Skip to content

১৮ই মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মহারাজার জন্মদিনে

একবার বুলা কাকার সাথে উটরাম নামে এক ভাসমান রেস্তোরাঁয় খেতে গেলেন সত্যজিৎ রায়।  আইসক্রিম নিলেন খাওয়ার জন্য। কিন্তু প্রথম চামচ মুখে দিতেই দাঁতে শিরশিরানি হল, তখন ওয়েটারকে ঠেকে বললেন আইসক্রিম একটু গরম করে দিতে। আইসক্রিম আবার কেউ গরম করে খায়! কিন্তু এই মানুষটি পারতেন। আইসক্রিম গরম করে খাওয়া নয়, বরং ভারতীয় চলচ্চিত্র যা হয়নি আগে তাই করে দেখাতে। 

 

মহারাজার জন্মদিনে

 

চলচ্চিত্র জগতে এক ইতিহাস তৈরি করে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। যাকে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। 

 

মহারাজার জন্মদিনে

 

চলচ্চিত্রে আগ্রহ আসে ছোটবেলা থেকেই। স্কুলজীবন থেকে নানান হলিউডি সিনেমা দেখে তাঁর বেড়ে ওঠা। এরপরে শান্তিনিকেতনের গ্রন্থাগারে সত্যজিৎ খুঁজে পেয়েছিলেন চলচ্চিত্র বিষয়ে বই। সিনেমায় আসার আগে তাঁর যাত্রা শুরু হয় একজন চিত্রকার হিসেবে। কাজে মননশীল রুচির ছাপ রেখে কাজ করে গেছেন তিনি।

 

মহারাজার জন্মদিনে

 

সিগনেট সংস্করণ ক্ষীরের পুতুলের জন্য অলংকরণ দিয়েই সত্যজিতের গ্রন্থ চিত্রণের শুরু। সেই সংস্করণে সত্যজিতের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল শিল্পী সত্যজিৎ রায় বলে। ১১ টি আন্তর্জাতিক পুরষ্কারের অধিকারী, ১৯৫৫ সালে মুক্তি প্রাপ্ত বিখ্যাত সেই সিনেমা 'পথের পাঁচালী' দিয়ে চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক।  এক ঝাঁক নতুন মুখ নিয়ে নিজের অর্থায়নে শুরু করেন সিনেমাটির কাজ। যাদের কোনোরকম পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিলোনা। যদিও  পরবর্তীকালে তাঁর ক্যামেরাম্যান সুব্রত মিত্র ও শিল্প নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত দুজনেই  নিজ নিজ ক্ষেত্রে খ্যাতিলাভ করেন। আর্থিক অনটন থাকায়  দীর্ঘ সাড়ে তিনবছরে সিনেমাটির কাজ সম্পন্ন করেন সত্যজিৎ। 

 

মহারাজার জন্মদিনে

 

এরপরে সত্যজিৎ নির্মাণ "অপরাজিত" যা তাঁকে আন্তর্জাতিক মহলে আরো বেশি সুপরিচিত কর তোলে। সত্যজিতের চলচ্চিত্রের কথা উঠলেই 'অপুত্রয়ী' নামটি মাথায় আসে।  অপুত্রয়ীর শেষ সিনেমা ছিল " অপুর সংসার "। "অপুর সংসার " এর মধ্য দিয়েই বাংলা চলচ্চিত্র পায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও শর্মিলা ঠাকুরের মত দুই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। 

 

মহারাজার জন্মদিনে

 

অপুত্রয়ীর শেষ সিনেমা নির্মাণের আগে সত্যজিৎ আরো দুটো সিনেমা নির্মাণ করেন। 'পরশ পাথর' ও 'জলসাঘর'। পরশ পাথর ছিল হাস্যরসাত্মক চলচ্চিত্র আর জলসাঘর জমিদারি প্রথার অবক্ষয়ের ওপর নির্মিত দুই সফল চলচ্চিত্র। এছাড়াও সত্যজিৎ আরো অনেক সফল চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তিনি মোট ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তিনি চিত্রনাট্য রচনা ও চরিত্রায়ন থেকে শুরু করে  সঙ্গীত স্বরলিপি রচনা, চিত্রগ্রহণ, শিল্প নির্দেশনা, সম্পাদনা, শিল্পী-কুশলীদের নামের তালিকা ও প্রচারণাপত্র নকশা করাসহ নানা কাজ করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের বাইরেও  তিনি একাধারে কল্পকাহিনী লেখক, প্রকাশক, চিত্রকর, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক ছিলেন। 

 

মহারাজার জন্মদিনে

 

