ঐতিহাসিক মহেড়া জমিদার বাড়ি

ঐতিহাসিক মহেড়া জমিদার বাড়ি
ছবি: সংগৃহীত
মহেড়া জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভবন হল আনন্দ লজ। নীল ও সাদা রঙের মিশ্রণে ভরা ভবনটির সামনে আটটি সুদৃশ্য কলাম রয়েছে। তিন তলাবিশিষ্ট ঝুলন্ত বারান্দা এ ভবনকে করেছে আরও দৃষ্টিনন্দন।

মহেড়া জমিদার বাড়ির অবস্থান টাঙ্গাইলে। যমুনা, ধলেশ্বরী ও বংশী নদীবিধৌত এ জেলার সবচেয়ে বড় ও মনোমুগ্ধকর জমিদার বাড়ি এটি। এতটা সময় পেরলেও ঐতিহ্যপ্রেমী মানুষেরা এখনো ছুটে যায় নিদর্শনগুলোর কাছে। গবেষকরা খুঁজে দেখেন, জানার চেষ্টা করেন চোখে না দেখা জীবনকে।

 

আড়াই হাজার বছরের অধিক সময়ে এ দেশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, শাসক শ্রেণি গড়ে তুলেছে অসংখ্য ইমারত, নগর, প্রাসাদ, দুর্গ, মন্দির, মসজিদ, বিহার স্তূপ ও সমাধিসৌধ। এসব ঐতিহ্যের অধিকাংশ কালের গর্ভে বিলীন হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংস্কৃতির চিহ্ন এ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজও টিকে আছে, যা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সমধিক পরিচিত। 


এক হাজার ১৭৪ শতাংশ জমির ওপর এই মহেড়া জমিদার বাড়ি অবস্থিত। এই জমিদার বাড়ির প্রবেশ পথেই রয়েছে বিশাল দুইটি সুরম্য গেট। বিশাল তিনটি প্রধান ভবনের সাথে নায়েব সাহেবের ঘর, কাছারি ঘর, গোমস্তাদের ঘর, দীঘি ও আরো তিনটি লজ রয়েছে। প্রবেশ পথের আগেই বিশাখা সাগর নামে একটি দীঘি আছে। মূল ভবনে পিছনের দিকে পাসরা পুকুর ও রানী পুকুর নামে আরো দুইটি পুকুর রয়েছে।

 

স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকবাহিনী মহেড়া জমিদার বাড়িতে হামলা করে এবং জমিদার বাড়ির কূলবধূসহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরে এখানেই মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। স্বাধীনতার পর জমিদার বাড়িটি পুলিশ ট্রেনিং স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং পরে পুলিশ ট্রেনিং স্কুলকে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে উন্নীত করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক সংস্কার কাজ চালিয়ে বাড়িটির আজকের এই রূপে দাঁড়িয়েছে।  এই জমিদার বাড়িতে চারটি ঐতিহাসিক ভবন রয়েছে। এগুলো হল চৌধুরী লজ, মহারাজ লজ, আনন্দ লজ ও কালীচরণ লজ।

 

 


চৌধুরী লজ


জমিদার বাড়ি প্রবেশের পরেই মূল ফটক দিয়ে দেখা যায় চৌধুরী লজ। এটির গোলাপি রঙের ভবনটির পিলারগুলো রোমান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে। সুন্দর নকশা খচিত এই ভবনের ভেতরে রয়েছে ঢেউ খেলানো ছাদ। দোতলাবিশিষ্ট এ ভবনটির সামনে রয়েছে সুন্দর বাগান ও সবুজ মাঠ।

 

 

মহারাজ লজ


বাইজেনটাইন স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মহারাজ লজ ভবনের সামনে ছয়টি কলাম রয়েছে। সেখানে গোলাপি রঙের মহারাজ লজের সামনে রয়েছে সিঁড়ির বাঁকানো রেলিং ও ঝুলন্ত বারান্দা, যা ভবনের শোভা বৃদ্ধি করেছে। ভবনটিতে মোট কক্ষ আছে ১২টি, সামনে বাগান ও পেছনে একটি টেনিস কোর্ট রয়েছে।

 

 

আনন্দ লজ


মহেড়া জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভবন হল আনন্দ লজ। নীল ও সাদা রঙের মিশ্রণে ভরা ভবনটির সামনে আটটি সুদৃশ্য কলাম রয়েছে। তিন তলাবিশিষ্ট ঝুলন্ত বারান্দা এ ভবনকে করেছে আরও দৃষ্টিনন্দন। আনন্দ লজের সামনে হরিণ, বাঘ ও পশুপাখির ভাস্কর্যসহ একটি চমৎকার বাগান আছে।

 

 

কালীচরণ লজ


জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির শেষের দিকে নির্মিত এই কালীচরণ লজ অন্য ভবন থেকে অনেকটা আলাদা। ইংরেজি (টি) অক্ষরের আদলে এই ভবনটি ইংরেজ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। অনন্য স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিকেল বেলা ভবনের ভেতর থেকে সুন্দর আলোর ঝলকানি দেখা যায়। ইতিহাস বলে, ১৮৯০ দশকের আগে স্পেনের কর্ডোভা নগরীর আদলে জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

 


কিভাবে যাবেন


মহেড়া জমিদার বাড়ি দেখতে আপনাকে যেতে হবে টাঙ্গাইল জেলার নটিয়াপাড়া বাস স্ট্যান্ড। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। বাসে যেতে সময় লাগবে ২ থেকে ২.৫ ঘণ্টা। বাস ভাড়া লাগে ১২০ থেকে ১৬০ টাকা। বাসে চড়ে নাটিয়াপাড়া বাস ষ্ট্যান্ডে আসতে হবে। নাটিয়াপাড়ায় বাস থেকে নেমে সিএনজি, রিকশা বা বেবী টেক্সী যোগে মহেড়াপাড়া পুলিশ প্রশিক্ষন কেন্দ্রে আসতে হবে। মহেড়া জমিদার বাড়িটিই বর্তমানে পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

এছাড়া দেশের অন্য কোন জায়গা থেকে আসতে হলে আপনাকে যে কোন উপায়ে টাঙ্গাইল আসতে হবে। টাঙ্গাইল নটিয়াপাড়া এসে উপরে উল্লেখিত উপায়ে মহেড়া জমিদার বাড়ি ভ্রমণ করতে পারবেন।