Skip to content

৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

অন্ধকারে বন্দী ২৫ বছর; অপরাধ ভালোবাসা!  

প্রেম-ভালোবাসা পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত একটি বিষয়। যুগে যুগে প্রেমের জন্য আত্মত্যাগের ঘটনা নেহাত কম নেই। ইতিহাস ঘাটলেই দেখা মিলে সেসব হৃদয়বিদারক ঘটনার। তেমনি এক কাহিনী নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন। 

 

ফ্রান্সের পইতিয়েরস শহরের অন্যতম সম্ভ্রান্ত এক পরিবারের সন্তান ছিলেন মাদমোজেল ব্লাশ মন্যিয়ের। ১৮৭৯ সালে ব্লাশ মন্যিয়েরের পিতা এমিল মন্যিয়ের এর মৃত্যুর পর তার মা পরিবারের প্রধান হন। তৎকালীন সময়ে একজন রূপবতী এবং গুণী মেয়ে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী ব্লাশ। 

 

তার জন্য তখন বিবাহযোগ্য পাত্র খোঁজা হচ্ছিল। বনেদি পরিবারের মেয়ে বলে কথা, দূর-দূরান্ত থেকে ব্লাশের সাথে গাঁটছড়া বাঁধতে এগিয়ে এসেছিল অনেকেই। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হওয়ায় পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রেখে সম্ভ্রান্ত পরিবারের কাউকেই বিয়ে করতে হবে  ব্লাশকে। 

 

কিন্তু হঠাৎই ব্লাশ খুঁজে পান তার মনের মানুষকে।  ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে পরেন একজন আইনজীবীর সঙ্গে । কিন্তু সেই আইনজীবীর সাথে তার বয়সের ব্যবধান ছিল একটু বেশি, তার চেয়ে বড় বিষয় ছিল যে সেই আইনজীবী ছিল দরিদ্র। আর তার বনেদী পরিবারের আভিজাত্য বজায় রাখতে এই সম্পর্ক মেনে নেওয়ার  তো কোন প্রশ্নই ওঠেনা। স্বভাবতই বাধ সাধলেন তার মা  মাদাম মন্যিয়ের। তিনি ব্লাশের এ প্রণয়কে মেনে নিতে পারেননি, কিন্তু অপরদিকে ব্লাশও তার সিদ্ধান্তে অটল। ভালোবাসার জন্য যেকোনো বাধা মোকাবেলা করতে রাজি ছিলেন ব্লাশ।

 

কথিত আছে, সে সময় ব্লাশ অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন, যা তৎকালীন সমাজের জন্য ছিল ভীষণ কলঙ্কের বিষয়। এমন মুহূর্তে ব্লাশ ঘোষণা দেন যে, তিনি তার প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যাবেন। এতেই চরম  ক্রুদ্ধ হন মাদাম মন্যিয়ের। তিনি তখন তাকে  বলেন, হয় তার প্রেমিককে ত্যাগ করতে নতুবা আজীবন বন্দিদশাকে বেছে নিতে।

 

চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে ব্লাশ বেছে নিয়েছিল তার ভালোবাসা।  তার পরবর্তীতে টানা ২৫ বছর এ সিদ্ধান্তের মূল্যই দিতে হয়েছিল তাকে৷ হঠাৎ একদিন নিখোঁজ হয়ে যান ব্লাশ। গোটা ফ্রান্স তন্নতন্ন করে খুঁজেও তার কোন চিহ্ন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। যেন হাওয়ার সাথে মিলিয়ে গেলো এই তরুণী। 

 

এভাবেই কেটে যায় ২৫ টি বছর৷  ব্লাশ ম্যানিয়ের অস্তিত্বই যেন ধুয়ে মুছে গেছে এতদিনে।  কিন্তু হঠাৎই এলো এক উড়োচিঠি।  ১৯০১ সালের এক সকালে ফ্রান্সের অ্যাটোর্নি জেনারেলের অফিসে একটি চিঠি এসে পৌঁছায়। সে চিঠিতে প্রেরকের নাম বা ঠিকানা, কোনটাই দেয়া ছিল না। সংক্ষিপ্ত এই চিঠি  পড়ে রীতিমতো  চোখ কপালে উঠে গেলো উপস্থিত সকলের। চিঠির লেখা ছিল কিছুটা এরকম – 

 

“মস্যিয়ে অ্যাটোর্নি জেনারেল: আপনাকে একটি অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা সম্পর্কে অবগত করার সুযোগ আমার হয়েছে । আমি এমনই এক তরুণীর কথা বলছি, যে কিনা মাদাম মন্যিয়ের এর বাড়িতে গত ২৫ বছর ধরে বন্দী আছে। অনাহারে থাকা এই কুমারী এতকাল ধরে এক কথায় নিজের বিষ্ঠার মাঝে বাস করছে।”

 

চিঠিটি পড়ে সকলে হতবাক হলেও,  বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি অনেকেরই। কারণ মন্যিয়ের পরিবার ছিল ফ্রান্সের সবচেয়ে বনেদি পরিবারগুলোর অন্যতম। পইতিয়েরস শহরের উন্নয়নের জন্য প্রচুর অনুদান দেন স্বয়ং মাদাম মন্যিয়ের নিজে। তাদের দ্বারা এহেন ভয়ংকর কাজ কীভাবে সম্ভব।

