রেশমী কাপড় ও গুড়ের ঐতিহ্য রক্ষায় আফসানা আফরিন

রেশমী কাপড় এবং গুড়ের ঐতিহ্যে রক্ষায় আফসানা আফরিন
আফসানা আফরিন
আমার কাছে সফলতা আপেক্ষিক, আমি নিজেকে যেখানে দেখতে চাই সেখানে পৌঁছাতে পারছি কিনা সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আফসানা আফরিন,  ইডেন কলেজ থেকে অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। মানিকগঞ্জের মেয়ে। ছোটবেলা ঢাকাতেই কেটেছে, এরপর মানিকগঞ্জে ছিল বেশ কিছু দিন। তারপর আবার ঢাকায় চলে আসেন।   


দুই ভাইবোনের মধ্যে আফসানা সবার বড়। প্রথমে বাবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সুবাদে নীলক্ষেত কোয়ার্টারে কেটেছে বেশির ভাগ সময়। এখন স্বামীর সাথে থাকছেন বারিধারা তে। একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সেখান থেকেই তার উদ্যোক্তা জীবনের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

 

আফসানার উদ্যোক্তা হয়ে উঠার গল্প শুনেছি এবং তার সাথে কথা বলেছি। একটা সময় ছিল যেখানে নারীদের অধিকার বলতে কিছুই ছিল না। নারীদের সকল কাজেই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সহ সকল ক্ষেত্রেই ছিল অনেক প্রতিবন্ধকতা। নারীদের অধিকার নিশ্চিতে "বেগম রোকেয়া" ছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত।সেই থেকেই নারীদের ক্ষমতায়নের পথচলা শুরু। তাতেও সমাজের বেশি একটা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। নারীদের কোন কাজে বাধা- বিঘ্নতা ঘটানোই হয়ে পড়ে সমাজের পেশা। নারীরা সমাজ এবং পরিবারের কাছে একরকম অবহেলিতই বলা যায়। নারীদের সকল কাজের আগেই শুনতে হয় অনেক তিরস্কার। 

 

আর তার থেকে ব্যতিক্রম নন আফসানা আফরিন। স্বভাবতই একটি মেয়ে বড় হলে সকল আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীর মুখের বুলি একটাই "মেয়েটা বড় হয়েছে, বিয়ে দিতে হবে"। আফসানার সাথেও এমনটাই ঘটেছে। কিন্তু আফসানা তো দমবার পাত্রী নন। নিজের বুকে আঁকা নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে চেয়েছেন এবং স্বপ্ন সত্যি করার পথচলায় অদম্য ছিলেন। সফলও হয়েছেন।

 

সমাজের নানা বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে সম্পন্ন করেছেন নিজের পড়াশোনা। আর পড়াশোনা চলার মধ্যেই উই থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেন অনলাইন বিজনেস। তাতে দারুণ সফল ও লাভবান আফসানা। 

 

আফসানা বলেন, আমার অনলাইন বেইজড বিজনেস, দুটা অনলাইন পেজও রয়েছে। একটা দেশীয় পোশাক নিয়ে, পেজের নাম N craft, যেখানে মিরপুরের বেনারসি শাড়ি সহ দেশীয় শাড়ি, থ্রিপিস রয়েছে। আরেকটা পেইজ Foodies, যেখানে আমার জেলা মানিকগঞ্জ এর জেলা ব্র্যান্ড পণ্য হাজারী গুড় নিয়ে কাজ করছি। 

 

আপাতত কোন শো-রুম নেই তবে শীঘ্রই আমি আমার এই বিজনেস এর শো-রুম উদ্বোধন করছি। অনলাইনে প্রথম বিজনেস ভিত্তিক  পেইজ খুলি ২০১৮ তে।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আফসানার কাছে জানতে চাওয়ায় তিনি বলেন, আমি মনে করি N craft হবে দেশীয় পণ্যের ব্র্যান্ডশপ। আর সে লক্ষে আমি কাজ করছি। মিরপুরের বেনারসি নিয়ে আরও কাজ করতে চাই।


