Skip to content

১০ই মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ২৭শে বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সর্ষে ক্ষেতে ভূত 

মর্তুজ আলীর সর্ষে ক্ষেতে ভূত! ভয়ংকর রকমের কুৎসিত ভূত! বাপ রে বাপ কী বীভৎস তার অট্টহাসি! ভূতটার সেই হাসি সুনামির মত ঢেউ তুলেছে দেবীপুর গ্রাম থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায়। লাখ লাখ মানুষ দেখছে সেই ভিডিও। ভূতের ভিডিও! ফেসবুক লাইভের সেই ভিডিও দেখে অনেকের কলিজার পানি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। দেবীপুর গ্রাম এখন দেশবাসীর কাছে খুব পরিচিত এক নাম। একরাতেই দেবীপুরকে সবাই 'ভূতের গ্রাম' হিসেবে চিনে।

 

একদিন আগেও দেবীপুর গ্রামে দূরদূরান্ত থেকে শত শত লোক আসতো। সরিষাক্ষেতে হলুদ রঙের ফুল দেখে তারা বিমোহিত হতো। সবুজ মাঠে হলুদের রাজত্ব, মৌমাছির গুঞ্জন এবং পেছনে বিস্তৃত নীল আকাশ- সব মিলিয়ে স্বর্গীয় এক দৃশ্যপট। সেই দৃশ্যকে নিজ চোখে দেখার জন্য প্রত্যন্ত এই গ্রামে ভ্রমণপিয়াসী মানুষের ঢল নামতো। দেবীপুরে নানান বয়সের মানুষের সমাগম হতো। এতো মানুষের সমাগম দেখে গ্রামের রাস্তার দুই পাশে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকানপাট। পাঁচ ছয়টা খাবারের দোকান, দুইটা হস্ত শিল্পের দোকান ও তিন চারটা মণ্ডা-মিঠাইয়ের দোকান। সারি সারি সেই দোকানে তরুণ তরুণীদের আনাগোনাই বেশি থাকে। দর্শনার্থীরা সরিষাক্ষেতে দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে- নানান এঙ্গেলে ছবি তোলে। সরিষাক্ষেতে তোলা ছবিগুলো তারা ফেসবুকে আপলোড করে। সেই পোস্টগুলো লাইক কমেন্টের বন্যায় ভেসে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে দেবীপুর রাতারাতি  এখন টুরিস্ট স্পট হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দেবীপুরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে শীতলক্ষ্যা নদী। শীতলক্ষ্যার স্বচ্ছ জলে ছোট্ট ছোট্ট ডিঙি নৌকায় চড়ে শেষ বিকেলের সোনা ছড়া আলোয় অবগাহন করে দর্শনার্থীরা। সব মিলিয়ে অনন্য এক দেবীপুরকে দেখতে আসে হাজার হাজার দর্শনার্থী।

 

