ফেসবুকে সবার জীবন এত সুন্দর, বাস্তবেও কি তাই?

ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ে নানা সুখের ছবি। কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিদেশের দর্শনীয় স্থানে, কেউ নতুন চাকরি পেয়ে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছেন, আবার কেউ পরিবারের সঙ্গে কাটানো সুন্দর মুহূর্তের ছবি প্রকাশ করছেন। কারও সাফল্যের গল্প, কারও নতুন অর্জন—সব মিলিয়ে মনে হতে পারে, পরিচিতদের জীবন যেন আনন্দ আর প্রাপ্তিতে ভরপুর। অথচ নিজের জীবনে যখন দুশ্চিন্তা, ব্যর্থতা কিংবা অনিশ্চয়তা ঘিরে থাকে, তখন অন্যের এসব পোস্ট দেখে মন খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
কখনো কি মনে হয়েছে, সবাই যেন জীবনে এগিয়ে যাচ্ছেন, শুধু আপনি পিছিয়ে পড়ছেন? কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা এই সুখী জীবনের ছবিই কি বাস্তবের সম্পূর্ণ প্রতিচ্ছবি? নাকি সেখানে জায়গা পায় জীবনের বেছে নেওয়া কিছু মুহূর্ত, আর অপ্রকাশিত থেকে যায় ব্যর্থতা, হতাশা ও কঠিন সময়ের গল্প?মনোবিদ এলিয়েজার সোবারের একটি লেখায় উঠে এসেছে এই প্রশ্নেরই গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা দেখায়, মানুষের জীবন কেবল সাফল্যের গল্পে তৈরি নয়। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই জীবনের সেই অংশটুকুই তুলে ধরি, যা অন্যের কাছে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে।
ব্যর্থতার গল্পগুলো আড়ালেই থেকে যায় কেন?
নিজের জীবনের নানা ব্যর্থতা ও অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন এলিয়েজার সোবার। স্কুলে পড়ার সময় পিৎজা সরবরাহের চাকরি হারানো থেকে শুরু করে কলেজজীবনে ফোনে বই বিক্রির কাজে টিকতে না পারা—কর্মজীবনের শুরুতেই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। একবার বই বিক্রির জন্য ফোনে যোগাযোগ করার সময় এক ক্রেতার স্বামীর মৃত্যুর খবর শোনেন সোবার। তারপরও তাঁকে নির্ধারিত বিক্রির স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করতে বলা হয়েছিল। কাজটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানালে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছিলেন, তিনি জীবনে সফল হতে পারবেন না।
এরপরও থেমে থাকেননি সোবার। হটডগ বিক্রি থেকে শুরু করে দোকানের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। পরে দুঃসাহসিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সেখানেও একবার প্রশিক্ষণের সময় নিরাপত্তাবেষ্টনীতে আটকে পড়ার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। ঘটনাটি বসকে মজার ছলে জানানোর পরদিনই চাকরি হারান তিনি। এ ধরনের অভিজ্ঞতা জীবনের বাস্তবতারই অংশ। কখনো পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে না, কখনো চেষ্টা করেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না, আবার কখনো অন্যের আচরণ আমাদের আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের গল্প বলতে গিয়ে এসব অভিজ্ঞতার তুলনায় সাফল্য, আনন্দ ও অর্জনের মুহূর্তগুলোই বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে নিজের জীবনের ভালো-মন্দ দুই দিকই জানলেও অন্যের জীবনের কেবল প্রকাশিত অংশটুকু আমাদের চোখে পড়ে।
অন্যের সুখ দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে হয় কেন?
