Skip to content

২৮শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আকাশের ঈদ ভ্রমণ

একে একে ফোন করতে লাগলো আকাশ। চাঁদ, তারা, উল্কা, নিহারীকা, পালসার, সপ্তর্ষি, ছায়াপথ সবার কাছে। চাঁদকে বললো, আগামীকাল আমরা সবাই তোমার বাড়িতে আসছি। তোমার বাড়িতে একটা মিটিং করতে চাই। তুমি প্রস্তুত থেকো। পরের দিন আকাশ সবাইকে নিয়ে হাজির হলো চাঁদের বাড়ি। চাঁদ বললো, ‘কী ব্যাপার বন্ধু? কিছুই তো জানালে না।’ আকাশ বললো, সব কিছু জানতে পারবে বন্ধু। চিন্তার কোনো কারণ নেই। এরপর সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে এক জায়গায় বসলো। আকাশ বললো, তোমরা তো জানো, আমার বন্ধু বসুমাতার কোনো খোঁজ নেই না প্রায় শতবছর হয়ে গেলো। জানি না, সে কেমন আছে। কিভাবে তার দিন যাচ্ছে। বেশ কয়েক মাস ধরে আমার মনটা কেমন আনচান করছে ওকে দেখার জন্য। ঈদের তো বেশি দিন বাকি নেই, আমার ইচ্ছা এবার ঈদ ভ্রমণে বসুমাতার কাছে যাবো। ওকে দেখা হবে, আবার আমাদের ভ্রমণও হবে।

সবাই খুশিতে একসঙ্গে লাফিয়ে উঠলো। আকাশ মনে মনে ভীষণ এক্সাইটেড। শতবছর পর তার প্রিয় বসুমাতাকে দেখবে। কত প্রশ্ন তার মনে হতে লাগলো। কেমন আছে আমার বসুমাতার সবুজ অরণ্য, নদী, সাগরের শীতল পানি, পাখির কলতান, ফলের সমারোহ, মমতা-মাখা মৃত্তিকা, মানুষের ভালোবাসা আরও কত কী! শত বছরে হয়তো আরও শতগুণ সুন্দর হয়েছে আমার বসুমাতা। যাই হোক, একবারে ওকে সারপ্রাইজ দেবো। এই ভেবে সে কিছু জানালো না। সেইদিন রাতে আকাশের ভালো ঘুম হলো না। তড়িঘড়ি উঠে পড়লো। সবাই যথাসময়ে হাজির হলো। আনন্দ উল্লাস করে একসঙ্গে খাবার খেয়ে নিলো। এরপর মেঘের ভেলায় চড়ে বেরিয়ে পড়লো বসুমাতাকে দেখার উদ্দেশ্যে। খুশিতে গান ধরলো সবাই, ‘আজ নির্ঘুম চোখে জেগে ছিলাম তোমাকে দেখবো বলে।’


হৈ-চৈ করতে করতে তারা বসুমাতার বাড়িতে পৌঁছালো। বসুমাতার দ্বারে কড়া নাড়ালো আকাশ। বসুমাতা রুগ্‌ণ কণ্ঠে কাঁপতে কাঁপতে বললো, কে? আকাশ বললো, আমরা। দরজা খোলো। বসুমাতা দরজা খুলে সবাইকে দেখে অবাক হলো। সে বললো, তোমরা! এত বছর পর? কী দেখতে এসেছ? আমার দুর্ভাগ্য? আমার ভগ্ন শরীর? এখন আর কী হবে দেখে? ওরা সবাই অবাক হলো বসুমাতাকে দেখে। এ কী অবস্থা! আকাশ বললো, চিন্তা করোনা বন্ধু। আমরা তোমাকে সুস্থ করে তুলবো। বসুমাতা বললো, কিভাবে সুস্থ করবে আমাকে? সব কিছু শেষ হয়ে গেছে। আকাশ ঈদের মজার মজার খাবারগুলোও বসুমাতার জন্য আনলো। আকাশ বললো, বসুমাতা, আমরা সাতদিন তোমার এখানে থাকবো। সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখবো। আমরা নদী সাগর থেকে মাছ ধরে মজা করে রান্না করে খাবো। এরপর পাহাড়-পর্বত, অরণ্য সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখবো। বসুমাতাকে ঈদের মজার খাবারগুলো খাওয়ালো। বসুমাতার খাওয়া শেষ হলে ওরা একসঙ্গে গল্প- গুজব করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লো।

পরের দিন নদীতে মাছ ধরতে গেলো। নদীর মাঝখানে দেখলো ফসলের চাষ। নদীতে কোনো পানি নেই। মাঝখানে উঁচু করে করে বাঁধা। আকাশ বললো, এভাবে কারা নদীকে পুকুর বানালো? বসুমাতা বললো, আমার সম্পদ এখানকার মানুষের দখলে। ওরা চমকে গেলো। অবাক হয়ে বললো, তা কী করে সম্ভব? এটা তো বসুমাতার সম্পদ। এখানে কারও হস্তক্ষেপ চলবে না। সে বন্ধুদের বললো, ভেঙে দাও সব বাঁধ।নদী চলবে তার আপন গতিতে।এখানে কোনো বাঁধ চলবে না। তারা বাঁধ ভেঙে দিলো। নদীর করুণ অবস্থা দেখে আহত হলো সবাই। পরের দিন তারা সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য রওনা হলো। সমুদ্রপাড়ে মানুষের ভিড় দেখতে পেলো। লোক সরিয়ে দেখলো সমুদ্রের কিছু প্রাণী মরে পড়ে আছে। আকাশ দলবল নিয়ে সাগরে নেমে পড়লো। খানিকটা গিয়ে পালসার বললো, এই দেখো, কী যেন একটা ভেসে আসছে। ওরা খুব খুশি। ভেবেছিল সামুদ্রিক কোনো বড় মাছ হবে হয়তো। কাছে আসতেই দেখলো প্লাস্টিকের বস্তা। সবাই হতভম্ব হয়ে গেলো। মাছ আর ধরা হলো না। খুব কষ্ট মনে বাড়ি ফিরে এলো ওরা।

