজতন্ত্র সারা বিশ্বের সামনে ব্রিটেনের উল্লেখযোগ্য প্রধান প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এবং ইতিহাসের ১ হাজার বছরেরও বেশি সময়ে এই রাজতন্ত্রই ব্রিটেনের ‘সফট পাওয়ার’ (অন্যকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা)। এই রাজকীয় সফট পাওয়ারকেই ব্রিটেনের সমৃদ্ধির সবচেয়ে শক্তিশালী উত্স বলে বিবেচনা করা হয়।

এজন্য সারা বিশ্বের মানুষ অবাক হয়ে দেখেছে, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হাজার হাজার মানুষ লাইন দিয়ে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার হলের দিকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। রানির মরদেহ সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত রাখা হয়েছিল। টেমস নদী বরাবর মানুষের এই লাইন প্রায় সাত কিলোমিটার লম্বা হয়েছিল। টিভির লাইভ অনুষ্ঠানে দেখা গেছে, মধ্য লন্ডন থেকে এই লাইন পূর্ব লন্ডনের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বহু মানুষ আগের দিন মধ্যরাত থেকে লাইন দিয়েছেন রানির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তারা অপেক্ষা করছেন। কেউ আনেন হাতে তৈরি তাঁবু, কেউ আনেন স্লিপিং ব্যাগ, আবার কেউ আনেন বাতাস ঢুকিয়ে ফোলানো বিছানা। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের অন্তিমযাত্রার দৃশ্য সরাসরি দেখতে এভাবেই লন্ডনের রাস্তার পাশে জড়ো হন হাজারো মানুষ। কেবল ব্রিটেনের বিভিন্ন জায়গা থেকেই নয়, সারা বিশ্ব থেকে দলে দলে লোক এজন্য লন্ডনে এসেছিলেন। ৭০ বছর আগে যে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে তার অভিষেক, সেখানেই তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এর আগে ওয়েস্টমিনস্টার হলে রানির কফিন রাখা হয়েছিল তার প্রতি সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। সেখানে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ রানির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। রানির শেষকৃত্য ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, রাজা, বাদশাহ মিলিয়ে ২ হাজারের বেশি অতিথি এসেছিলেন। এই পৃথিবীতে কারো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ঘিরে পৃথিবীর এতগুলো দেশ থেকে শীর্ষপর্যায়ের মানুষসহ ব্রিটেনের নিজ দেশের এত মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের ঘটনা আর কখনো ঘটেনি।

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশরাজের ১৯০ বছরের ইতিহাস এবং আমার জন্মের পর থেকে রানি এলিজাবেথের (দ্বিতীয়) নাম আমাদের অস্থিমজ্জায় জড়িয়ে যায়। দেশের বাইরে মানেই বিলেত, আর বিলেত মানেই গ্রেট ব্রিটেন। নামের পূর্বে যেখানে লেখা থাকে গ্রেট। সেই গ্রেট দেশের শাসকেরা, যারা একসময় জলদস্যু থেকে বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন সম্পদের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাত। রানি প্রথম বার ঢাকায় (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে) আসেন ১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন পাকিস্তানে স্টিমরোলার চালাচ্ছেন জেনারেল আইয়ুব খান। ১৯৫৯ সালের ২৬ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান যে বেসিক ডেমোক্র্যাসি বা ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ চালু করেছিলেন, অনেকের মতে, এটা মূলত ব্রিটিশ বুদ্ধি!

রানি এলিজাবেথের পূর্ব পাকিস্তান সফরের কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি আমার আছে। মনে পড়ে, আমরা তিন বোনকে আমাদের বাবা পুরাতন কাজের লোকের সঙ্গে হাইকোর্টের সামনে দাঁড়াতে আদেশ দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই জীবনের প্রথম রানি দর্শন হলো। সেটা স্কুলজীবনের মধুর স্মৃতির মধ্যে পড়ে। চল্লিশের ঘরে তখন রানির বয়স। অর্ধ-উত্তোলিত হাতের ঢেউ খেলানো পথের পাশে দাঁড়ানো অগণিত দর্শকের প্রতি সেই মহামান্য অতিথির হাত নাড়ানোর প্রতিউত্তর আমার হূদয়ে আজও আন্দোলিত হয়। এরপর রানিকে দেখেছিলাম আশির দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশের মাটিতে আরেক সামরিক শাসকের আমলে। সেটা ছিল জেনারেল এরশাদের আমল। ১৯৮৩ সালের ১৪ থেকে ১৭ নভেম্বর। এর মধ্যে একদিন শ্যামলীতে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বাড়িতে স্বামীর সূত্রে রানির সঙ্গে আমার সামনাসামনি দেখা হওয়ার সুযোগ হয়। আলতোভাবে করমর্দন করেছিলাম হাতে গ্লাভস পরা রানির সঙ্গে। এরপর একবার প্রিন্সেন অ্যানও এসেছিলেন ঢাকায়।