মর্তুজ আলী এসব দেখে। ভালোই লাগে তার। কত রঙ বেরঙের মানুষ। কত বিচিত্র তাদের বেশভূষা। মর্তুজ আলী একটা বিষয় খেয়াল করছে যে, দর্শনার্থীদের মধ্যে তরুণ তরুণীর সংখ্যাই বেশি। তাদের বেশিরভাগই মোটরসাইকেল চেপে আসে। আসার সময় ভোঁ ভোঁ শব্দে গ্রামের কাঁচা মাটির রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে আসে। নীরব নিস্তব্ধ সেই দেবীপুর এখন সবসময় মানুষে মানুষে গমগম করে। মোটরসাইকেল, টমটম, সিএনজির শব্দের জন্য ইদানীং পাখিদের কিচিরমিচির আওয়াজ শোনা যায় না। কিছু পাখি মনে হয় দূরে কোথাও চলে গেছে। গ্রামের বউ-ঝিয়েরা বাড়ির কাজ কাম রেখে আনবাড়িতে দাঁড়িয়ে শহুরে মানুষগুলোর তামাশা দেখে।দেবীপুর গ্রামের প্রান্তিক কৃষক মর্তুজ আলী সবকিছু দেখে। নিবিড়ভাবে দেখে। চিরচেনা গ্রামটাকে তার কাছে আজকাল অচেনা মনে হয়। প্রথম প্রথম মর্তুজ আলীর কাছে বিষয়টা ভালোই লাগতো। কোনো দর্শনার্থী গ্রামে আসলে গ্রামের সবাই তাদেরকে অতিথি হিসেবে আপ্যায়ন করতো। প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা করতো। কিন্তু এখন গ্রামবাসী আর সহ্য করতে পারছে না। দিনে দিনে দর্শনার্থীদের অত্যাচার ও যন্ত্রণার মাত্রা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। সরিষার গাছগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। শিনা টানটান করে দাঁড়ানো সেই সবুজ সরিষার গাছগুলোকে দর্শনার্থীরা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। ক্ষেতের দিকে চোখ গেলেই মর্তুজ আলীর বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। টনটন করে বুকটা ব্যথা করে। করিম মোল্লার কাছ থেকে ধার করা টাকার সুদও দ্রুত বাড়ছে। বর্গাচাষী মর্তুজ আলী এ বছর তিন বিঘা জমিতে ভালো জাতের সরিষা চাষ করেছে। কৃষি অফিসার নিজে এসে দেখে পরামর্শ দিয়ে গেছে তাকে। সেই অনুসারে গাছের দেখাশোনা করছে সে। তরতর করে বড় হয়েছে গাছগুলো। কলাবতীর গাছের মত হলুদ ফুলে ভরে গিয়েছে সরিষা গাছের শাখাপ্রশাখা। গাছের দিকে তাকালেই বুঝা যায় এবার সরিষার বাম্পার ফলন হবে। আজকাল মর্তুজ আলীর ঠোঁটে হাসি লেগেই থাকে। সে স্বপ্ন দেখে এবার সব ঋণ তার পরিশোধ হয়ে যাবে। ভালোই চলবে সংসার। সামনেই বাদলা দিন। ঘরটাও মেরামত করা প্রয়োজন। তাই রোজ সকাল কাস্তে হাতে নিয়ে সে ছুটে যায় মাঠে। ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করে। সরিষার গাছগুলোকে দেখে মর্তুজ আলীর পরাণটা শীতল হয়ে আসে। হঠাৎ একদিন পরিযায়ী পাখির মত কয়েকজন তরুণী শহর থেকে কমলপুর আসে। আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে। সরিষাক্ষেতের মনভোলানো সৌন্দর্য দেখে তারা বিভিন্ন স্টাইলে নিজেদের ছবি তোলে। তারপর সেই ছবিগুলো তারা ফেসবুকে পোস্ট করে এবং সেই ছবিগুলো হু হু করে ভাইরাল হয়ে যায়। তারপর থেকে পিঁপড়ের মত দলে দলে মানুষ আসতে থাকে দেবীপুর গ্রামে। দর্শনার্থীরা আসে সরিষাক্ষেত দেখার জন্য। দারুণ কিছু ছবি তোলার জন্য!

 

গতকালও কমলপুরে হাজার হাজার মানুষ এসেছিল। সরিষা ক্ষেতে ছবি তুলেছে। কিন্তু ঘটনাটা ঘটে ঠিক মাগরিবের আগে আগে। এই সময়ে নাকি ভূতেরাও নড়েচড়ে বসে। বাতাসে বাতাসে তখন ঘুরে বেড়ায়। সন্ধ্যার ঠিক আগে মানুষের চাপ খুব কম ছিল। তিন চার জন তরুণ তরুণী ছিল। তারা মর্তুজ আলীর প্রথম প্লটে ছবি তুলছিল। তাদের মধ্যে একজন নাকি ফেসবুক লাইভে সংযুক্ত ছিল। ঠিক তখনই ভূতের ঘটনাটা ঘটে। ইয়া বিশাল এক ভূত সরিষা ক্ষেতের একদম মাঝখানে দুই পাশে দুই পা চেগিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। প্রায় তেইশ সেকেন্ড সময়। ভূতের কপাল বরাবর একটা বিশাল চোখ থেকে লাল আলো ঠিকরে বের হচ্ছিল। সেই আলো রক্তের মত লাল। দেখে মনে হচ্ছে যেন ভূতটা রাগে গরগর করছে। হঠাৎ বিকট শব্দে হাসতে থাকে ভূতটা। বিদঘুটে সেই হাসি শুনে যে যার মত প্রাণটা হাতে নিয়ে দিলো দৌঁড়। তারপর থেকেই সেই তিনজন দর্শনার্থী হাসপাতালে ভর্তি আছে। তাদের মধ্যে দু'জনের জ্ঞান ফিরেছে। একজনের  জ্ঞান এখনো ফিরেনি!

 

পরদিন সকাল সকাল মর্তুজ আলী ঘুম থেকে ওঠে। তার চোখেমুখে তুমুল খুশির ঝিলিক। সর্ষে ক্ষেতে ভূতের লঙ্কা কাণ্ড দেখে যখন সবাই অজ্ঞান হওয়ার মত উপক্রম। তখনো মর্তুজ আলী হাসছিল! অদ্ভুত সেই হাসি ঢেউ তুলেছিল তার ভাঙা ঘরটায়! তার বউও তার সাথে সেই হাসিতে শরীক হয়েছিল। মানুষটা আসলেই একটা পাগল! মর্তুজ আলী বারবার টাকাগুলো গুনছে। হ্যাঁ, তিনশত নব্বই টাকাই আছে। টাকাগুলো সে লুঙ্গির কোঁচড়ে গুঁজে গঞ্জের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। তাকে সুজন সাউন্ডের দোকানে যেতে হবে। গতকালের কিছু টাকা বকেয়া ছিল তার। সেই টাকা পরিশোধ করতে যাচ্ছে সে

 

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