N craft এর শুরুতে আমি কাপল ম্যাচিং ড্রেস নিয়ে শুরু করি। নয় মাস আগে Women & E-commerce Forum (WE) গ্রুপে জয়েন করি। সেখানে জয়েন করে বেনারসি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ হয়। এরপর উই'র কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের পরামর্শে বেনারসি নিয়ে বিস্তারিত জেনে কাজ করা শুরু করি। বেনারসি বাঙালির ঐতিহ্য বহন করে তাই এই পণ্য নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। আর মিরপুরের বেনারসি পল্লীর তাঁতিদের কারখানা ঘুরে তাদের কথা শুনেই বেনারসি নিয়ে কাজ করছি।     

 

প্রথমে পরিবারের সদস্যরা বলত এত পড়াশোনা করে শেষে অনলাইন বিজনেস? পরে সত্যিই পরিবার থেকে আলহামদুলিল্লাহ অনেক সাপোর্ট পেয়েছি। এখন আমি বিবাহিত জীবনে স্বামীর সাথে আছি এবং আমার স্বামীও আমাকে নানা ভাবে সহযোগিতা করছে আমার এই কার্যক্রমে। তবে পরিবারের বাইরে অনেকে ভালো ভাবে দেখে নাই বিজনেস করাকে, বলেছে এত পড়াশোনা করে  এখন এসব করছি, কিছুটা হেয় করেছে, এখনো হয়তো ভালো বলে। আসলে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় চাকরি টাকেই সম্মানজনক মনে করে। তবে আমি এসব পাত্তা দেই না। 


আমার কাছে সফলতা আপেক্ষিক, আমি নিজেকে যেখানে দেখতে চাই সেখানে পৌঁছাতে পারছি কিনা সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। লোকে কাকে সফল ভাবলো তা নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমি ছোটবেলা থেকেই নিজের পোশাক নিজে বিভিন্ন ডিজাইন করে বানাতাম, পোশাক নিয়ে কাজ করাটা আমার ভালবাসা থেকে করা।


অনলাইনে বিজনেস করে আপনি কতটুকু সফল জানতে চাইলে আফসানা বলেন, আমি মনে করি, এখনও সামনে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে, তাই সফল বলা যাবে না।

 

আর Foodies পেইজটা খুলি, আমার মানিকগঞ্জ জেলাকে রিপ্রেজেন্ট করতে জেলার বিখ্যাত পণ্য "গুড়" নিয়ে যা দেশের গণ্ডি পেড়িয়ে বিদেশেও সুনাম রয়েছে। ইংল্যান্ডের সাবেক  রানী এলিজাবেথ এই গুড় খেয়ে মুগ্ধ হয়ে বাংলায় লেখা পিতলের সিলমোহর উপহার দেন যা দিয়ে এই গুড়ে সিল দেয়া হয়। এই গুড়কে সারাবিশ্বে পরিচিত করতে চাই —বলছিলেন আফসানা।

 

আপনি আপনার স্বপ্ন কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেড়েছেন বলে মনে করেন? এই প্রশ্নের উত্তরে আফসানা বলেন, আমার স্বপ্ন ছিল একজন ভালো মানুষ হব এবং ভালো কিছু করব। কিন্তু কখনো ভাবিনি একজন উদ্যোক্তা হব। তবে আমি এখন একজন সফল উদ্যোক্তা হতে চাই আর সেটা নিয়েই স্বপ্ন দেখছি। আর উদ্যোক্তা হিসেবে ভালো কিছু করতে চাই ইনশাআল্লাহ।

 

যারা আপনার মতো নবীন উদ্যোক্তা হতে চায় তাদের কি পরামর্শ থাকবে, আমার অভিজ্ঞতা থেকে  আমি বলব নবীন উদ্যোক্তাদের অনেক পরিশ্রম করতে হবে। পরিশ্রমই সফলতার চাবি কাঠি। আর নবীন দের কাজ নিয়ে প্রথমে অনেকেই হেয় করে। তবে আমি বলব নবীনদের একটা কথাই মনে রাখতে হবে - কবি "কামিনী রায়"  বলেছেন সংশয়ে সংকল্প সদা টলে, পাছে লোকে কিছু বলে"। আর নবীন উদ্যোক্তাদের অধিক সাহস এবং দৃঢ় মনোবল থাকতে হবে। তাহলেই নবীনরা সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সফলতার শিখরে পৌঁছাতে পারবে।