রানির মৃত্যুর প্রায় ১০ দিন পর তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান টেলিভিশনের পর্দায় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনায়কদের বক্তব্যে রানির স্মৃতিচারণ মন দিয়ে শুনেছি। প্রেসিডেন্ট ওবামা তার অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে বলেন, ‘আমি এবং আমার স্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে যখন ইংল্যান্ড সফর করি, তখন বাকিংহাম প্যালেসে রাতের ডিনার অনুষ্ঠানে রানিকে দেখে আমি বেশ চমকিত হই। রানি সেদিন যথেষ্ট সেজেছিলেন বলেই আমার ধারণা। তার মাথায় মুকুট, গলায় হীরকখচিত হার।’

ওবামা একজন সাধারণ আইনজীবী, মার্কিন রাজনীতিক হয়ে একটি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন করে দুই বার, অর্থাত্ ৮ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। বিশ্বের সর্ববৃহত্ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তিনি, আর রানি এলিজাবেথেরা বংশপরম্পরায় গ্রেট ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার রাজকীয় ব্যবস্থায় উদ্ভাসিত। এজন্য ওবামার কাছেও সেই নৈশভোজে রানির ড্রেসআপ এলাবোরেটেড মনে হয়েছিল। কিন্তু আরো একটা ঘটনা সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছিলেন। তারা যখন রানির সঙ্গে দেখা করতে বাকিংহাম প্যালেসে গিয়েছিলেন, তখন মিশেল ওবামা রানিকে উপহার হিসেবে একটি ব্রোচ দিয়েছিলেন, যেটা রানিকে উপহার দেওয়ার মতো খুব দামি কিছু নয়। (কারণ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আমেরিকান প্রশাসন এসব ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় তহবিল খরচের নিয়মনীতিতে অত্যন্ত কঠোর)। কিন্তু তার পরের দিন, যেদিন রানি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডিনারে মার্কিন দূতাবাসে আসেন, সেদিন কিন্তু রানি মিশেল ওবামার সেই ক্ষুদ্র উপহার ব্রোচটি পরেই এসেছিলেন। এটাকেই বলে নোবেলের গেসচার। রানির আরেকটি গেসচার ওবামা উল্লেখ করেন। ওবামার দুই কন্যাকে রানি তার স্বর্ণখচিত ঘোড়াচালিত শকটে করে বাকিংহাম প্যালেসের চতুর্দিকে ঘুরিয়ে আনতে বলেন। স্কুলে পড়া মার্কিন প্রেসিডেন্টের দুই কন্যার সেই অভিজ্ঞতা তাদের জীবনে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ওবামার এসব ছোট ছোট স্মৃতিচারণ থেকে আমরা এত বড় এক ব্যক্তিত্বের মাঝে মানবিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সৌন্দর্যের ছোঁয়া দেখতে পাই।

আমাদের দেশে আজকাল প্রচুর অতি ধনী ব্যক্তিদের চোখে পড়ে। আমার এই ৫২ বছরের বৈবাহিক জীবনে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, এত বিপুলসংখ্যক অতি ধনী আগে দেখি নাই। বিশেষ করে, নব্য ধনীদের তৃতীয় প্রজন্ম যখন বাপ-দাদা-নানাদের বানানো পয়সার বদন্যতায় অযাচিত সুবিধা পেতে অভ্যস্ত হন এবং প্রচলিত নিয়মনীতি ও ভদ্রতার ধার ধারতে শেখেন না, লেখার শেষে তেমনি একটি ঘটনার অবতারণা করছি। গত ১৮ সেপ্টেম্বর দুই সপ্তাহ পর দেশে ফিরি। এয়ারপোর্টে প্রোটোকলের সুবাদে ভিআইপি এরিয়ায় প্রবেশ করেই একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। ২০-২২ বছর বয়সি ছয়-সাত জন ছেলে এলোপাতাড়িভাবে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। জানতে পারলাম, কোনো এক নেতার নাতির বন্ধু এরা। অর্থের সঙ্গে ভালো আচরণ শেখাটাও জরুরি। বনেদি আচরণ রাতারাতি হয় না। রাজকীয় ম্যানার কী জিনিস, তা বারো শ বছর ধরে ব্রিটিশরা সারা পৃথিবীকে দেখিয়ে যাচ্ছে।

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক পাক্ষিক অনন্যা