Skip to content

২রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৭ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

‘বাবা-মা যা করেন, ভালোর জন্যেই করেন’

জনৈক সার্টিফিকেটধারী অশিক্ষিত আমাকে একদা বলেছিলেন- মাথার উপরে ছাদ আর প্লেটে ভাত দেওয়ার জন্য সন্তানের বাবা মা'র প্রতি কৃতজ্ঞতায় ম'রে যাওয়া উচিৎ।

 

এই সার্টিফিকেটধারী অশিক্ষিত আবার কন্যা সন্তানের পিতা। তার কন্যার জন্য আমার প্রচণ্ড প্রচণ্ড প্রচণ্ড  সমবেদনা, পৃথিবীর সর্ব-নিকৃষ্ট মানসিকতার একজন মানুষকে পিতা হিসেবে পাওয়ার জন্য। 

 

মাথার উপরে ছাদ আর প্লেটে ভাতই যদি সব কিছু হ'তো, তাহলে- চৈতি চন্দ্রিকা,  প্যারেন্টাল এবিউজ( অভিভাবকের নিপীড়ন) –এর একজন ভিক্টিম, আত্মহত্যা করতেন না। এটা হত্যা, না আত্মহত্যা সেটা ময়নাতদন্তে আসবে। কিন্তু আমার বিচারে, এটা যে কোন আঙ্গিকে হত্যাই- পিতা-মাতার অত্যাচারের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ফলাফল এটা।

জানে বাঁচায় রাখাকে যারা পিতামাতার দায়িত্ববোধের চূড়ান্ত ভাবেন, এবং যারা মনে করেন, কেবলমাত্র এইটুকুর জন্যই—পিতামাতাকে পেডেস্টালে বসিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত পূজা দিতে হবে —তাদের নর্দমার মত মানসিকতার জন্য আমার প্রচন্ডভাবে সমবেদনা ও করুণা রইলো।আমি কামনা করি— তারা নিজেদের মানসিক বৈকল্যকে অনুধাবন ক'রে, দ্রুত মনো-বিশেষজ্ঞ-এর হেল্প নিয়ে সহমর্মিতাহীন বিষাক্ত সাইকোপ্যাথ থেকে দ্রুত একজন কম্প্যাশনেট সুস্থ মানুষ হ'য়ে উঠুক।

 

এরকম একটা সোশ্যাল সিস্টেম, যেখানে ডিগ্রীধারীরাই সবচে' বড় মূর্খ,  সেই সিস্টেমে পিতামাতার দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তোলাটা ব্যর্থ একটা প্রচেষ্টা। তারপরেও আমি আমাদের সমাজের প্রশ্নাতীত অথরিটি( প্রশ্নাতীত অধিপতি)'র বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবো। আত্ম ও পরিস্থিতি সচেতনতা ছাড়া তো পরিবর্তন অসম্ভব!

 

এক্ষেত্রে আরেকটা বিষয় উল্লেখ করা খুবই জরুরি – নারীদের নিরাপদ আশ্রয় আমাদের সমাজে— পিতামাতাই। আমাদের রাষ্ট্র নাগরিকদের মৌলিক চাহিদার দায়িত্ব নেয় না, এবং নারীদের ন্যুনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনাই। নারীদের জীবন এখানে তাই সস্তা। রাষ্ট্রের প্রতি নিরাপত্তার এই দাবীটা খুবই খুবই খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ভীষণ/লক্ষ্য। সেই সাথে পিতামাতার আশ্রয়টাই যেহেতু আজ অবধি একটা রিয়েলিস্টিক আশ্রয় নারীদের, সেইখানে সুস্থ পরিবেশের দাবীটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

 

এখানে আবারও উল্লেখ্য, শ্বশুড়বাড়ীকে নারীদের আল্টিমেট আশ্রয় হিসেবে সমাজে দেখা হলেও – শ্বশুড়বাড়ি আইডিয়ার গোড়াতেই গলদ, তাই এটাকে আমি মোটেও নিরাপদ আশ্রয় ভাবতে পারি না, কোন যুক্তিতেই না। সেখানে নারীদের— স্বামীকে খেদমত করার একটা কাজের লোক, আর বংশ-রক্ষার ফ্যাক্টরি'র বাইরে মানুষ হিসেবে ভাবা হয় না। নারীর ন্যুনতম হিউম্যান ডিগনিটির অস্তিত্ব স্বীকারের ধারনাটা– প্রথাগত শশুড়বাড়ির চৌহদ্দিতেও নাই।এটা অনস্বীকার্য অপ্রথাগত, উদার ও আধুনিক মানুষ, এই সমাজেও আছেন, কিন্তু তারা রেয়ার।

 

আপনার কন্যার পেছনে, তার স্বামীর ও শশুড়বাড়ির ইমোশনাল ও অর্থনৈতিক ইনভেস্টমেন্ট নাই-ই। আপনার আছে।  এই আপনিই যখন তাকে উপযুক্ত সমাদর করতে পারেন নাই; যারা তাকে পালেন নাই, পুষেন নাই,তারা কীভাবে করবে? আমি শ্বশুড়বাড়ির সুস্থ পরিবেশের দাবীটাকে তাই অতি উচ্চাশা ও অযৌক্তিক দাবী মনেকরি।বাবা মা'য়েরা কন্যাদের যত্ন করতে পারলে কার সাধ্য আছে, তাকে খাটো করবার?

