গ্রেটা থানবার্গ

আমাদের স্বপ্ন আর শৈশব কেড়ে নেওয়ার সাহস আপনারা কোথায় পেলেন?

আমাদের স্বপ্ন আর শৈশব কেড়ে নেওয়ার সাহস আপনারা কোথায় পেলেন?
‘জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রভাব পড়ছে সামুদ্রিক ও বন্যপ্রাণীদের উপর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা পৃথিবীর ছয়তম মহাবিলুপ্তির মুখোমুখি। বাস্তুতন্ত্রগুলো ভেঙে পড়ছে। আমরা এক গণবিলুপ্তির মুখোমুখি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ প্রজাতি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিচ্ছে। এর হার স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি। যদি এভাবে প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটতে থাকে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব চরম আকার ধারণ করে বস্তুতন্ত্রগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর আমরা টিকে থাকতে পারব তো? গত ৩০ বছর ধরে বিজ্ঞানের কাছে বিষয়টি একদম পরিষ্কার। আপনারা দেখেও না দেখার ভান করছেন।

ডিজিটাল মিডিয়ার কল্যাণে গান গেয়ে, ছবি এঁকে অথবা ভিডিও আপলোড করে ভাইরাল কিংবা জনপ্রিয় হয়েছেন অনেকেই। বিভিন্ন সময়ে অনেকেই এসেছেন আলোচনার কেন্দ্রে। তবে মাত্র ১৬ বছর বয়সে পুরো পৃথিবীজুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছেন এক সুইডিস কিশোরী পরিবেশবাদী গ্রেটা থানবার্গ। পরিবেশ রক্ষায় গতবছরের আগস্ট মাস থেকে ‘ইয়ুথ স্ট্রাইক’ আন্দোলন শুরু করেছিলেন তিনি। তার ডাকে এই আন্দোলনে জড়ো হয়েছেন ১৫০ দেশের নানাবয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষ। এমন কম মানুষই পাওয়া যাবে যে, তার নাম কখনও শোনেনি।
সর্বশেষ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক সামিটের অংশগ্রহণকারী বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনাদের সাহস কিভাবে হয় আমাদের স্বপ্ন আর শৈশব নষ্ট করার। আপনারা সবাই জানেন, পৃথিবী দিন দিন ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। এরপরও আপনারা এর জলবায়ু সংকটের কারণকে উপেক্ষা করে আসছেন। এখন যখন আমরা ধ্বংসের দিকে যাচ্ছি, তখন আপনারা অর্থ, গল্প-কাহিনি আর আপনাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত।’


২০০৩ সালের ৩ জানুয়ারি সুইডেনের স্টকহোমে তার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ রক্ষা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন গ্রেটা থানবার্গ। তিনি জানান, ২০১১ সালে প্রথম জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে পারেন। তখন তার বয়স মাত্র ৮ বছর। তিনি বুঝতেই পারছিলেন না, বিষয়টি যদি এতটাই গুরুতর হয় তবে কেন এ নিয়ে কিছু করা হচ্ছে না। এর পরবর্তী প্রায় দু’বছর গ্রেটা তার বাবা-মাকে চ্যালেঞ্জ করলেন পরিবারের প্রাত্যহিক কর্মকা-ে কার্বন বর্জ্য ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে। এজন্য পরিবারের সবাইকে তৃণভোজী হওয়ার এবং আকাশপথে সফর বন্ধ করার কথা বলেন।
তবে তিনি কঠোর কর্মসূচি শুরু করেন গত বছর, যার কারণে তিনি পরিচিতি পেতে শুরু করেন জাতীয় পরিসরে। ২০১৮ সালে ১৫ বছর বয়েসি গ্রেটা থানবার্গ সবে পড়তেন নবম শ্রেণিতে। তীব্র প্রবাহ ও দাবানলে সুইডেনের অবস্থা ভয়াবহ। আবহাওয়ার রেকর্ড অনুসারে, ২০১৮ সাল ছিল সুইডেনের গত ২৬২ বছরের মধ্যে উষ্ণতম গ্রীষ্মকাল। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলেই  প্রকৃতি এত  প্রতিকূল হয়ে উঠছে বলে শনাক্ত করেন। তাই ওই বছরের ২০ আগস্ট সিদ্ধান্ত নেন ক্লাসে না গিয়ে ৯ সেপ্টেম্বরের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত আন্দোলন করবেন তিনি।
তার দাবি ছিল, সুইডিশ সরকারকে অবিলম্বে প্যারিস চুক্তির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দেশে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। এজন্য তিনি দেশের পার্লামেন্ট ‘রিকসদাগ’র সামনে টানা তিন সপ্তাহ বসে আন্দোলন করেছেন। তিনি প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে পার্লামেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে যান। শীঘ্রই স্টকহোমের অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও গ্রেটার সাথে যোগ দিতে থাকে। এমনকি তিনি আশপাশ দিয়ে যাওয়া সবাইকে লিফলেটও বিতরণ করছিলেন, যেখানে লেখা ছিল : ‘আমি এটা করছি কারণ তোমরা বড়োরা আমার ভবিষ্যৎ ধূলিসাৎ করে দিচ্ছো।’


