Skip to content

২১শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

২০২২ সালে যাদের হারিয়েছি

নানান উত্থান -পতনের মধ্য দিয়ে কেটেছে ২০২২। একের পর এক নক্ষত্র পতন দেখেছে ২০২২। বছর শেষে তাই একটু চোখ বুলানো যাক কোন কোন নক্ষত্রকে আমরা হারিয়েছি চলতি বছর।

কাজী আনোয়ার হোসেন:
বাংলাদেশী লেখক, অনুবাদক, প্রকাশক, এবং জনপ্রিয় মাসুদ রানা ধারাবাহিকের স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনকে আমরা হারিয়েছি চলতি বছরের শুরুতেই। কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে সেন্ট গ্রেগরি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএ ও বিএ পাস করেন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এমএ পাস করেন।

পড়াশুনা শেষ হওয়ার পর রেডিওতে তিনি নিয়মিত গান গাইতে শুরু করেন। নিয়মমাফিক কোনো প্রশিক্ষণ না নিলেও বাড়িতে গানের চর্চা সবসময় ছিলো। তার অধিকাংশ উপন্যাস ও গল্প বিদেশী কাহিনীর ছায়া অবলম্বনে রচিত। কুয়াশা সিরিজের কুয়াশা-১-এর মাধ্যমে লেখালেখির জগতে বিচরণ ঘটে তার। তিনি ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।

শাঁওলি মিত্র:
ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র ও থিয়েটার জগতের খ্যাতনামা অভিনেত্রী শাঁওলি মিত্র। ছোটবেলা থেকেই নাট্যচর্চা করেছেন শাঁওলি মিত্র। তার বাবা বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্র এবং মা তৃপ্তি মিত্র। বাড়িতেই থিয়েটারের মহড়া চলতো। কখনও কখনও বহুরূপী’র শোয়ের সময় উইংসের পাশ থেকে নাটক দেখতেন শাঁওলী। কমলা গার্লস হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় বহুরূপী নাট্যদলের প্রযোজন্য ‘ছেঁড়া তার’ নাটকে অভিনয় করেন তিনি।

তৃপ্তি মিত্রের পরিচালনায় ‘কিংবদন্তী’, হিমাংশু চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় বাদল সরকারের লেখা ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ নাটকে মিসেস ইথার্নির চরিত্রে কিংবা পরে শম্ভু মিত্রের পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটকে সুরঙ্গমার চরিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। ছোটবেলায় অভিনয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাহিনী অবলম্বনে তৈরি ‘ডাকঘর’ নাটকে অমলের চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পান। পরবর্তীতে বাংলা নাট্য জগতের বিশিষ্ট নাম হয়ে ওঠেন তিনি, নিজের দলও গড়েন শাঁওলি মিত্র। ২০২২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই জানুয়ারি রবিবার দুপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতার বেহালার বাড়িতে ৭৪ বৎসর বয়সে প্রয়াত হন।

বাপ্পী লাহিড়ী:
ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী বাপ্পী লাহিড়ী। সঙ্গীত জগতে তিনি বাপ্পী-দা নামেও সমধিক পরিচিত। তিনি নিজের লিখিত অনেকগুলো গানে কন্ঠ দিয়েছেন। ১৯৮০’র দশকের চলচ্চিত্র বিশেষ করে ডিস্কো ড্যান্সার, নমক হালাল এবং শরাবী’র ন্যায় বিভিন্ন চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করে তিনি সমাদৃত হন। ১৯৭৩ সালে হিন্দী ভাষায় নির্মিত নানহা শিকারী ছবিতে তিনি প্রথম গীত রচনা করেন। এরপর তাহির হুসেনের জখমী (১৯৭৫) চলচ্চিত্রে কাজ করেন।

সমগ্র ভারতবর্ষে তিনি ‘ডিস্কো কিং’ নামে পরিচিতি পান। কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী সুরকার বাপ্পি লাহিড়ী ২০২১ খ্রিস্টাব্দে কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তারপর থেকে তার শরীর ভাল ছিল না। বেশ কিছুদিন তিনি মুম্বইয়ের জুহুতে সিটিকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ২০২২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাত্রি ১১টা ৪৫ মিনিটে ৬৯ বৎসর বয়সে মুম্বাইয়ের হাসপাতালে অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে পরলোক গমন করেন।

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়:
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় নেপথ্য গায়িকা এবং সংগীতশিল্পী, বাংলা সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ। কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী, তিনি ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান বঙ্গবিভূষণ পান এবং ১৯৭০ সালে জয় জয়ন্তী এবং নিশিপদ্ম চলচ্চিত্রে তার গানের জন্য সেরা নেপথ্য গায়িকার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে আগত লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুদের জন্য তিনি ভারতীয় বাঙালি শিল্পীদের সঙ্গে গণ আন্দোলনে যোগ দেন এবং তাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করেন। তিনি বাংলাদেশী সংগীতশিল্পী সমর দাস যিনি বাংলাদেশে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন তার সাহায্যার্থে বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান রেকর্ড করেন। চলতি বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

