জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড

ইতির হাতেই ইতি

ইতির হাতে ইতি ঘটল সামাজিক প্রথার
আয়েশা আক্তার ইতি
ইতি সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে অসহায় পরিবারের খোঁজ নিয়ে লিস্ট করেন এবং তাদের বাড়িতে প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেন। এ কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ গত ১৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা এবং ‘ইয়াং বাংলা’ এর মুখপাত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ‘৪র্থ জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড’ বিজয়ী হিসেবে আয়েশা আক্তার ইতি ও তার সংগঠনের নাম ঘোষণা করেন।

নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া বলেছেন, ‘আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? কোনো ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা ল্য যাহা আমাদের ল্য তাহাই।’ আধুনিক সমাজে এখনও মেয়েদের ছোট করে দেখা হয়। মনে করা হয় সকল কঠিন কাজ ছেলেরাই করবে। যদি কেউ তা করতে যায় এর জন্য তার পরিবারকে কথা শুনতে হয়। কিন্তু এখনও অনেক সাহসী তরুণী রয়েছে যারা সমাজের এই গৎবাধা প্রথা উপেক্ষা করে সমাজের মানুষের পাশে দাড়াতে চান। আর এই করোনা মহামারীর সময়ে তা প্রমাণ করে দেখান তেমনই এক সাহসী তরুণী। বলছিলাম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় যুব অ্যাওয়ার্ড ’জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড ২০২০’ বিজয়ী আয়েশা আক্তার ইতির কথা।

 

 

পড়ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ইতি নোয়াখালীর জীবননগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকার দনিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন। করোনাকালে অসহায় মানুষের জন্য কাজ করার স্বীকৃতিস্বরুপ এই অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন ইতি। 

 

 

করোনার সময় সামাজিক প্রথা ভেঙ্গে বাবাকে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অসহায় মানুষের লিস্ট করতেন। তখন গ্রামের মানুষ তাকে আর তার বাবাকে নিয়ে হাসা-ঠাট্টা করত। দূর থেকে এটা ওটা বলত। এলাকার স্থানীয়রা তার বাবাকে বলতো- মেয়ে বড় হয়েছে, সামলে রাখেন। আবার অনেকে ফোন করে বলতো- এসব বাদ দাও, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড় ভাল কথা কিন্তু মানুষের বাড়ি গিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দেয়া মেয়েদের কাজ না। “কিন্তু কে শোনে কার কথা, মানুষের জন্য কাজ করার তীব্র নেশা জেগেছিল, সেই তাগিদেই অসহায় মানুষের জন্য ভালবাসা আর কাজ করার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে ছুটছিলাম। আমাদের প্রগতিশীল সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে নারী-পুরুষের সমান তালে কাজ করতে হবে।“ একটু বাঁকা হাসিতেই বলছিলেন ইতি। 

 

মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে ‘Your Simple Efforts Bring Happiness” এ মূলমন্ত্রকে ধারণ করে ‘ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ আর্মি’ নামের সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বেশকিছু সিনিয়র এবং অন্যান্যদের সাথে পরামর্শ করে সহ-প্রতিষ্ঠাতা রাকিব আল হাসান সহ সংগঠনের মাত্র ২৫ জন স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে শুরু হয় পথচলা। যারা করোনার তোয়াক্কা না করে সবসময় কাজ করে গেছেন অসহায় মানুষের জন্য। ইতি বলেন, করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় গ্রামেই অবস্থান করি। লকডাউনের কারণে গ্রামের মানুষের আয় রোজগার কমে যাওয়ায় প্রান্তিক মানুষের দুঃখ-দুর্দশা প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেছি। অন্তত কিছু মানুষের মুখেও যদি হাসি ফোটানো যায়, এই ভাবনা মাথায় নিয়ে আর ঘরে বসে থাকিনি। 

 

 

শুরুতে দেশের ১৪ জেলায় ৭০০ পরিবারকে জরুরী সহায়তা পৌঁছে দেন। এখন পর্যন্ত ৪টি প্রোগ্রাম পরিচালনা করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে খাদ্য সহায়তা এবং দুস্থ পরিবারের পাশাপাশি চাকরি হারানো পরিবার, শিক্ষক ও অসহায় ছাত্র পরিবারকে অর্থ সাহায্য, রমজান ফুড প্যাক, ঈদ উপহার ও পাবলিক অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইন। যার আওতায় ছিলেন সমাজের অবহেলিত শ্রেণীর মানুষ, রিকশাচালক, সিএনজি চালক, ভ্যান চালক, প্রতিবন্ধী, বিধবা, চা-বিক্রেতা, দিনমজুর, স্বামীপরিত্যক্তা নারী ইত্যাদি। 

 

 

ইতি সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে অসহায় পরিবারের খোঁজ নিয়ে লিস্ট করেন এবং তাদের বাড়িতে প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেন। এ কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ গত ১৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা এবং ‘ইয়াং বাংলা’ এর মুখপাত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ‘৪র্থ জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড’ বিজয়ী হিসেবে আয়েশা আক্তার ইতি ও তার সংগঠনের নাম ঘোষণা করেন। 

 


২০১৪ সালের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করা ‘ইয়াং বাংলা’র উদ্যোগে প্রতিবছর সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাওয়া যুব উদ্যোক্তা ও সংগঠনকে অনুপ্রাণিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। 
এ অর্জনে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে উচ্ছসিত কণ্ঠে ইতি বলেন, “এ অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী হয়ে আমরা ‘ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ আর্মি’ পরিবার অত্যন্ত আনন্দিত। এ অর্জন আমাদেরকে আরো কাজ করার উৎসাহ দিয়েছে। যারা আমাদের টিমকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন ও পথ দেখিয়েছেন, বিশেষ করে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-বড় ভাই আপু-সহপাঠীসহ আরো যারা প্রতি মুহূর্তে সবধরণের সমর্থন নিয়ে পাশে ছিলেন তাদের সবার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। সামনের পথচলায়ও আপনাদেরকে পাশে চাই।“ সামনের দিনে নতুন পৃথিবী গড়তে সমাজের দুস্থ নারীদের কর্মসংস্থান ও অবহেলিত শ্রেণীর পরিবারের শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি গ্রামের তরুণদের বিভিন্ন সামাজিক কাজে অন্তর্ভুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন তিনি।