৯ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

চোখ খোলা, অথচ মন অন্য জগতে- কল্পনার জগতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা?

WhatsApp Image 2026-10-08 at 7.44.13 PM

কাজের ফাঁকে হঠাৎ মনে হলো, যদি জীবনটা অন্যরকম হতো! কখনো নিজেকে কল্পনায় সফল মানুষ হিসেবে দেখা, কখনো পছন্দের কোনো জায়গায় ঘুরে বেড়ানো, আবার কখনো বাস্তবে না-ঘটা কোনো ঘটনা নিয়ে মনে মনে গল্প সাজানো—এমন দিবাস্বপ্ন আমাদের অনেকেরই আসে। ব্যস্ততার মাঝখানে কয়েক মুহূর্তের এই কল্পনাবিলাস মনকে কিছুটা স্বস্তিও দিতে পারে।

কিন্তু সেই কল্পনার জগৎ যদি কয়েক মিনিটের বদলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে? যদি বাস্তব জীবনের পড়াশোনা, কাজ, ঘুম, পরিবার কিংবা সামাজিক সম্পর্কের চেয়ে নিজের তৈরি কাহিনিই বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে? তখন বিষয়টি আর সাধারণ দিবাস্বপ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।

মনোবিজ্ঞানে এমন অতিরিক্ত, দীর্ঘস্থায়ী ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন দিবাস্বপ্নকে বলা হয় ম্যালাডাপ্টিভ ডে-ড্রিমিং। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি এখনো স্বীকৃত পৃথক মানসিক রোগ হিসেবে আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণিবিন্যাসে প্রতিষ্ঠিত নয়। গবেষণায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও এর প্রকৃতি ও চিকিৎসা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

যখন কল্পনা বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়

সাধারণ দিবাস্বপ্ন সাধারণত অল্প সময়ের জন্য আসে এবং প্রয়োজন হলে মানুষ সহজেই নিজের কাজে ফিরে যেতে পারেন। কিন্তু ম্যালাডাপ্টিভ ডে-ড্রিমিংয়ের ক্ষেত্রে কল্পনার জগৎ অনেক বেশি বিস্তৃত ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

অনেকের কল্পনায় থাকে নির্দিষ্ট চরিত্র, সম্পর্ক, ঘটনা ও ধারাবাহিক গল্প। কখনো সেই গল্প এতটাই বিস্তারিত হয় যে তা যেন নিজের ভেতরে চলতে থাকা একটি সিনেমা বা ধারাবাহিক নাটক। ব্যক্তি ইচ্ছা করেও সেই কল্পনা থেকে বের হতে পারেন না কিংবা বারবার সেখানে ফিরে যেতে চান।

Advertisements

কখনো কল্পনার সঙ্গে বাস্তব আচরণও যুক্ত হয়ে যায়। কেউ একা একা কথা বলতে পারেন, হাসতে পারেন, মুখভঙ্গি বা হাতের অঙ্গভঙ্গি করতে পারেন। আবার কেউ কল্পনার দৃশ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘরের মধ্যে হাঁটাহাঁটিও করতে পারেন।

কেন মানুষ নিজের কল্পনার জগতে পালিয়ে যান?

গবেষকদের ধারণা, অনেক ক্ষেত্রে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকিত্ব, বিষণ্নতা কিংবা অতীতের কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে সাময়িকভাবে দূরে থাকার একটি উপায় হিসেবে অতিরিক্ত দিবাস্বপ্ন কাজ করতে পারে। বাস্তব জীবনে যখন কোনো পরিস্থিতি অসহনীয় মনে হয়, তখন নিজের তৈরি একটি নিরাপদ বা আনন্দদায়ক জগতে চলে যাওয়া স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই স্বস্তির অভ্যাসই যদি বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তখন সমস্যা তৈরি হতে শুরু করে।

ইসরায়েলি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক ইলাই সোমার ২০০২ সালে ‘ম্যালাডাপ্টিভ ডে-ড্রিমিং’ শব্দটি ব্যবহার করে এ বিষয়ে গবেষণার পথ তৈরি করেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

অতিরিক্ত দিবাস্বপ্নের সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, মনোযোগের ঘাটতি ও অতিসক্রিয়তা, আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা কিংবা অতীতের মানসিক আঘাতের মতো বিভিন্ন বিষয়ের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব সমস্যার কোনো একটি থাকলেই যে ম্যালাডাপ্টিভ ডে-ড্রিমিং হবে, এমন নয়।

আবার অনেক সময় মানুষ নিজের কল্পনার জগতকে এতটাই উপভোগ করতে শুরু করেন যে বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ধীরে ধীরে পিছিয়ে যায়। পড়াশোনা বা অফিসের কাজ জমতে থাকে, পরিবারের সঙ্গে সময় কমে যায়, সামাজিক যোগাযোগে অনীহা তৈরি হয়।

সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলা বড় সতর্কসংকেত

এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো। কয়েক মিনিটের জন্য কল্পনায় ডুব দেওয়া কখন যে এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় পেরিয়ে যায়, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না।

এরপর শুরু হয় অপরাধবোধ। ‘এতক্ষণ কী করলাম?’—এই প্রশ্ন থেকে নিজের ওপর বিরক্তি, হতাশা কিংবা আত্মগ্লানি তৈরি হতে পারে। রাতে বিছানায় যাওয়ার পরও কল্পনার গল্প চলতে থাকলে ঘুমের সময় কমে যেতে পারে। ফলে পরদিন ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।

দীর্ঘ সময় বসে বা শুয়ে থাকার কারণে শারীরিক সক্রিয়তাও কমে যায়। একপর্যায়ে বাস্তব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের বদলে কল্পনার চরিত্রের সঙ্গেই বেশি সময় কাটানোর প্রবণতা তৈরি হলে একাকিত্ব আরও বাড়তে পারে।

কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়?

অতিরিক্ত দিবাস্বপ্ন যদি জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করতে শুরু করে, তাহলে প্রথমেই নিজেকে দোষারোপ না করে সমস্যাটিকে বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। কোন পরিস্থিতিতে বেশি কল্পনায় ডুবে যাচ্ছেন, তা খেয়াল করা যেতে পারে। একাকিত্ব, নির্দিষ্ট গান, সিনেমা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা মানসিক চাপ—কোনটি আপনার ক্ষেত্রে ট্রিগার হিসেবে কাজ করছে, তা লিখে রাখলে উপকার পাওয়া যাবে।

Advertisements