Skip to content

২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | সোমবার | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ষোলতেই বিশ্ব জয়

ষোল বছর বয়সে অনেকেই হয়ত বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে বসে গেছে আবার শৈশবের চড়ুইভাতি ফেলে সন্তান পালনে ব্যস্ত; কেউ কেউ হয়ত অল্প বয়সে বিয়ের জন্য জগত থেকে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু সেই বয়সেই দোলা আক্তার রেবা নামের এক কিশোরী বিগত দুই বছরে ছয়শত’র বেশি বাল্যবিয়ে বন্ধ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে এসেছেন। সেই গল্প জানাচ্ছেন – অরণ্য সৌরভ। 

 

বয়স মাত্র ১৬ বছর। এই বয়সের ছেলে-মেয়েরা বিদ্যালয়, টিউশন, নাচ-গান বা খেলাধুলায় নিজেদের ব্যস্ত রাখে। আর ফাঁক পেলে হয় গেমস নাহলে আড্ডা। অথচ সেই বয়সেই বিশ্ব জয় করে ফেলল ছোট মেয়ে রেবা। এই অল্প বয়সে অনেকেই হয়ত বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে বসে গেছে আবার শৈশবের চড়ুইভাতি ফেলে সন্তান পালনে ব্যস্ত; কেউ কেউ হয়ত অল্প বয়সে বিয়ের জন্য জগত থেকে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু সেই বয়সেই দোলা আক্তার রেবা নামের এক কিশোরী বিগত দুই বছরে ছয়শত’র বেশি বাল্যবিয়ে বন্ধ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে এসেছেন। 

 

মোহাম্মদ আলেক ও রীনা বেগমের চার সন্তানের মধ্যে রেবা সবার ছোট। মোহাম্মদপুরের কাটাসুরের অলি-গলিতেই রেবার বেড়ে উঠা। তিনি বর্তমানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ফিরোজা বাশার আইডিয়াল কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। 

 

একদিন চলার পথে রাস্তায় অনেক মানুষের ভীর বা মিটিং দেখে হুট করে থেমে যায় রেবা। কৌতুহলী মনে জানতে চায় এখানে কি হচ্ছে? তাদের কার্যক্রমগুলো শুনে ভালো লাগে রেবার। তারপর তিনি ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ পরিচালিত শিশু ফোরামের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। সেটা ২০১৪ সালের কথা। শিশু ফোরামের সাথে যুক্ত হয়ে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম প্রতিরোধসহ, শিশুর শারীরিক মানসিক বিকাশ ও শিশু অধিকার আদায়ে দৃঢ়তায় কাজ করেছেন জাতীয় শিশু ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক দোলা আক্তার রেবা । 

 

২০১৯ সালের ৮ থেকে ১৪ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ওয়ার্ল্ড ভিশন গ্লোবালের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সাত দিনব্যাপী 'চিলড্রেন পার্টিসিপেটিং টু ইন্ডিং চাইল্ড ম্যারেজ' শিরোনামে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। জেনেভার এ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং বাংলাদেশের মেয়েদের নানান সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি এসব হ্রাস ও সমাধানের লক্ষ্যে কি ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা তারা করছে সেটির চিত্রও তুলে ধরেন। 

 

ও, সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে সবার কাছে মূল্যায়ণ পাওয়ার অর্জনটিকে এগিয়ে রাখতে চান তিনি। এরপর এগিয়ে রাখতে চান জেনেভো সফরকে। এ নিয়ে তিনি বলেন, 'আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপহার বা অর্জন যেটাই বলেন সেটা হচ্ছে জেনেভা সফর। এ সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই নতুন রূপে সংগ্রাম ও জীবনকে বুঝতে শিখেছি। রুখে দাঁড়াতে শিখেছি।' ভয়কে জয় করেই দেশ-বিদেশ ও মানুষের মনকে জয় করে ষোল বৎসর বয়সী এই বালিকা এগিয়ে চলেছেন আপন মহিমায়। 

 

বিশ্ব জয় করার ও জীবনের প্রতি পদে পদে অনুপ্রেরণার রাজমুকুটটি সবার প্রথমে দিতে চান মায়ের মাথায়। তারপর অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড জাস্টিস ফর চিলড্রেনের উপ-পরিচালক সাবিরা নুপুর’কে। দোলা বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেন, 'মা-ই আমার চলার পথের সাহস, শক্তি ও প্রেরণা।’

 

