সাড়ম্বরে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি, মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে প্রতিমা নির্মাণ-সাজসজ্জা

মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে দেবী দুর্গাকে বরণের প্রস্তুতি। শেষ পর্যায়ে প্রতিমা নির্মাণের কাজ। কোথাও চলছে মাটির প্রলেপ দেওয়া, কোথাও প্রতিমায় রং তুলছেন শিল্পীরা। পাশাপাশি মন্দির ও পূজামণ্ডপ সাজানো, প্যান্ডেল নির্মাণ, আলোকসজ্জা এবং আনুষঙ্গিক কাজও চলছে জোরেশোরে। সব মিলিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে।
গত তিন দিনে রাজধানীর কয়েকটি পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। বাঁশ, খড় ও মাটির কাঠামোয় দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছেন প্রতিমাশিল্পীরা। প্রতিমা নির্মাণের পাশাপাশি মন্দির ও মণ্ডপ প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, ছোটখাটো সংস্কার, রং করা এবং প্যান্ডেল ও মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে। বরাবরের মতো এবারও অধিকাংশ মন্দির ও মণ্ডপে পূজার মেলা বসবে। সেসব আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হবে আগামী ১৬ অক্টোবর। চলবে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত। গত শনিবার মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দেবীপক্ষের সূচনা ও দেবীর আরাধনা।
এবার মহাসপ্তমীর তিথি দুই দিন পড়ায় প্রচলিত পাঁচ দিনের পরিবর্তে ছয় দিন ধরে চলবে দুর্গোৎসব। পূজার নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় মহাপঞ্চমীতে দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতার সূচনা হবে। ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীতে সন্ধ্যায় দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মূল পূজা। ১৭ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৮ অক্টোবর অধিক তিথিতে সপ্তমীর পূজা, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী ও কুমারী পূজা এবং ২০ অক্টোবর মহানবমী পালিত হবে। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুর্গোৎসব।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে আগমন করবেন। এর ফল হিসেবে ফসল ও শস্যহানির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, দেবী নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে গমন করবেন। এর ফল হিসেবে শস্যবৃদ্ধির কথা উল্লেখ রয়েছে।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে ব্যাপক প্রস্তুতি
কেন্দ্রীয় পূজা উৎসব হিসেবে পরিচিত ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের দুর্গোৎসব ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। বরাবরের মতো এবারও মন্দির মিলনায়তনের বারান্দায় খোলা শেডের নিচে তৈরি হচ্ছে প্রতিমা। মন্দিরের সামনের মাঠে প্যান্ডেল নির্মাণ এবং মন্দির সাজানোর কাজও শিগগির শুরু হবে।
এ মণ্ডপের প্রতিমা নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছেন প্রতিমাশিল্পী সুকুমার পাল। রাষ্ট্রপতি পদকপ্রাপ্ত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এই শিল্পী ১৯৮৯ সাল থেকে মাঝখানে চার বছর বিরতি দিয়ে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রতিমা নির্মাণ করে আসছেন।
একই ধরনের প্রস্তুতি চলছে রাজধানীর গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের পূজামণ্ডপেও। সেখানে দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ কুমারী পূজার আয়োজন ঘিরেও প্রস্তুতি চলছে।
রমনা কালীমন্দিরে সাজসজ্জার কাজ
রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংলগ্ন রমনা কালীমন্দির ও শ্রীমা আনন্দময়ী আশ্রমের পূজামণ্ডপেও চলছে প্রতিমা নির্মাণের কাজ। মূল মণ্ডপের সাজসজ্জার পাশাপাশি মন্দির ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঠে আলোকসজ্জা এবং অন্যান্য প্রস্তুতি চলছে। মন্দিরসংলগ্ন পুকুর নতুনভাবে সাজানোর কাজও চলছে। পাশাপাশি মন্দিরের প্রধান প্রবেশগেট নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে।
এ মণ্ডপের প্রতিমা নির্মাণ করছেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার প্রতিমাশিল্পী রতন পাল ও তাঁর ভাই বিবেকানন্দ পাল। তাঁদের তত্ত্বাবধানে রমনা কালীমন্দিরের প্রতিমা ছাড়াও ঢাকা মহানগরীর আরও পাঁচটি মণ্ডপের প্রতিমা নির্মাণ করা হচ্ছে মন্দির চত্বরে। সব প্রতিমা নির্মাণ শেষে মহাষষ্ঠীর আগেই সংশ্লিষ্ট মণ্ডপগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
গত ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে রমনা কালীমন্দিরের প্রতিমা নির্মাণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রতন পাল সমকালকে বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে এবার প্রতিমা নির্মাণসহ পূজার সার্বিক ব্যয় অনেক বেড়েছে। খড়, রং, বাঁশ, কাঠ, মাটি ও কাপড়সহ প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণ কিনতে হচ্ছে আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে।
পুরান ঢাকায় উৎসবের আমেজ
পুরান ঢাকার মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতেও চলছে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি। হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত এ এলাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, সূত্রাপুর, শ্যামবাজার, কোতোয়ালী রোড, ঋষিপাড়া দুর্গামন্দির, প্যারীদাস রোড, কলতাবাজার, মুরগিটোলা, মদনমোহন দাস লেন, বাংলাবাজার গোয়ারনগর, জমিদারবাড়ি ও গেন্ডারিয়ার বিভিন্ন অলিগলিতে পূজার আয়োজন চলছে।
ব্যয় কমিয়েছেন আয়োজকরা, বাড়তি নিরাপত্তার দাবি
পূজার আয়োজনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন আয়োজকরা। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, পূজার প্রস্তুতি ভালোভাবেই এগিয়ে চলছে। তবে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় পূজার আয়োজনেও এর প্রভাব পড়েছে। এ কারণে সব মন্দির ও মণ্ডপে গতবারের তুলনায় অন্তত ১০ শতাংশ ব্যয় কমাতে হয়েছে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গত দুই বছরের তুলনায় এবার প্রতিমা ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা অনেক কম। কোনো ঘটনা ঘটার পর সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে জনমনে তৈরি হওয়া শঙ্কা দূর করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আয়োজকরাও সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
গোপাল চন্দ্র দেবনাথ জানান, ঢাকা মহানগরীর ৩৪টি ঝুঁকিপূর্ণ পূজামণ্ডপের তালিকা পুলিশের কাছে দেওয়া হয়েছে। এসব মণ্ডপে বাড়তি নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারক ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি ঢাকা মহানগরীর ১৮ জন সংসদ সদস্যসহ সারাদেশের সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন তাঁরা। শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা আয়োজন ও সম্পন্ন করতে সবার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
সূত্র: সমকাল