কন্যা সন্তানের প্যারেন্টিং এর প্রথাগত নীতি হচ্ছে—“পুরুষদের স্বার্থ ও বংশরক্ষার জন্য, পরিবারে কন্যাদের এক প্রকার গ্রুমিং, তথা এনিম্যাল ফার্মিং করা।” যেমনটা কোরবানির গরুকে মোটাতাজা করা হয়, অধিক মাংশ-উৎপাদনের লোভে, বিষয়টা অনেকটাই তেমন। মেয়েদের পরিবার নামক খোঁয়াড়ে পালন-পোষণ করা হয়,শশুড়বাড়ির কোরবানির পশু হিসেবে বলি দেওয়ার উদ্দেশ্যে। 

 

কন্যাদের প্রতি অবহেলার মূলে, এই জঘন্য দগদগে লিঙ্গবাদী পিতৃতান্ত্রিক কু-মানসিকতার অস্তিত্বকেই আমি দায়ী করবো।

 

এই মানসিকতার বিলোপে রাষ্ট্র সরাসরিই ভূমিকা রাখতে পারে। যদি পুত্র ও কন্যা সন্তানকে প্রোপার্টির উত্তরাধিকারী হিসেবে সমান অর্থনৈতিক মূল্য প্রদান করা হয়, তখন হয়তো আমাদের প্রতিপত্তি-লোভী/ স্ট্যাটাস-হোর, পিতামাতারা কন্যার অর্থনৈতিক মূল্য উপলব্ধি ক'রে তাদেরকে এম্নিতেই গুরুত্ব দেবেন। নারী ও পুরুষের সমান পৈতৃক-সম্পত্তির গুরুত্বটা তাই অপরিসীম। একটা সেক্যুলার রাষ্ট্রেও কেন ক্যানোনিক্যাল নিয়মে সম্পত্তির বন্টন হবে— এটা আমার বোধগম্য না। সেক্যুলার রাষ্ট্রে স্টেট প্রোপার্টি ল' নির্ধারণ করবে, কাস্টম না।

 

মানুষ যেখান থেকে বেশী লাভের আশা করেন,সেখানে বেশী বিনিয়োগ করেন, আর যার পিছে বেশী বিনিয়োগ করেন, তাকে বেশী ভালোবাসেন।

“শশুড়বাড়ির জন্য মোটাতাজাকরণ” ও  “পুত্র সন্তান বংশের উত্তরসুরী” কেন্দ্রিক ধারনায় কন্যা সন্তান থেকে লাভের চিন্তা কম থাকে বিধায় বিনিয়োগ-ও কম করা হয়। এই মানসিকতার ফলাফলস্বরূপ— মেয়ের জামাই-এর সোশ্যাল পারসেপশন হ'লো – তারা দেবতা, আর পুত্রবধূ হ'য়ে দাঁড়ায় কামের ছেমড়ি, কন্যা হ'লো বোঝা, আর পুত্র হ'লো সোনার চামুচ। এইজন্য কন্যারা বাড়ে অবহেলায়, বাঁচে অবহেলায়।

 

বাংলাদেশে মুসলিম নারীরা নামকাওয়াস্তে কিছু পৈতৃক সম্পত্তি পেলেও (যেটা কীনা কেবল কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ), হিন্দু রীতিতে এই ২০২১ সালেও বাংলাদেশে, নারীরা তো কোন পৈতৃক সম্পত্তিই পায়ই না, তাই তাদের প্রতি পারিবারিক অবহেলার প্রকাশটাও হয় —চূড়ান্ত। 

 

আমাদের কালচারে, পিতামাতার নিপীড়নকে রোমান্টিসাইজ করা হয়। কে কত বাপ-মায়ের মাইর খাইসে- সেইটা নিয়ে আহ্লাদে আটখানা হ'য়ে আমরা একটা বিষাক্ত কালচারের চক্র জারি রাখি। টক্সিক আচরণকে আহ্লাদ দিয়ে প্রশ্রয় দিয়েন না,বরং একে সনাক্ত করতে শিখুন। অন্যদেরও এই বিষয়ে সচেতন করুন প্লীজ।একজন এবিউসিভ মানুষকে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিতে উদ্বুদ্ধ করুন। এবিউজকে কক্ষণো নরমালাইজ করবেন না,গ্লোরিফাই তো করবেনই না। নয়তো এভাবে অসংখ্য তাজা প্রাণ ও সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটবে।

প্লীজ, আপনাকে কন্যা রতনটির রক্ষক হয়ে উঠুন, হন্তারক হয়েন না। আপনার নাড়িছেঁড়া ধনটির মূল্য আপনি না দিতে পারলে, আর কেউ দেবেনা। 

 

আর কন্যারা, আপনারা প্যারেন্টাল এবিউজ/পিতামাতার নিপীড়নের বিরুদ্ধে গলার স্বর ওঠান৷ নির্ভীক ও নির্লজ্জভাবে আওয়াজ তুলুন। আপনাদের এই স্বরই খুব ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও পরিবর্তন আনবে। হয়তো বা, শেষ হ'য়ে যাওয়ার আগেই গলার স্বরটা তুললে,কাউকে কাউকে রক্ষাও করা যাবে।