লতা মঙ্গেশকর:
সাত দশক ধরে দর্শক ও সমালোচকের হৃদয় তৃপ্ত করে চলা ভারতীয় সংগীতের এই কিংবদন্তি ১৯২৯ সালে ভারতের ইন্দোরে জন্মেছিলেন। কিন্তু তাঁর সংগীত ভারত ছাপিয়ে তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বসংগীতের দরবারে। ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ১৯৪২ সালে, মারাঠি গান গেয়ে। ১৯৪৬ সালে তিনি প্রথম হিন্দি সিনেমার জন্য গান করেন। সংগীতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ডের ইতিহাস আশা ভোসলের। তিনি গেয়েছেন প্রায় ১০ হাজার গান। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে এ রেকর্ড ছোট বোন আশার হওয়ার আগে ছিল লতা মঙ্গেশকরের। লতা গেয়েছেন প্রায় ৩০ হাজার গান। লতা মঙ্গেশকর ৩৬টি ভাষায় গান করেছেন। এর মধ্যে আছে বাংলাও। ‘প্রেম একবার এসেছিল নীরবে’, ‘আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন’, ‘ও মোর ময়না গো’, ‘ও পলাশ ও শিমুল’, ‘আকাশপ্রদীপ জ্বেলে’সহ আরও অনেক বিখ্যাত বাংলা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। ২০০১ সালে লতা মঙ্গেশকর ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ভারতরত্ন অর্জন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার লাভ করেন। করোনা পরবর্তী শারীরিক অসুস্থতার কারণে চলতি বছর ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

কৃষ্ণকুমার কুন্নথ (কেকে):
কৃষ্ণকুমার কুন্নথ একজন ভারতীয় নেপথ্য সঙ্গীতশিল্পী, যিনি কেকে নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি হিন্দি, তেলুগু, মালয়ালম, কন্নড়, মারাঠি, গুজরাতি ও তামিল চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন। তিনি ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ট গায়কদের একজন হিসেবে বিবেচিত হন। দিল্লিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা কেকের। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে যখন সংগীতকে পেশা হিসেবে নিতে চাইছেন, তখন তার ভরসা হয়ে ওঠে জিঙ্গেল বা বিজ্ঞাপনের গানে কণ্ঠ দেয়া। সাড়ে ৩ হাজার জিঙ্গেলে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। ১৯৯৯ সালে ভারতীয় ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ খেলতে গেলে ‘জোস অফ ইন্ডিয়া’ শিরোনামের গান তৈরি হয়েছিল। সেটিতে কণ্ঠ দেন কেকে।

কেকে-র জীবনে সিনেমায় গান গাওয়ার প্রথম সুযোগ করে দেন এ আর রহমান। ১৯৯৬ সালে তামিল ছবি ‘কদাল দেশম’-এর ‘কলেজ স্টাইল’ গানের মাধ্যমে তাঁর অভিষেক হয়। এর পর ১৯৯৯ সালে ‘হম দিল দে চুকে সনম’ সিনেমার বিখ্যাত গান ‘তড়প তড়প কে ইস দিল সে…’ গানের মাধ্যমে বলিউডে আত্মপ্রকাশ করেন কেকে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি তাকে। চলতি বছর ৩১ মে কলকাতার এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন কেকে।

দ্বিতীয় এলিজাবেথ:
এ বছর ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ মারা যান। ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় সিংহাসন অলংকৃত করে রাখা দ্বিতীয় এলিজাবেথের বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। কয়েক মাস আগেই তাঁর সিংহাসনে আরোহনের ৭০ বছর উদযাপন করা হয়েছিল। তিনি সারা বিশ্বজুড়েই ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁর মৃত্যুর পরও আলোচনা কোনো অংশে কমেনি। এখনও বিশ্বজুড়ে চলছে আলোচনা সমালোচনা।

প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর পর জনসাধারণের মধ্যে রানির কঠোর সমালোচনা হয়। নব্বইয়ের দশকে কিছু সমস্যায় পড়লেও ২০০০ সালের পরে এসে রানীর জনপ্রিয়তা আবার বাড়তে থাকে। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি যে রাজপ্রাসাদে (লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেস) কাটিয়েছেন, জীবনের শেষ সময়টুকু সেখানে থাকতে পারেননি। লন্ডন থেকে অনেক দূরে স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিনশায়ারের বালমোরাল প্যালেসে ৮ সেপ্টেম্বরে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