Skip to content

৫ই মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ২২শে বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মুখোশ

হাসপাতালটাতে একটুক্ষণ আগেও অনেক গমগম আওয়াজ ছিল। কিন্তু হঠাৎ সব যেন একটু ছমছমে হয়ে গেল। 

 

সৈকতকে দেখে এক ডাক্তার মুখে যে অভিব্যক্তি এনেছিল সেটা আমরা দিয়ে থাকি কোনো কাছের মানুষের মৃত্যুর খবর শোনার পর। ছেলেটা মাত্র এসএসসি শেষ করেছে। আমারই ক্লাসমেট। ওকে আমিই নিয়ে এসেছি এই হাসপাতালে, ওর ফোন থেকে ওর পরিবারকে কল দিয়ে এনেছি। আমার খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড না। বলতে গেলে ও আমার ফ্রেন্ডও না। এমনি শুধু পরিচিত। তবে ও ছেলে হিসাবে খুব একটা ভালো বলা যায় না। ওর শাহীন নামের একটা ফ্রেন্ডও এসেছে, ওকেও চিনি। এসএসসির জন্য যে কোচিং এ পড়তাম সেখানেই ওদের দুইজনের সাথে আমার পরিচয়। কথা হয়েছিল দুই একবার। তবে সৈকতের সাথে প্রথম কথা বলাটাও একটা কাহিনী। 

শাহীন আমাকে দেখে চিনেছে। কাছে এসে বললো, "কেমন আছো রবি?" আমি মুখে কোনো হাসি না এনে বললাম, "এই যেমন দেখছো।" ও আবার আমাকে প্রশ্ন করলো, কি হয়েছিল? কাহিনীটা কি? 

আমি শান্ত গলায় বলে গেলাম, "আমি প্রায় বিকালেই সাইকেল নিয়ে বের হই বিকেলের দিকে ঘুরতে। আজ একটু বেশি দূরে চলে গিয়েছিলাম আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়েই যাচ্ছিল। চার্চের অই জঙ্গলের মাঝের রাস্তাটুকুতে এমনে দিনের বেলাতে মানুষের আনাগোনা থাকলেও রাতের দিকে থাকে না মনে হয়। ওইটুক রাস্তা পার করার সময় আমার সাইকেলের চেন পড়ে যায়। তখনই আমি জঙ্গলে সৈকতকে দেখতে পাই। খুবই খারাপ অবস্থায় পড়েছিল। কেউ খুব খারাপভাবে ওকে মেরেছে। আমি খুব ভয় পেয়ে যাই, পরে ওকে নিয়ে হাসপাতালে চলে আসি।" 

"ওর ক্ষতগুলা কেমন? মানে কি দিয়ে মারছে বুঝতে পারছো?" "ভাই, যে মারছে খুব নির্মম ভাবে মারছে রে ভাই। ওই শালায় কোনো মানুষ না। ওর ডান হাত কেটে ফেলছে একদম কাঁধ থেকে আর বাম হাত এর কবজি কেটে ফেলছে।" "ইশ,থাক প্লিজ বইলো না" বাদ দাও। 

আমি দেখতে পেলাম শাহীনের চোখে পানি চলে এসেছে৷ বন্ধুর কিছু হলে আসলে ছেলেরা মেনে নিতে পারে না। ওর পরিবারের সবাইকে কান্না করতে দেখলাম। ওর বড় ভাই দেখলাম ওর মেঝো ভাইকে কেঁদে কেঁদে চিৎকার করে বলছে, "ওকে কত করে বলতাম এইসব গেঞ্জাম এ না জরাইতে, নেতা হবে সে। রাজনীতি মারায় এই বয়সে। আসছে কোথাকার রাজা, এখন এইভাবে বেচে থেকে কি লাভ!" আমার খুব মায়া লাগছিল ওর মাকে দেখে। ঠিক তখন ওর মেঝো ভাই বললো, কে করেছে একবার জানতে পারি, একদম ছেঁচে ফেলবো, কুচি কুচি করে কাটবো।" ব্যাপারটা ভেবে হতাশ লাগলো আমার। ছোট ভাইয়ের ভুলটাই সে আবার কর‍তে যাচ্ছে হয়তো। 

শাহীন আমাকে জিজ্ঞেস করলো, "তোমার সাইকেল তো বাহিরে দেখলাম না!" আমি বললাম, "ওকে নিয়ে তো সাইকেলে আসা আমার জন্য সম্ভব ছিল না তাই ওকে নিয়ে আমি রিকশায় আসি আর আমার এক বন্ধুকে কল দিয়ে আমার সাইকেলটা নিয়ে যেতে বলি।" "ভালো করেছো ভাই।" এমন সময় সৈকতের মা আসলো আমার কাছে, শাহীন আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সৈকতের মা আমার কাছে এসে বললো, "দেখো বাবা তোমাকে তো আমি চিনি না৷ সৈকতের সাথে তোমাকে কখনো দেখিও নি। নাম কি তোমার বাবা?" 

