ঐতিহ্যবাহী জামদানি পণ্যে সারা ফেলেছেন মেহেরুন কুইন

ঐতিহ্যবাহী জামদানি পণ্যে সারা ফেলেছেন মেহেরুন কুইন
ঐতিহ্যবাহী জামদানি পণ্যে সারা ফেলেছেন মেহেরুন কুইন
মেহেরুন বলেন, 'আসল ঢাকাই জামদানি শাড়ি আমাদের দেশের ঐতিহ্য। যুগ যুগ ধরে তাঁতি ভাইয়েরা এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছেন। মসলিন ঘরনার জামদানির এখন কেবল দেশের নয় বিশ্ব ঐতিহ্য। এই শিল্পকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। তাঁতিরা তাঁতে হাতের বুননে তৈরি করতে অনেক কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। তাই অন্যান্য শাড়ির তুলনায় জামদানি শাড়ির দামটা তুলনামূলক বেশি।

মেহেরুনের জন্ম চুয়াডাঙ্গায় হলেও শৈশবের বেড়ে ওঠা রাজধানীর ঢাকায়। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে বড় মেহেরুন ছিলেন সবার আদরের। ছোটবেলা থেকেই খুব চঞ্চল প্রকৃতির ও স্বাধীনতা-প্রিয় ছিলেন। ছবি আঁকা, বই পড়া, ঘুরে বেড়ানো ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তার প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি পত্রিকায় লেখালেখি ও সাংবাদিকতা করতেন। মেহেরুন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'বাংলা সাহিত্য' নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ভালো ফলাফলের জন্য অর্জনে ছিল ডীনস্ মেরিট স্কলারশিপ, ঢাকা বোর্ড বৃত্তি, নবাব ফজিলাতুন্নেছা মেধাবৃত্তি ও ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর স্কলারশিপ। স্কলারশিপের টাকায় নতুন নতুন বই আর বিভিন্ন ডিজাইনের জামদানি শাড়ি সংগ্রহ করা ছিল তার নেশার মতো।

 

লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। তিনি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ঢাকা কমার্স কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে। এরপর এগারো বছর কেটে যায় কলেজের শিক্ষকতা পেশায়। কিন্তু পরাধীনতার শিকল মানসিক ভাবে তৃপ্ত দিতো না। তখন থেকেই তিনি চিন্তা করেন নিজে কিছু করবেন। যেখানে অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। সেই চিন্তা থেকেই জীবন সঙ্গীর সহায়তায় রূপনগর শিল্প এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন 'কুইন্স ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেড' নামে একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। শুরুর প্রথম দিকে বেশ ভালোই চলছিল কিন্তু মহামারী করোনার থাবায় পড়ে সব স্থবির হয়ে যায়। তবুও দমে যাননি তিনি। মনে থাকা স্বপ্ন নিয়ে নতুনভাবে শুরু করেন।

 

মেহেরুন কুইন নিজেকে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স ভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেন। করোনা পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতার জন্য অফলাইনে কাজ করা আপাতত বন্ধ। তাই অনলাইনে "Queen's Dream" নামে পেজ খুলেন। মেহেরুন দেশীয় ঐতিহ্যবাহী  জামদানি পণ্য নিয়ে কাজ করেন । "Queen's Dream" এর সিগনেচার পণ্য ঢাকাই জামদানি। মেহেরুন  কাজ করছেন জামদানি শাড়ি, হাফ সিল্ক জামদানি থ্রি পিস, জামদানি কটন থ্রি পিস, জামদানি তসর ওয়ানপিস ও কটন ওয়ান পিস নিয়ে। রূপগঞ্জে সম্পূর্ণ নিজস্ব তাতে মানসম্পন্ন ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই জামদানি তৈরি করেন এবং পাশাপাশি অনেকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন।

 

মেহেরুন বলেন, 'আসল ঢাকাই জামদানি শাড়ি আমাদের দেশের ঐতিহ্য। যুগ যুগ ধরে তাঁতি ভাইয়েরা এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছেন। মসলিন ঘরনার জামদানির এখন কেবল দেশের নয় বিশ্ব ঐতিহ্য। এই শিল্পকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। তাঁতিরা তাঁতে হাতের বুননে তৈরি করতে অনেক কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। তাই অন্যান্য শাড়ির তুলনায় জামদানি শাড়ির দামটা তুলনামূলক বেশি। একটি তাঁতে প্রতিদিন দুইজন তাঁতি ১২- ১৪ ঘণ্টা শ্রম দেন। ডিজাইন ভেদে পুরো শাড়ি তৈরি করতে ৭ দিন থেকে ৬ মাস এমনকি ১ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়'।

 

কিছুটা আক্ষেপ নিয়ে মেহেরুন বলেন, 'বর্তমানে নকল মেশিনে বুনা জামদানি ও মিক্সড সুতার জামদানিতে বাজার সয়লাব। আসল জামদানি শাড়ির উভয় পাশের ডিজাইন মসৃণ থাকে। কিন্তু মেশিনে বুনা জামদানি শাড়ির উল্টো পিঠের সুতাগুলো কাটা কাটা ও খসখসে হয়। ফলে ক্রেতারা নকল জিনিস কিনে প্রতারিত হচ্ছে। এতে জামদানি শিল্প ও প্রকৃত তাঁতিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন'।

 

ইতিমধ্যে "Queen's Dream" এর জামদানি শাড়ি পৌঁছে গেছে দেশের বাইরে। মেহেরুন দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে উদ্যোক্তাদের সহায়তা করছেন এবং  জামদানি শিল্পে  নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করেছেন। 

 

মেহেরুন জানালেন নিজের পরিকল্পনার কথা, ভবিষ্যতে "Queen's Dream" কে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করাবেন। জামদানি পণ্য সারাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিবেন এবং পাশাপাশি বিদেশের মাটিতেও ছড়িয়ে দিবেন। খানিকটা থেমে এক লাইনে বলেন, 'সবাই দেশি পণ্য ব্যবহার করবেন ও দেশের পণ্যকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে সহায়তা করবেন।