Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কাদামাটির বিমূর্ত শিল্পের কারিগর তোশিকো তাকায়েজু

তোশিকো তাকায়েজু

তোশিকো তাকায়েজুকে বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিমূর্ত শিল্পী হিসেবে গণ্য করা হয়। বিমূর্ত শিল্পে নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুপ্রেরণা এবং সমসাময়িক শিল্প-কাঠামোকে চিত্রশিল্প এবং ভাস্কর্যে ব্যবহার করেছেন নতুন ধরণের প্রকাশভঙ্গিতে।

তবে তার বৈশিষ্ট্য ঠিক ছবি আঁকাতেই নয়। মূলত তিনি ব্যবহার করেছেন মৃৎশিল্পের কাজ। সাধারণ কুমোরের মতোই চাকা ব্যবহারে প্রথমে নির্মাণ করেছেন পাত্র। আর সেই পাত্রকেই রূপ দিয়েছেন ভাস্কর্যে। এই কাজগুলোকে তিনি নাম দিয়েছেন ‘ক্লোজড ফর্ম’। তার কাজগুলোকে কেউ বলেন ভাস্কর্য আবার কেউ কেউ বলেন মাটির পাত্রে আঁকা পেইন্টিং।

সে যাই হোক। তাকায়েজু পরীক্ষণে বিশ্বাসী ছিলেন। সেই সময়ে অনেকেই অবাক হয়েছিলো। একজন নারী এত বড় বড় ভাস্কর্য তৈরি করছেন? হ্যাঁ, সমসাময়িক অনেককেই তাক লাগিয়েছিলেন তাকায়েজু। কিন্তু এতদূর আসার পথে শুধুই কি জন্মগত প্রতিভা? সম্ভবত না।

১৯২২ সালে তোশিকো তাকায়েজু হাওয়াইয়ের পিপিয়েকেওতে জন্ম দেন। বাবা -মা শিনজা এবং কামা তাকায়েজু জাপান থেকে আমেরিকায় অভিবাসন করেছিলেন। সেখানে তাদের এগারো সন্তানের একজন তাকায়েজু। আমেরিকায় এলেও নিজের সংস্কৃতিকে বিসর্জন দেয়নি তাকায়েজুর পরিবার। জাপানের গতানুগতিক জীবন-ধারা মেনে চলতো বাড়ির সকলে। আর এদিকে হাওয়াইয়ের প্রকৃতির মাঝে আস্তে আস্তে বেড়ে উঠছিলেন তিনি।

পশ্চিমা এবং প্রাচ্যের শিল্পপদ্ধতি আর দর্শনকে সমন্বয় করার সহজাত একটি মনোভাব তার গড়ে উঠেছিলো। শিল্পকে তিনি সাদামাটা কাজের মতোই নিয়েছিলেন। তার মানে এই নয় যে তিনি গুরুত্ব কম দিয়েছেন। তার কাছে মাটি দিয়ে নির্মাণ করা এই পাত্রগুলো তার প্রাত্যহিক জীবনের অংশ।

তিনি বলেন, ‘এই ভাস্কর্যগুলো বানানোর সাথে আমি রান্নাবান্না কিংবা বাগানে কাজ করার সাথে কোনো ফারাক খুঁজে পাইনা। প্রত্যেকটার সাথেই প্রত্যেকটার আন্তঃসম্পর্ক আছে। তাছাড়াও কাদামাটি নিয়ে কাজ করার পেছনে একটি কারণ আছে। এই কাজে আমার ভীষণ আনন্দ লাগে। জীবনে অনেক প্রশ্নের উত্তর আমি এখানে খুঁজে পাই।’

নিজের পাঁচ দশকের দীর্ঘ শিল্পী-জীবনে বিভিন্ন রকমের পাত্রের এক সংগ্রহশালা বানিয়েছেন। অধিকাংশ সময়ে উলম্ব বদ্ধ মাটির পাত্র বানিয়েছেন। প্রথমদিকে তিনি চাকায় কাদামাটি বসিয়ে ভাস্কর্য নির্মাণ করতেন। পরবর্তীতে লক্ষ্য করলেন এতে হচ্ছেনা। তাই হাতে কাদামাটির পাত্র নির্মাণের পদ্ধতি খুঁজতে শুরু করেন। এতে চাকার গোল আকৃতির নাগপাশ থেকেও তার ভাস্কর্য মুক্তি পেয়ে গেলো।

প্রতিটি পাত্রেরই আকার ও আকৃতি অনেকটাই এক। কিন্তু তবুও প্রতিটি চিত্রশিল্প অনেক ভিন্ন। পাত্রের উপর আঁকা প্রতিটি ছবিই যেন এদের আলাদা করে তুলেছে। অনেক হাতে গড়া ছবি তো ছয় ফিট উঁচুও হয়েছে। মূলত বিমূর্ত ত্রিমাত্রিক আকৃতির উপর চিত্রশিল্পের ব্যবহারে যে জগত তিনি নির্মাণ করেছেন তা যে কাউকেই অবাক করতে বাধ্য।

তাকায়েজুর শিল্পকলা বিষয়ে কোনো বিশেষ উচ্চশিক্ষা ছিলোনা। শুধু পশ্চিমা এবং প্রাচ্যের মধ্যকার সমন্বয় সাধনের অনুপ্রেরণা। তাই তার প্রতিটি শিল্পকর্মই অনন্য হয়েছিলো। কোনো নিয়ম বা ব্যাকরণের চাপে পিষ্ট হয়ে গতানুগতিক হয়নি। তবু নিজের এই কাদামাটির কারসাজি তিনি অন্যদের মাঝেও ছড়িয়েছেন। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ২৩ বছরের শিক্ষকতায় অনেক মানুষকেই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। নতুন করে দেখতে শিখিয়েছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও দেখেছেন বীভৎসতা। তখনো নতুনভাবে তিনি তার ভাস্কর্য দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছেন নানা অভিব্যক্তি। নিজের বর্ণিত জীবনে যেমন অনেককেই কাজ দিয়ে মুগ্ধ করেছেন। অন্যকে এই কাজে যোগ দেয়ারও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। হয়তো এই শতকেও তিনি নিজের শতক উদযাপন করতে পারতেন। কিন্তু ২০১১ সালেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন অন্যতম প্রতিভাধর এই শিল্পী।

অনন্যা/এআই