শাহীন বলে ওঠলো, "কাকি ও রবি, আমাদের সাথে এসএসসির আগে কোচিং করতো, কোচিং এর টপার ছিল। অনেক ভালো ছেলে।" আন্টি তার জ্বলজ্বলে চোখ দিয়ে আমাকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে একটা মুচকি হাসি দিল, আর বললো, "তোমাকে কি বলে ধন্যবাদ দেই, ওকে তুমি বাঁচিয়েছ। তোমার এই ঋণ শোধ করা কি আমার পক্ষে সম্ভব?" "আন্টি কি যে বলেন না, এসব একদমই ভাববেন না। আপনি বসুন একটু ঠাণ্ডা হোন আর সৈকতের জন্য দোয়া করুন।" আন্টি আবার তার ছেলের পাশে গিয়ে বসে রইলেন। 

শাহীন বললো, "তোমার সাথে সৈকতের যে একটু দ্বন্দ্ব হয়েছিল, তারপরও যে ওকে তুমি নিয়ে হাসপাতালে এসেছ। আসলেই ভাই তোমাকে কি বলে ধন্যবাদ দেই৷" "একটু দ্বন্দ্ব হয়েছিল বলেই ওকে ওই অন্ধকার জঙ্গলে চিনতে পেরেছি, আর আনতে পেরেছি। ওইদিনের দ্বন্দ্বটা হওয়া আজকের জন্য দরকার ছিল যা ঘটে ভালোর জন্যই। ওসব ভুলে যাও তো।" "কাকি কে তো দ্বন্দ্বটার ব্যাপারে বলতে পারলাম না, তাহলে সৈকত ওর মার কাছে খারাপ হয়ে যাবে।" "হুম, ভালো করেছো না বলে বাদ দাও!" 

আমার সাথে সৈকতের একবারই কথা হয়েছিল। আর সেটাও ছিল মনোমালিন্য। সেটা ছিল কোচিং শুরু হওয়ার প্রথম দিকের একটা দিন। আমি ক্লাস করছি, সৈকত ও ক্লাস করছে, বিভিন্ন কথায় ক্লাসে হাসাহাসি হচ্ছে। এমন সময় ক্লাসে এক স্যার আসে। এই কোচিং এ আমার বড় বোনও পড়তো তাই সে আমাকে চিনতো। সে আমার বড়বোন সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, "এই রবি, তোর আপু এখন কিসে পড়ে রে?" আমি উত্তর দিলাম, "স্যার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।" "ময়মনসিংহ?" "জী" "কোন ইয়ার?" "থার্ড ইয়ার" "এই কয়দিন আগেই তোর বোনকে পড়ালাম আজ শুনি সে ভার্সিটি থার্ড ইয়ারে পড়ে, দিন কিভাবে পার হয়ে যায়! বস" আমি বসলাম। সৈকত আমার সামনের বেঞ্চে বসেছিল। পেছনে ঘুরে জিজ্ঞেস করলো, "তোর বোন দেখতে কেমন রে?" প্রশ্নটা করে ও হাসছিল। 

আমার বুকে একটা মোচর দিয়ে দিল। আমার মনে হলও ওকে আমি দেয়ালে আছরাই। আমি বললাম, "হাত ঘুরাইয়া একটা চড় লাগামু। সামনে তাকা।" ও আক্রমণাত্মক হয়ে বললো, "কি বলস তুই? কারে মারবি?" আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। ও আবার বললো, "কথা কস না ক্যান? কি কইলি তুই? কারে মারবি? চিনস তুই?" আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি ওর নিশ্চিত পাওয়ার আছে, আমি আজ ছুটির পর মারও খেতে পারি, এসব ছেলেদের সৃষ্টিকর্তা কেন বাঁচিয়ে রাখে। এসব ভাবছিলাম তখনই শাহীন এসে আমাদের মাঝে সব মিটমাট করানোর ট্রাই করে আর সৈকতকে ঠাণ্ডা করে। 

সৈকত সামনে ঘুরতে ঘুরতে বললো, ওর মত পোলা মারব আমারে চড়? মারতো না খালি, ওরে মাইরা মুতাইয়া বাসায় পাঠাইতাম।" যেকোনো টিনেজ ছেলের এই কথাগুলা গায়ে লাগে, আমারও লাগলো কিন্তু আমি ভুলে গেলাম ভাবলাম এই দেশে এমনেই বাচা লাগবে। উপায় নাই কোনো। তারপর আর সৈকতের সাথে আমার কথা হয় নাই। আমিও আর এসব নিয়ে মাথা ঘামালাম না। পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম৷ 

ডাক্তার বের হয়ে এল, সৈকতের বড় ভাই দৌড়ে গেল। ডাক্তার বললো, "হি ইজ ওকে নাও, কিন্তু ও কখনো কথা বলতে পারবে না। ওর জিহ্বা কেটে ফেলা হয়েছিল। আর দুই হাতও কেটে ফেলেছে। অপারেশনটা খুবই কঠিন ছিল৷ আর ১০ মিনিট পরে আনলে ওকে বাচানো সম্ভব ছিল না। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে৷ এখনো জ্ঞান ফেরেনি ওর" "ওকে কি আমরা দেখতে পারি?" জী"।

 

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