গ্রেটার এসব কাজ অনুপ্রাণিত করেছে স্কুলের ছোট ছোট শিশু থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন বয়সের মানুষকে। তারা সম্মিলিতভাবে শুক্রবারকে ঘোষণা করে ‘ফ্রাইডে ফর ফিউচার’ হিসেবে। শিক্ষার্থীদের জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলন এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছে। তার মধ্যে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, লাটভিয়া, হংকংসহ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এত ছোট বয়সে জলবায়ু আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার কারণে এবারের জাতিসংঘ জলবায়ুবিষয়ক ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিট, ২০১৯’-এ বক্তব্য রাখতে আমন্ত্রণ জানানো হয় গ্রেটাকে। কিশোরী গ্রেটা সম্মেলনে অংশ নিতে রাজিও হন। কিন্তু তার শর্ত ছিল, উড়োজাহাজে আসবেন না তিনি। আসবেন এমন কোনো যানে, যেখানে কার্বন নিঃসরণ হবে শূন্যের কাছাকাছি। গত আগস্টে তিনি নিউইয়র্কে পাড়ি জমান।
১৫ দিন ধরে আটলান্টিক মহাসাগরে প্রায় ৩ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান। সেখানে তিনি বক্তব্য দেন, পৃথিবী জেগে উঠেছে এবং পরিবর্তন আসবেই। আপনাদের ভালো লাগুক আর নাই লাগুক। আমাদের মতো ধনী দশগুলো ভোগবিলাসের জন্য পৃথিবীর বায়ুম-ল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। স্যাটেলাইটের গত ৫০ বছরের ছবি প্রমাণ দিচ্ছে সবচেয়ে বেশি বন উজাড় হয়েছে উন্নত দেশগুলোতে। মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নির্গমনের জন্য দায়ী উন্নত দেশগুলোই। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট করছে দরিদ্র দেশের মানুষেরা। কিন্তু আমি অপ্রিয় হওয়ার ভয় পাই না। আমার কাছে ক্লাইমেট জাস্টিস (জলবায়ু বিচার) মুখ্য।


তিনি আরও বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রভাব পড়ছে সামুদ্রিক ও বন্যপ্রাণীদের উপর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা পৃথিবীর ছয়তম মহাবিলুপ্তির মুখোমুখি। বাস্তুতন্ত্রগুলো ভেঙে পড়ছে। আমরা এক গণবিলুপ্তির মুখোমুখি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ প্রজাতি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিচ্ছে। এর হার স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি। যদি এভাবে প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটতে থাকে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব চরম আকার ধারণ করে বস্তুতন্ত্রগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর আমরা টিকে থাকতে পারব তো? গত ৩০ বছর ধরে বিজ্ঞানের কাছে বিষয়টি একদম পরিষ্কার। আপনারা দেখেও না দেখার ভান করছেন।
গ্রেটা নিজেকে টুইটারে ১৬ বছর বয়েসি অ্যাসপার্গার সিনড্রোমে আক্রান্ত একজন জলবায়ুকর্মী হিসেবে পরিচয় দিলেও টাইম ম্যাগাজিনের ২০১৮ সালের বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কিশোর-কিশোরীদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে আলোচিত সুইডেনের ১৬ বছর বয়েসি শিক্ষার্থী গ্রেটা থানবার্গ ২০১৯ সালের ‘বিকল্প নোবেল’ জিতেছেন।