পরের দিন সকালে আকাশ তড়িঘড়ি উঠে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়লো বসুমাতার ম্যানগ্রোভ দেখার জন্য। সেখানে গিয়ে তারা ভীষণ মর্মাহত হলো। ঘন সবুজ অরণ্য আর নেই। কিছু পাখি তাদের অসহায় দৃষ্টি নিয়ে ওদের দেখছে। দূরে একজোড়া শিয়াল ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে হন্য হয়ে খাবার খুঁজছে। আকাশ বললো, এটা কী করে সম্ভব! বসুমাতার বনভূমি তো অর্ধেকের বেশি উজাড় হয়ে গেছে। হায় হায়! কিভাবে বসুমাতাকে আমরা বাঁচাবো? একবুক কষ্ট নিয়ে ফিরে এলো ওরা। রাতে খাবার সেরে সবাই এক জায়গায় বসলো। বসুমাতার করুণ পরিণতির কথা সবাই ভাবতে লাগলো।

অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস মহামারি এই সবই একমাত্র বৃক্ষ-নিধনের কারণে হচ্ছে। জানি না, বসুমাতার জন্য আরও কত ভয়ঙ্কর দিন অপেক্ষা করছে! বিশ্ব-পরিবেশ আজ বিপর্যস্ত ও হুমকির সম্মুখীন। না না, এভাবে চলতে পারে না। আমাদের চোখের সামনে আমাদের প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে মরে যেতে দিতে পারি না। উল্কা, সপ্তর্ষি, নীহারিকা বললো, তাহলে আমরা কী করতে পারি? আকাশ বললো, আমরা তো শেষ চেষ্টা করতে পারি। আমরা আরও কিছুদিন বসুমাতার কাছে থাকবো। জনসচেতনতা সৃষ্টি করবো। যেভাবেই হোক বৃক্ষ-অরণ্য বাঁচাতেই হবে।বৃক্ষ বাঁচলে দেশ বাঁচবে।দেশ বাঁচলে বসুমাতা বাঁচবে। শুধু হাউমাউ, কান্নাকাটি করলে তো দেশ আর সবুজ হয়ে যাবে না। একে সফল করতে হলে দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। বসুমাতার সারাবিশ্বে ৭৭০কোটি সন্তান। যদি প্রত্যেকে একটি করে গাছ লাগাই তাহলে তো বসুমাতা বেঁচে যাবে। আকাশ বললো, যাক আর কথা নয়, এখন শুধু কাজ আর কাজ। এই বলে সে সবার কাজ ভাগ করে দিলো।


*পালসারকে বললো, তুমি টেলিভিশন, মিনিপর্দায়, বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে উপস্থাপন করবে সন্ধ্যায় সাতটায়। এই খবরটা সারাবিশ্বের মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠাবে।
*উল্কা, তুমি এলাকায় এলাকায় মাইকে প্রচার করবে।

  • ছায়াপথ, তুমি পোস্টার বিলি করবে।
  • সপ্তর্ষি, তুমি সভাসমিতি- সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করবে।
  • চাঁদ, স্কুল- কলেজের পাঠ্যপুস্তকে অধিক হারে প্রবন্ধ রচনা করবে।
  • তারা,পতিত জমির হিসাব দেবে এবং বিনামূল্যে গাছের চারা বিতরণ করবে।
  • নক্ষত্র, তুমি ছাত্রসমাজ, জনগণকে দেশপ্রেমিক করে গড়ে তোলার জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। মনে রেখো, দেশের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে কখনো কিছু করা সম্ভব নয়। কারও জন্য কিছু করতে গেলে ভালোবাসা ব্যতিত হতে পারে না।
  • সবশেষে সূর্যকে বললো, তোমাকে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেবো। সেটা হলো, মুখোশধারী দেশপ্রেমিকদের খুঁজে তালিকা করবে। যারা দেশমাতৃকার জন্য কোনো উপকার না করে শুধু নিজের স্বার্থের জন্য দেশের সম্পদ ধ্বংস করে, বিদেশে অর্থপাচার করে তাদের ধরে আনবে। তাদের অর্থ-সম্পদ সমস্ত হস্তগত করবে। তা দিয়ে সারা বিশ্বে সবুজ অরণ্য তৈরি করবে। অক্সিজেন দেবেনা ওই সব বেজন্মাদের। তোমার তাপে পুড়িয়ে কয়লা করবে যাতে সেই কয়লা দিয়ে আরও ধীরে ধীরে ওদের বেশি করে জ্বালানো যায় একটু একটু করে ওদের কর্মসূচি এগুতে থাকলো।একটা নতুন স্বপ্ন, একটা নতুন আশা যেন বসুমাতার প্রাণ সঞ্জীবিত করলো। বসুমাতা আবার ফিরে পাবে তার যৌবন, অফুরন্ত সৈান্দর্য, মধুর নিকুঞ্জ। সবার চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো আকাশ। তাদের কাজ শেষ করে সবাই আবার খুশির গান গাইতে গাইতে মেঘের ভেলায় ভেসে গেলো।