ভবিষ্যতে সাংবাদিক হবার পরিকল্পনায় উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে বিদেশের মাটিতে জার্নালিজমে পড়ার ইচ্ছে রয়েছে রেবার। 

 

বাল্যবিবাহের বন্ধের মতো এমন সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনবোধ নিয়ে রেবা বলেন, ‘শৈশব থেকে শিশুরা ছিটকে পড়ছে। যখন তাদের হৈ-হুল্লোড় করে পাড়া-মাঠ-ঘাট কাঁপিয়ে তোলার সময় তখন তাদেরকে পরিবার সামাল দিতে হচ্ছে। এই বিষয়টি প্রথমে আমার মাথায় কাজ করে; তখন ছোট থাকায় বাল্যবিয়ের বিরূপ প্রভাবগুলো সম্পর্কে তেমন জানতাম না। যখন আরেকটু বড় হলাম তখন ধীরে ধীরে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে জানতে পারলাম শিশু ফোরামে যুক্ত হবার সুবাধে। তারপর বাল্যবিয়ে সহ শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আরো কঠোরভাবে কাজে নেমে পড়ি।’

 

বাল্যবিবাহ বন্ধে সুখকর পরিস্থিতির চেয়ে খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখেই পরতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এই কাজটি তার জন্য সহজ ছিল না, সে নানান কায়দায়, জনপ্রতিনিধি, পুলিশসহ বিভিন্নজনের সাহায্য নিয়ে কাজগুলো করেছে, অনেক সময় বিপজ্জনক অবস্থায় সে পড়েছে। এমনও হয়েছে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে রেবা নিজেই এক সপ্তাহের বেশি সময় পাঠশালায় যেতে পারেননি। তবুও অবিচল লড়াইয়ের মধ্যে নাটকীয় ঢঙে, দৃঢ় সংকল্পে নিজেকে হুমকির মুখে ফেলতেও দ্বিধা বোধ করেননি এই কিশোরী। 

 

জেনেভা সফরের অভিজ্ঞতার আলোকে রেবা বলেন, ‘সে দেশে (সুইজারল্যান্ড) দেখেছি যে যার মতো কাজ করছে। কেউ কারো কোন বিষয়ে নাক গলাচ্ছে না। স্বাধীনতায় দিনযাপন করছেন। কিন্তু আমাদের দেশে একটি মেয়ে সন্ধ্যার পর বা ওড়না ছাড়া কেন রাস্তায় বের হল সেটা নিয়ে মাতামাতি। রয়েছে ছেলে শিশু, মেয়ে শিশুর মধ্যে তফাৎ। আমি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সবার মুক্ত স্বাধীনতা থাকবে, বৈষম্য থাকবে না।’ 

 

শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রের কাছে দোলার চাওয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘শিশুদের অভিযোগ শোনার জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয় থেকে পরিপত্র জারি করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত অন্তত প্রতিমাসে একদিন বা কয়েক ঘণ্টা করে হলেও শিশুদের মতামত প্রদান বা অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার একটা ধারা তৈরি করা চাই।’ 

 

ইউনাইটেড নেশনস ফ্যামিলি প্ল্যানিং এসোসিয়েশনের মতে, সারা বিশ্বে প্রতি মিনিটে ১৮ বছরের নীচে ২৩ জন করে বালিকাকে বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় এবং আগামী এক দশকে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ১৩ মিলিয়ন, এর কারণ কোভিড ১৯-জনিত অর্থনৈতিক মন্দা। বাল্যবিবাহের হার পৃথিবীর যে দেশগুলোতে সবোর্চ্চ তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, এখানে অর্ধেকেরও বেশি মেয়েদের বিয়ে হয় ১৮ পেরোনোর আগেই এবং ১৮ ভাগের বিয়ে হয় ১৫ বছর হবার আগে। 

 

ওয়ার্ল্ড ভিশন নামক মানবিক সাহায্য সংস্থাটি শুধু বাংলাদেশ নয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, নেপালসহ সারা বিশ্বের যেসকল দেশে মেয়েদের নানামুখী ঝুঁকি অত্যধিক, সেসব দেশেই তারা মূলত কাজ করে। গৃহীত দান দেয়ার পাশাপাশি, অসচেতন পরিবারগুলোকে নিজস্ব প্রশিক্ষণ আয়োজনের সাথেও তারা যুক্ত করে এবং নারী শিক্ষার পক্ষে জনমত তৈরিতে সহায়তা করে।