Skip to content

২১শে মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বালিকা দিবসের সেই বালিকা 

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পাশাপাশি ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে প্রতিবছর ৩ জানুয়ারি পালিত হয় বালিকা দিবস। কিন্তু দিনটি অন্য কোনো দিন না হয়ে কেন ৩ জানুয়ারি? এর কারণ ১৮৩১ সালের ৩ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বাই(পূর্বের নাম বোম্বে) থেকে অনেক দূরে অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম নিয়েছিল একটি শিশু। বাবা-মা নাম রাখেন সাবিত্রী। এক অখ্যাত বাগান মালি পরিবারে জন্ম নিয়ে অন্য দশটির মেয়ে শিশুর মতই বেড়ে উঠতে থাকেন সাবিত্রী। লেখাপড়ার তো প্রশ্নই আসে না। তখন উপমহাদেশে মেয়েদের লেখাপড়ার কথা সাধারণ মানুষ কল্পনাই করতে পারে না। তারওপর দরিদ্র মালি পরিবারের সন্তান। লক্ষী আর খান্দুজি পাতিলের সন্তান সাবিত্রীর বয়স যখন নয় বছর তখন বাবা মা চিন্তা করলেন মেয়ের যথেষ্ট বয়স হয়েছে, এখন বিয়ে দেওয়া দরকার। ছেলেও জুটে গেল। সেও মালি পরিবারের ছেলে। তার নাম জ্যোতিরাও ফুলে। বয়স ১৩ বছর। তবে লেখাপড়া করে। 

 

১৮৪০ সালে বিয়ের পর বালিকা সাবিত্রী হয়ে গেলেন গৃহবধু সাবিত্রীবাই ফুলে। স্বামী জ্যোতি রাও লেখাপড়ায় যেমন ভালো, তেমনি মুক্তমনের মানুষ। তিনি তরুণ বয়সেই সমাজ সংস্কারে মন দিয়েছিলেন। রাও নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তার স্ত্রী সাবিত্রী অত্যন্ত মেধাবী। তাহলে কেন লেখাপড়া নয়? ঘরেই শুরু হলো সাবিত্রীর অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা। জ্যোতি রাও দেখলেন, যা পড়ে তাই স্ত্রীর মস্তিস্কে জায়গা করে নেয়। ঘরেই শিক্ষা গ্রহণের পর এক পর্যায়ে সাবিত্রীকে দেওয়া হয় একটি টিচার্স ট্রেনিং প্রোগ্রামে। তারপর দেওয়া হলো আহমেদনগরে আমেরিকান মিশনারি এবং ভারতে নারী শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ সিনথিয়া ফারারের কাছে। সাবিত্রী দেখতে না দেখতে হয়ে উঠলেন একজন শিক্ষিত নারী। অতঃপর তিনিই ভারত উপমহাদেশের প্রথম নারী শিক্ষক ও প্রথম নারী প্রধানশিক্ষক হয়ে উঠলেন। যদিও একই  সময় সগুনা বাই এবং ফাতিমা বেগম শেখ লেখাপড়া করেন। ফাতিমা বেগম শেখও উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম নারী শিক্ষক হিসাবে ইতিহাস হয়ে আছেন।

 

সাবিত্রী রাও ফুলে ছিলেন সত্যিকার একজন মহৎ নারী। তার মানবতাবোধ আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি জীবনভর বাল্য বিয়ে, সতিদাহ প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তখনকার দিনে নানা কুসংস্কারের কারণে মাঝে মাঝেই শিশু হত্যা করা হতো। বিশেষ করে ব্রাহ্মন সমাজে। সাবিত্রী একজন নিম্ন বর্ণের মানুষ হয়েও ব্রাহ্মন নারীদের নিরাপদ প্রসব এবং সেই শিশুদের জন্য কেয়ার সেন্টার গড়ে তুলেছিলেন। একবার তিনি দেখতে পেলেন এক নিম্ন জাতির নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার কারণে এক পুরুষকে হত্যা করার চেষ্টা চলছে। তিনি তাৎক্ষণিক সেখানে গিয়ে জানান, ‘এই প্রেমিককে হত্যা করা হলে ব্রিটিশ আইনে তোমাদের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।  তোমরা তোমাদের নিজের কাজে ফিরে যাও।’ তারা তখন হত্যা পরিকল্পনা থেকে সরে যায়। এ কথাগুলো আজ যেমন সহজ মনে হচ্ছে তা তখনকার দিনে মোটেই সহজ ছিল না।

 

সাবিত্রী শিক্ষতকতার পাশাপাশি সাহিত্য ও কবিতা লিখতেন। ১৮৫৪ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কাব্য ফুলে’ প্রকাশিত হয়। নিপীড়িত মানুষদের, পশ্চাৎপদ সমাজের মানুষদের শিক্ষায় অনুপ্রেরণা দিতে তিনি কবিতা লেখেন,‘ গো, গেট এডুকেশন’ ( যাও, শিক্ষা নাও)। 

 

১৮৯৭ সালে বিশ্বব্যাপী তৃতীয় প্যানডেমিক হিসাবে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বোম্বের অবস্থা তখন মারাত্মক। সাবিত্রী পুনে’র শহরতলীতে একটি হাসপাতাল করেন মানুষের চিকিৎসার জন্য। সাবিত্রী জানতে পারেন তার পরিচিত গায়কোয়াড় পরিবারের ছোট্ট এক শিশু প্লেগ আক্রান্ত হয়েছে। তিনি দ্রুত সেখানে চলে যান এবং সেই ছেলেটিকে নিজের পিঠে চড়িয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।  ছেলেটিকে বাঁচাতে পেরেছিলেন কি না তা জানা যায় না, কিন্তু তিনি নিজে প্লেগ রোগে সংক্রমিত হন এবং ১৮৯৭ সালের ১০ মার্চ দেহত্যাগ করেন।  

 

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