বর্ণময় কর্মজীবনে জিতেছেন নানা আন্তর্জাতিক পুরস্কার, যার মধ্যে বিখ্যাত হল ১৯৯২ সালে পাওয়া একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার (অস্কার), ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান "ভারতরত্ন"এ সম্মানিত হন যা তিনি সমগ্র কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন। এছাড়াও ৩২টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১টি গোল্ডেন লায়ন, ২টি রৌপ্য ভল্লুক অর্জন করেন নিজের বিখ্যাত সব কর্মের সম্মানী সরূপ৷ 

 

মহারাজার জন্মদিনে

 

তাঁর জীবনের কর্ম মাত্রা শুধু যে সিনেমাকে ঘিরেই ছিল এমন নয়, তিনি বেশ কয়েকটি ছোট গল্প এবং উপন্যাস রচনা করেছেন। প্রাথমিকভাবে শিশু-কিশোরদের পাঠক হিসেবে বিবেচনা করে কল্পবিজ্ঞানের উপর নির্মাণ করেন। সেখান থেকেই বিখ্যাত ফেলুদা এবং প্রোফেসর শঙ্কুকে পায় পাঠক মহল। তাঁর নির্মিত এই জনপ্রিয় কাল্পনিক  চরিত্র গোয়েন্দা চরিত্রের উপর চলচ্চিত্র সিরিজও নির্মিত হয়েছে। 

 

মহারাজার জন্মদিনে

 

এত এত সফল কাজের মাঝে তিনি পাশে পেয়েছেন স্ত্রী বিজয়াকে। বেশির ভাগ চিত্রনাট্য বিজয়াই প্রথমে পড়তেন এবং ছবির সঙ্গীতের সুর তৈরিতেও তিনি স্বামীর পাশে থেকে সাহায্য করতেন। 

 

মহারাজার জন্মদিনে

 

বাংলা চলচ্চিত্র জগত এমন ব্যক্তিত্বের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলো৷  চলচ্চিত্র জগতে অন্য মাত্রা যোগ করে দিয়েছিলো তাঁর নির্মিত  দেবী,  মহাপুরুষ,কাঞ্চনজঙ্ঘা, চারুলতা, মহানগর, অরণ্যের দিনরাত্রি, সোনার কেল্লা, হীরক রাজার দেশে, ঘরে-বাইরে, নায়ক ইত্যাদির মত সব সফল সিনেমা।  

 

মহারাজার জন্মদিনে

 

সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষের ভিটা ছিল বাংলাদেশের  কিশোরগঞ্জে কটিয়াদি উপজেলার মসুয়া গ্রামে। তাঁর বাবা প্রসিদ্ধ শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায়। তাঁর ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন সুপরিচিত লেখক, চিত্রকর ও দার্শনিক। সে সময় তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম আন্দোলনের একজন নেতা। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর মায়ের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠেন সত্যজিৎ রায়। বেড়ে উঠার অন্যতম অনুপ্রেরণাও ছিলেন মা সুপ্রভা দেবী। মা-ছেলের সম্পর্কের দিকটা সত্যজিৎ অনেকটা ফুটিয়ে তুলেছিলেন তাঁর ‘অপরাজিত’ সিনেমায়। 

 

মহারাজার জন্মদিনে

 

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ৮ বৎসর বয়সে বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন বিজ্ঞানে।কিন্তু  প্রথম দু’ বছর বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে শেষ বছরে বিষয় পাল্টে তিনি অর্থনীতি পড়েন। ফলে তাঁর লেখাপড়ার সময় দীর্ঘতর হয়ে উঠে। আর তখনই সত্যজিৎ পাশ্চাত্য চিরায়ত চলচ্চিত্র এবং সঙ্গীত নিয়ে এতটাই আগ্রহী হয়ে উঠেন যে, তাঁর মূল পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। শেষ পর্যন্ত তিনি ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে বিএ (অনার্স) পাশ করেন। মায়ের উৎসাহে সত্যজিৎ ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতনে যান এবং সেখানকার কলাভবনে ভর্তি হন। সেখানেও পাঁচবছর পড়াশোনার কথা থাকলেও তা শেষ না করেই কলকাতায় চলে আসেন। প্রথম চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে অক্সফোর্ডের ডিলিট প্রাপ্ত চার্লি চ্যাপলিনের পরে দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে সত্যজিতকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। 

 

মহারাজার জন্মদিনে

 

১৯২১ সালের এই দিনে এই কিংবদন্তি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের শতবর্ষে এই কালজয়ী চলচ্চিত্রকারকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

 

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