বালিখলা’র সৌন্দর্য

বালিখলা’র সৌন্দর্য
বাড়ি পৌঁছে,জম্পেশ খানাদানা শেষে এক ঘুম। পরদিন ফজর পরেই ভাগি। গন্তব্য ধনুনদীর তীর বালিখলা। সঙ্গী এবার লেখক মুস্তাফিজ মারুফসহ ছয়জন। গ্রামের পথ ধরে বাইক চলে। চামড়া বন্দর ক্রস করে বালিখলা ভেড়িবাঁধ যেতেই, আনন্দে চোখেমুখে হাসির ঝিলিক। বিশাল জলরাশির মাঝে পিচকরা সড়কে এগিয়ে যাই। বাতাসের ঝাপটা এসে ক্লান্তি দূর করে। যতদূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি।

ঠিক করলাম, মটর বাইকে চড়ে ৬৪ জেলার নানান প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো দেখব। তারিখটি ছিল ১০ আগস্ট। সঙ্গী দে-ছুট ভ্রমণ সংঘর সদস্য মারুফ। সকাল প্রায় পৌনে নয়টায় অ্যাভেঞ্জার বাইক স্টার্ট। সাভার, আশুলিয়া হয়ে বাইক ছুটছে নরসিংদী। গাজীপুর, নরসিংদী হয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়া জমিদার বাড়িতে কষে একখান ব্রেক। মানে পুরো বাড়িটা সময় নিয়ে দেখব। প্রথম দর্শনেই চোখ জুড়িয়ে যায়। বাড়ির পুরো দেয়ালজুড়ে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য। সামনে-পিছনে রয়েছে শানবাধাঁনো পুকুর। ১৮৮৯ সালে জমিদার রাম রতন ব্যানার্জী এই বাড়িটির নির্মাণ শুরু করান। আর শেষ করেন তার নাতি ১৯০৯ সালে। জমিদার বাড়িতে রয়েছে শতাধিক কক্ষ। আরো রয়েছে বিশাল উঠোন। ৪০ একরের জমিদার বাড়িটি এখন, মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাড়ির সামনে যতটা আকর্ষণীয়, ঠিক তার উল্টো পিছনের অংশটা, দিনের আলোতেই ভুতুরে পরিবেশ।

জরাজীর্ণ ভগ্নদশায় থাকা ইমারতে, খানিকটা সময় ফটোসেশন। অতঃপর স্থানীয় কিশোর-তরুণদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা মেরে, আবারো ছুটে চলা। বাইক চলছে। যে-পথে যাই, সেই পথে না ফিরে অন্যপথে চলি। এতে ভ্রমণের মজাই আলাদা। নতুন কিছু দেখা ও চেনা যায়। চলতে চলতে রূপগঞ্জের ফেরিতে ভেসে, তিনশ ফিট পেরিয়ে জিন্দা পার্কের সামনে পৌঁছি। স্থানীয় এক মসজিদে জহুর নামাজ আদায় করে, বসে যাই পথের পাশে একঝুপড়ি হোটেলে। লাকড়ির চূলোয় রান্না করা। ভাত-ভর্তা, ডাল, গোস্ত আর বাইম মাছ। সাধের কথা আর নাই লিখলাম। ৫জনের ভাত দুজনেই সাবাড়। এবার কিশোরগঞ্জের পথে। বাইক রাইডে এখানেই মজা। মনের চাহিদা, পুরোটাই নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে। 


কালিগঞ্জ, মিরের বাজার, রাণীগঞ্জ, কাপাসিয়া, বিন্নাটির মোড় পেরিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরের একরামপুর। ফেসবুক ফ্রেন্ড তরিকুল নিবিড় ভালোবাসার টানে, প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের গ্রাম মরিচখালী হতে রিসিভ করতে হাজির। আগে জানলে নিশ্চিত, তাকে মেসেঞ্জারে নক না দিয়ে, অন্যপথ ধরতাম। প্রথমেই সে আমাদের নিয়ে গেল, গুরুদয়াল কলেজের সামনে থাকা মুক্তমঞ্চে। রাতের আধাঁরে যতটুকুন বুঝলাম, পড়ন্ত বিকালে এখানে ঘোরার মজাই হবে ভিন্নরকম। এরপর যাই, জেলার ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ। এশার নামাজটা সেখানেই আদায় করে নিই। প্রায় আড়াইশত বছরের পুরনো, চমৎকার সৌন্দর্যের একটি মসজিদ। নরসুন্দা নদীর তীরে মসজিদটি অবস্থিত। পাগলা মসজিদটিকে দেশের সবচাইতে ধনী মসজিদও বলা হয়। কারণ এর দান বাক্স হতে কোটি টাকা পর্যন্ত মিলে। দিনের আলোর চাইতে পাগলা মসজিদ, নিঃসন্দেহে রাতের ঝলকানো বাতিতে আরো অনেক বেশি দৃষ্টিনন্দন। ইতিমধ্যে বত্রিশ এলাকার আরেক ভ্রমণপাগলা আলমগীর অলিক এসে হাজির। দেখা হয়নি কখনো; কিন্তু মহব্বতে গদগদ। ঠিক এই জায়টাতেই মনে হয় আমার জীবনের সফলতা। নরসুন্দা নদীর তীরে সব ভ্রমণপাগলা আড্ডা দিয়ে, যাচ্ছি এবার তরিকুলের বাড়ি।


