Skip to content

১০ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ২৬শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

হৃদয়ে শিখা অনির্বাণ

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ উন্নয়নশীল দেশে নারী জাগরণ ও নারী মুক্তির কথা বলা বা কাজ করা বড্ড দুরূহ ব্যাপার, তবুও শুরু করেছি পথ চলা নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা সামনে আসবে জেনেও। 'জাগো নারী ফাউন্ডেশন' মূলত আমার চেতনায় দীর্ঘদিনের লালিত সুপ্ত আগ্নেয়গিরির এক অনির্বাণ বহ্নিশিখা। বহুযুগ ধরে যে শিখা ধারণ করেছি, রক্তের কণায় কণায় বিশ্বাসের গভীরে কিন্তু পরিবেশ, পরিস্থিতি পারিপার্শ্বিকতা অনুকূলে না থাকায় সুপ্ত চেতনাগুলো সুপ্তই রয়ে গিয়েছিলো। জাগ্রত করার চেষ্টা যে করিনি তা নয়, যতবারই সচেষ্ট হয়েছি, স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির, ততবারই পুরুষতন্ত্রের আধিপত্যবাদের কাছে ভেঙে খান খান হয়ে গেছে আমার সাজানো স্বপ্নগুলো। অবশেষে ৩০শে জুন ২০০৩ সালের সেদিনটি এলো আমার জীবনে, দিনটি শুভ বলবো না অশুভ বলবো সে কথা নিজেকে বহুবার প্রশ্ন করেও উত্তর খুঁজে পাইনি— হ্যাঁ এই বিশেষ দিনটিতেই আমাকে কর্মস্থল (একটি আধা সরকারি সংস্থা) হতে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের মিথ্যে আবরণে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়েছিল। এই নির্মম নিষ্ঠুর, নিরঙ্কুশ পুরুষতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারিতায় পদানত হল লৈঙ্গিক বৈষম্যের সকল মাত্রা। স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার সেই অবাঞ্ছিত ও অপ্রীতিকর কাহিনীর ইতিবৃত্ত তুলে ধরে কাগজের কলেবর বাড়ানোর মতো মন-মানসিকতা এই মুহূর্তে আমার নেই। তবে কর্মজীবনের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমণে জীবনের অমসৃণ ভঙ্গুর অসুন্দর দিকগুলো খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল বলেই বেদনাবোধটা এত তীব্রতর।

 

কর্মজীবনের শুরু হতেই অধীনস্থ নারী কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও বৈষম্য ও বঞ্চনার নানা ঘটনা প্রবাহ আমার হৃদয়ের কোমল অনুভূতিগুলোকে ভীষণভাবে তাড়িত করেছে। বিশেষ করে যখন প্রত্যক্ষ করতাম একই সমান শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেধা, মননশীলতা নিয়ে একজন নারী ও পুরুষ একই পদে কাজে যোগদান করেও পুরুষ কর্মচারী যথাসময়ে পদোন্নতি পেয়ে যায়, মহিলা সহকর্মীকে পেছনে ফেলে তার চেয়ে দুই, তিন ধাপ উপরে উঠে গেছে অথবা সহকর্মী মহিলা-কর্মজীবী একযুগ ধরে কিংবা তারও বেশি একই পদে অবস্থান করে আসছে। 

 

অবিশ্বাস্য হলেও এই ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েও নারীরা মুখ ফুটে তাদের প্রতি কৃত অন্যায় অবিচারের প্রতিকার দাবি করার সাহস পর্যন্ত কেউ কোনোদিন সঞ্চয় করতে পারেনি। প্রতিবাদ করতে গিয়ে অবশেষে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় নীরবে নিভৃতে সকল প্রকার বৈষম্য বঞ্চনাকে মেনে নিয়ে জীবন জীবিকার তাগিদে কাজ করে চলেছে আপন মনে।

 

বাংলাদেশে ১৮ কোটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৫০% নারী। অথচ ৫০% নারী অধ্যুষিত এই দেশটিতে নারী হয়ে আসছে শোষিত, বঞ্চিত, অবহেলিত ও উপেক্ষিত। একবিংশ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে নারীর সমান অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের বিষয়টি আজও প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে আছে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম প্রণীত সংবিধানে নারীর সমান অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকলেও সাংবিধানিক এই ঘোষণার সাথে দেশে প্রচলিত আইনসমূহ যথেষ্ট অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই বৈষম্যপূর্ণ আইনগুলো মূলত নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় বাধা। একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষিত ও নিষ্ক্রিয় রেখে কোন দেশ বা জাতি আশানুরূপ সাফল্য বা অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না। পারে না জাতীয় জীবনে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে। 'জাগো নারী ফাউন্ডেশন' এই সত্যকে দৃঢ়ভাবে শুধু বিশ্বাসই করে না গভীরভাবে উপলব্ধি ও চেতনায় ধারণ করে। তাই মানসিক অবচেতন থাকা এই জনগোষ্ঠীকে জাগ্রত করার মাধ্যমে তাদের জাতীয় উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির অংশদারিত্ব দায়বদ্ধতা উদ্বুদ্ধকরণের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আত্মনিবেদিত 'জাগো নারী ফাউন্ডেশন'।

 

এই উপমহাদেশে তথা দক্ষিণ এশিয়ায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সকল প্রকার উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা, বিপ্লব, বিদ্রোহ, গণআন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, সর্বশেষ '৭১-এর মুক্তি সংগ্রামে গৌরবময় অবদান রেখেছেন। যে দেশে মহীয়সী বেগম রোকেয়া, বেগম সুফিয়া কামাল, প্রীতিলতা ওয়াদার, কল্পনা দত্তের মতো নারী জন্মগ্রহণ করেছেন, যে উপমহাদেশের শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, ফাতেমা জিন্নাহ, শ্যামাভো বন্দরনায়েকে, তদীয় কন্যা চন্দ্রিমা কুমারাতুঙ্গা, সোনিয়া গান্ধী, মরহুম বেনজীর ভুট্টো, মমতা ব্যানার্জি, অং সান সুকি, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মতো সংগ্রামী নারীরা জন্মগ্রহণ করেছেন সেই দেশে তথা উপমহাদেশের নারীরা কোন অবস্থাতেই অবদমিত সংকুচিত বা শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে থাকতে পারে না। তাই নারী আন্দোলন ও নারী নেতৃত্বের গৌরবময় ইতিহাসের পথ ধরে প্রগৈতিহাসিকতার সকল অন্ধকার পেরিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে— নারীর প্রতি সকল প্রকার দমন, নিপীড়ন, নির্যাতন, নিষ্পেষণ বৈষম্য ও বঞ্চনামুক্ত সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব পরিমণ্ডল গড়ার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এতদাঞ্চলের পুরুষদের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান, আসুন সমাজ সংস্কার ও সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে নারীর অধিকার ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় আমাদের সকল সংগ্রামী অভিযাত্রায় যুক্ত হয়ে অকুণ্ঠ সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করুন, আমাদের উজ্জীবিত, উদ্দীপ্ত করুন। প্রজ্বলিত করুন আমাদের ভেতরের ধারণকৃত চিরন্তন শিখা অনির্বাণকে । বিশিষ্ট দার্শনিকের ভাষায় অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বিশ্বের সকল আন্দোলনরত নারীদের উদ্দেশে বলতে চাই, 'Awake rise up the women falk, your courageous caravans must change your planet.') Virgin Wolf এর ভাষায়, 'জেগে উঠে দাঁড়াও মানবী সাহসী পদচিহ্নে তোমার পূর্ণ হোক পৃথিবী'।

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