ধরা যাক, আপনার এক পরিচিত ব্যক্তি নতুন চাকরি পেয়েছেন। আরেকজন ঘুরতে গেছেন বিদেশে। কেউ নতুন বাড়ি কিনেছেন, কেউ আবার পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটাচ্ছেন। একের পর এক এমন পোস্ট দেখতে দেখতে মনে হতে পারে, অন্যদের জীবনে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। অথচ নিজের জীবনে তখন হয়তো চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা, আর্থিক চাপ কিংবা ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা চলছে। তখন অজান্তেই নিজের বাস্তবতার সঙ্গে অন্যের প্রকাশ করা মুহূর্তের তুলনা শুরু হয়।
এই তুলনার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এখানে দুই পক্ষের জীবনের সমান অংশ দেখা হয় না। নিজের ব্যর্থতা, দুশ্চিন্তা, ভয় ও হতাশা সম্পর্কে আমরা জানি। অন্যের ক্ষেত্রে জানি কেবল তিনি যা প্রকাশ করেছেন। একটি সুন্দর ভ্রমণের ছবির পেছনে আর্থিক চাপ থাকতে পারে। নতুন চাকরির খবরের আড়ালে থাকতে পারে দীর্ঘদিনের প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতা। হাসিমুখের পারিবারিক ছবির বাইরেও থাকতে পারে নানা জটিলতা। তবে ছবি কিংবা ছোট্ট একটি পোস্ট দেখে এসব জানা সম্ভব নয়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্য দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করা বাস্তবতার পূর্ণ চিত্রের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্যের সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতার তুলনা করার ফল।
সব কথা প্রকাশ না করলেই কি কেউ ভণ্ড?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ঘটনা প্রকাশ করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পারিবারিক পরিস্থিতি কিংবা মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের কারণে অনেকেই নিজেদের কঠিন সময়ের কথা প্রকাশ করতে চান না। এটি একান্তই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কেউ নিজের আনন্দের মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিলে তাতে দোষের কিছু নেই। একইভাবে, কেউ ব্যর্থতা বা দুঃখের কথা প্রকাশ না করলেও তাঁকে অসৎ কিংবা ভণ্ড বলা যায় না।
সমস্যা তৈরি হয় আমাদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে। অন্যের সুখের ছবিকে যখন তাঁর জীবনের সম্পূর্ণ গল্প বলে ধরে নিই, তখন বাস্তবতা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। কারও হাসিমুখের ছবি মানেই তাঁর কোনো দুঃখ নেই, কিংবা কারও সাফল্যের পোস্ট মানেই তাঁর পথচলা সহজ ছিল—এমন নয়। অন্যের জীবন সম্পর্কে আমাদের ধারণা যত অসম্পূর্ণ, ততই সতর্ক থাকা প্রয়োজন নিজের জীবনকে সেই ধারণার সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রে।
ব্যর্থতার গল্পও হতে পারে অনুপ্রেরণা
জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা সব সময় প্রকাশ করতে হবে, এমন নয়। তবে নিজের ইচ্ছায় ব্যর্থতা, প্রত্যাখ্যান কিংবা প্রতিকূলতার গল্প ভাগ করে নেওয়ার ইতিবাচক দিকও রয়েছে। কেউ যখন নিজের ব্যর্থতার কথা বলেন, তখন অন্যরা বুঝতে পারেন, জীবনে বাধার মুখে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। একটি সুযোগ হারানো, কোনো কাজে সফল না হওয়া কিংবা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া মানেই জীবনের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা অন্যকে সাহস জোগাতে পারে। একই সঙ্গে নিজের জীবনের কঠিন সময়কে নতুন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ তৈরি করে। তবে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কতটা প্রকাশ করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নিজের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী নেওয়াই ভালো। অন্যের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য ব্যক্তিগত কষ্ট প্রকাশের প্রয়োজন নেই।
ফেসবুক ব্যবহারে মন ভালো রাখবেন যেভাবে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সবার পক্ষে সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। তবে এটি ব্যবহার করার সময় নিজের মানসিক অবস্থার দিকে নজর রাখা জরুরি। তুলনা করার অভ্যাস কমান: অন্যের সাফল্যকে নিজের ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখবেন না। প্রত্যেকের জীবনের পরিস্থিতি ও পথচলা আলাদা।
নিজের অগ্রগতিকে গুরুত্ব দিন: অন্যরা কোথায় পৌঁছেছেন, তার বদলে আপনি গত কয়েক মাসে কী শিখেছেন বা কোন বাধা পেরিয়েছেন, তা বিবেচনা করুন।
অনলাইনের বাইরে সময় কাটান: পরিবার, বন্ধু, শখ, বই পড়া কিংবা প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটালে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সংযোগ বজায় থাকে।
যে কনটেন্ট মন খারাপ করায়, তা সীমিত করুন: কোনো অ্যাকাউন্টের পোস্ট বারবার নিজের প্রতি অসন্তুষ্টি তৈরি করলে সেটি কম দেখা বা আনফলো করা যেতে পারে।
নিজের অনুভূতিকে স্বীকার করুন: অন্যের সাফল্য দেখে হিংসা, হতাশা কিংবা মন খারাপ হলে নিজেকে দোষারোপ না করে অনুভূতিটির কারণ বোঝার চেষ্টা করুন।
মনে রাখবেন, একটি পোস্ট কখনো পুরো জীবন নয়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং নতুন কিছু জানার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু সেখানে প্রকাশিত ছবিকে জীবনের সম্পূর্ণ বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। মানুষ সাধারণত যে মুহূর্তগুলো স্মরণীয়, আনন্দের কিংবা গর্বের বলে মনে করেন, সেগুলোই বেশি প্রকাশ করেন। জীবনের অনিশ্চয়তা, ব্যর্থতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের অনেকটাই থেকে যায় পর্দার আড়ালে। তাই ফেসবুকে অন্যের সুন্দর মুহূর্ত দেখে নিজের জীবনকে ছোট করে দেখার আগে মনে রাখা প্রয়োজন, আপনি নিজের জীবনের সম্পূর্ণ গল্প জানেন, কিন্তু অন্যের গল্পের সবটা জানেন না।
সুখী হওয়ার জন্য অন্যের মতো জীবন গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের পরিস্থিতি, সামর্থ্য, সম্পর্ক ও ছোট ছোট অর্জনের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা জীবনের সঙ্গে বাস্তব জীবনের পার্থক্য থাকতে পারে অনেকখানি। আর সেই পার্থক্য বুঝতে পারলেই অন্যের পোস্টের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করে অকারণে হতাশ হওয়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব।