বাড়ি পৌঁছে,জম্পেশ খানাদানা শেষে এক ঘুম। পরদিন ফজর পরেই ভাগি। গন্তব্য ধনুনদীর তীর বালিখলা। সঙ্গী এবার লেখক মুস্তাফিজ মারুফসহ ছয়জন। গ্রামের পথ ধরে বাইক চলে। চামড়া বন্দর ক্রস করে বালিখলা ভেড়িবাঁধ যেতেই, আনন্দে চোখেমুখে হাসির ঝিলিক। বিশাল জলরাশির মাঝে পিচকরা সড়কে এগিয়ে যাই। বাতাসের ঝাপটা এসে ক্লান্তি দূর করে। যতদূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। বাইক পার্ক করে ট্রলারে চড়ি। ভেসে ভেসে বেড়াই করিমগঞ্জের হাওর, মিঠামইন হাওর, ইটনা’র শিমূলবাগ। বর্ষায় গ্রাম-বাংলার হাওর, সমুদ্রের সৌন্দর্যের চাইতেও কম নয়। দেখা হয় সাদাসিধে মানুষ, মহামান্য রাষ্ট্রপতির বাড়ি। মিঠামইন ভেড়িবাঁধটাও চমৎকার। 


ক্ষণিকের জন্য হেঁটে বেড়াই, যতটুকুন জেগে থাকা সাব-মার্সিবেল সড়কে। এসব রাস্তা বছরের ৬ মাস পানির নীচে থাকে। হাওর জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে, প্রখর রৌদ্রও হার মানে। চরম তাপমাত্রা উপেক্ষা করেও হাওরের বিশুদ্ধতায় মুগ্ধ হই। ভালো লাগে আপন মনে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য। যাত্রিবাহী ট্রলার ছুটে চলে তার গন্তব্যে। ভরা বর্ষায় হাওরাঞ্চলের গ্রামগুলো, মূল ভূখ- হতে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দূর থেকে তখন একেকটি গ্রাম দ্বীপের মতো দেখা যায়। তেমনি একটি গ্রাম বজকপুরে নোঙর গাড়ি। পরিচিত হই তাদের যাপিতজীবন সম্পর্কে। মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়াটাও একটা ভ্রমণ অনুষঙ্গ।
এরপর ইটনার শিমূলবাগ হিজলবনে যাই। দূর থেকে মনে হয়, এ আরেক সোয়াম্প ফরেস্ট। টইটম্বুর পানির বুকে, চকচকে গাঢ় সবুজ পাতার হিজলগাছের মাথাগুলো জেগে আছে। নয়নাভিরাম নৈসর্গিক এক পরিবেশ। শত হিজলের মেলায়, নজরকাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ঝিরঝির বাতাসে পানির ঢেউয়ে ট্রলার দোলে। সেই সঙ্গে দোলে আমাদের মন। একটা সময় লাফিয়ে পড়তে চাই, ডুবসাঁতারে মেতে উঠব বলে। কিন্তু মাঝির সাবধান বাণী। কি আর করা। ভ্রমণের আর অতিউৎসাহী হওয়া যাবে না। মাঝিকে ক্যাপ্টেন মেনে, ফিরতি পথে ছুটি।


চলেন যাই : ঢাকার মহাখালী ও সায়েদাবাদ হতে কিশোরগঞ্জগামী এসি/নন এসি বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে। ভাড়া ২শ ২০ টাকা থেকে ৪শ টাকা। এছাড়া ট্রেনে চড়েও যাওয়া যাবে। কমলাপুর হতে সকাল ৬টা ৩০ মিনিট হতে ১০টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত তিনটি ট্রেন ছেড়ে যায়। দুপুরেও ট্রেন আছে। তবে দিনে দিনে ফেরার জন্য সকালের ট্রেনে যাওয়াই ভালো। শহর হতে করিমগঞ্জের রৌহা মোড় পর্যন্ত সিএনজি যায়। সেখান থেকে অটো’তে বালিখলা। ট্রলার ভাড়া তিন ঘণ্টা’র জন্য ভাড়া নিবে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২শ টাকা। দরদাম করে নেওয়াটাই উত্তম। 


থাকবেন-খাবেন কোথায় : সকাল-সকাল গেলে থাকার প্রয়োজন নেই। তারপরেও থাকতে চাইলে, শহরে বেশ কিছু ভালোমানের থাকা খাওয়ার হোটেল রয়েছে। 


সতর্কতা : যারা মটরবাইকে যেতে ইচ্ছুক, তারা অবশ্যই বাইক রাইডের সেফটি গার্ড ব্যবহার করবেন।

- ছবির ছৈয়াল : দে ছুট ভ্রমণ সংঘ