 

আর তার থেকেও বড় ব্যাপার, মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় তার পরিবার। বিশেষ করে মায়ের কোল। এর থেকে নিরাপদ জায়গা বোধহয় পৃথিবীতে দুটো নেই। কিন্তু সেই পরিবারই কি করে ২৫ বছর অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দী করে রাখতে পারে। নিজের মা কিভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে সন্তানকে। এবং ২৫ বছরে একবারও মনে পড়েনি সন্তানকে ক্ষমা করার কথা। আরো অদ্ভুত বিষয় হল, নিখোঁজ ব্লাশকে খুঁজতে থাকা সেই প্রেমিকের মৃত্যু হয় ১৮৮৫ সালে। তবে তারপরও কিভাবে ব্লাশকে আটকে রাখা হয়?

 

এতোসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কর্তৃপক্ষ মন্যিয়ের বাড়িতে পরিদর্শনের জন্য আসে। মন্যিয়ের এস্টেটে প্রবেশ করতে চাইলে প্রথমেই তাদের বাধা দেয়া হয়, এতে তাদের সন্দেহ বাড়লে কয়েকজন অফিসার জোরপূর্বক বাড়িতে প্রবেশ করেন। একসময় খুঁজতে খুঁজতে তারা উপরতলায় চলে আসলে একটি তালাবদ্ধ ঘর তাদের নজরে আসে। এরপর দরজার তালা ভেঙ্গে সেই বদ্ধ ঘরে প্রবেশ করেন। ঘরের ভেতরে ঢুকে আৎকে ওঠেন সকলে৷ 

 

ঘরটি ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার এবং দুর্গন্ধযুক্ত। জানালার গাঢ় পর্দাগুলো ছিল ধুলোয় ধূসরিত এবং প্রচণ্ড ভারি, যেন গত ২৫ বছরে একবারও পর্দাগুলো সরানো হয়নি। পর্দা সরানোর পর জানালার শাটার খোলার সময় দেখা গেল যে সেগুলো ঠিকভাবে খুলছে না, একপর্যায়ে শাটারের প্রতিটি পাত আলাদা করে খোলার ব্যবস্থা করতে হয়। এবং ঘরে আলো প্রবেশের পর যে বিষয়টিতে সবাই ভয়ে আৎকে ওঠেন তা হলে, ঘরের এক কোণায় বিছানার উপরে, সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়, ভয়ে কাঁপছে অত্যন্ত শীর্ণ দেহের এক নারী। নষ্ট হয়ে যাওয়া জাজিমের উপর শুয়ে থাকা এ নারীর সারা দেহ ছিল বিষ্ঠা এবং পচে যাওয়া খাবারে মাখা, বিছানার উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল পোকামাকড় এবং খাবারের উচ্ছিষ্ট।

 

হ্যাঁ, তিনিই ২৫ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সেই নারী, ব্লাশ মন্যিয়ের। পরিবারের অমতে ভালোবাসার জন্য অন্ধকার ঘরে দাম দিতে হয়েছে ২৫ বছর। উদ্ধারকর্মীরা এরপর রুগ্ন ব্লাশকে চাদরে আবৃত করে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। দীর্ঘ বন্দিজীবনের দরুন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন ব্লাশ, ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না তিনি। 
ঘরটির সারা দেয়াল জুড়ে অজস্রবার লেখা ছিল একটি মাত্র শব্দ, ‘Liberte’, যার অর্থ ‘মুক্তি’।

 

 

মন্যিয়ের পরিবারের সকল বিষয়ের উপর চরম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন মাদাম মন্যিয়ের। তার কথামতোই দীর্ঘ ২৫ বছর এ শাস্তি ভোগ করেছিলেন ব্লাশ। বলা হয় ব্লাশের ভাই মার্সেল একসময় বাধা দেবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মায়ের আদেশের অমান্য তিনি করতে পারেননি, করার চেষ্টাও করেননি। মায়ের সাথে বোন ব্লাশের অস্তিত্বকে মুছে ফেলার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন তিনি। 

 

ঘটনা প্রকাশের পর আটক করা হয় ব্লাশের মা ও ভাই দুজনকে।  আটকের ১৫ দিনের মাথায় মাদাম মন্যিয়ের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

 

আদালত ব্লাশের ভাই মার্সেলকে ১৫ মাসের কারাদণ্ড দিলেও মার্সেল নিজে একজন আইনব্যবসায়ী হওয়ায় আপিলের সময় আইনের ফাঁক গলে তিনি বেরিয়ে যান। কিন্তু আদালত থেকে মুক্তি পেলেও জনগণের ক্রোধ থেকে মুক্তি পাননি তিনি। তাই একসময় পরিচয়ে লুকিয়ে বসবাস করা শুরু করেন তিনি।

 

দীর্ঘদিনের বন্দিজীবনের কারণে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন ব্লাশ। তাই স্বাভাবিক জীবনে আর ফেরত যেতে পারেননি এই হতভাগা নারী। জীবনের বাকিটা সময় কাটান হাসপাতালেই। এরপর ১৯১৩ সালে, হাসপাতালেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।