বেদনার নক্ষত্র

বেদনার নক্ষত্র
ছবি: সংগৃহীত
পৃথিবী এখন মেট্রোরেলের গতিতে এগিয়ে চলছে। মা হয়তো তা বিশ্বাস করেন না, নয়তো আমলে নেন না। সবার হাতে মোবাইল ফোন। কেউ কারোর বাড়ি যাচ্ছে না, অথচ সব খবর পাওয়া যায়। ইন্টারনেটের সুবিধা পেয়ে অধুনা সবাই একটা পারস্পরিক অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি করে নিয়েছি। এখন সে দেওয়াল পরিবার থেকে সমাজ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। মা তবুও তাঁর সেই পুরনো চিন্তাভাবনার ভেতরেই ডুব মেরে থাকতে চান।

ভোরেই পাশের বাড়িতে হট্টগোল। চিৎকার আর চেঁচামেচির শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। কে যেন আমাকে নাম ধরে ডাকলো। আমি তখনো বিছানায় শুয়ে আছি। বিছানা ছেড়ে উঠবো, কিন্তু অলসতার কারণে উঠতে পারছি না। পুরোটা শরীর কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে। অপরিচিত একটি মুখ আমার চোখের সামনে বৈদ্যুতিক বাতির মতো জ্বলে উঠলো।

 

‘রিয়াদ, প্লিজ ওঠো! ঘুমানো কি শেষ হয়নি তোমার?

 

খানিকটা অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। বিছানা ছেড়ে উঠে বসলাম। চোখ কচলাতে কচলাতে চারপাশে তাকালাম। কিন্তু কাউকেই চোখে পড়লো না! কি আশ্চর্য! আমি কি সত্যিই ঘুম থেকে উঠেছি? নিজের শরীরে চিমটি কেটে দেখলাম। হ্যাঁ, আমি তো বিছানা ছেড়ে পা ঝুলিয়ে আছি! তাহলে যে মেয়ের কণ্ঠটি ভেসে এলো, সে কে?

 

রিপার সাথে হঠাৎ করেই একদিন কলেজে আমার পরিচয়। যেদিন ভর্তি হই, গুণে গুণে ঠিক তার তেরো-দিন পর। মেয়েটির কান্নাকাটি আমাকে অবাক করে দিয়েছিল। দেখতে দেখতে কতোগুলো দিন চলে গেল! আমরা একে অপরের সম্পর্কে জানলাম, পরিচিত হলাম। এরপর আমাদের মাঝে একটা সম্পর্কও তৈরি হল—যাকে বলে ‘বন্ধুত্ব’।

 

ভীষণ আবেগি মেয়ে রিপা। যেকোনো ছোটোখাটো বিষয়কেও বেশ প্রাধান্য দিত। আমি মনে করি এটা ওর একটা ভালো গুণ ছিল। ওর কথায় কিছুটা আধ্যাত্মিক ভাব ছিল। হুট-হাট অনেক কথা বলতো। ওর ছেলেমানুষি আমার ভীষণ ভালো লাগতো। বেশ আহ্লাদী ঢঙের রোমান্টিক মেয়ে রিপা। রিপা কেন জানি আমার গা ঘেঁষে বসতে চাইতো। মাঝে মাঝে হঠাৎ করে আমার জামার কলার ধরে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিতো। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে ফেলতো। তখন তারুণ্যের জোয়ারে আমি সবেমাত্র স্মোকিং শুরু করেছি। ব্যাপারটা অনেকটা ‘সঙ্গদোষে লোহা ভাসে’ এরকম। ফলে প্যান্টের পকেটে প্রায়ই সিগারেট থাকতো। রিপা সিগারেট পেলেই ভেঙে ফেলতো। শেষে পাঁচকথা শুনিয়ে ছাড়তো। বলতে গেলে খানিকটা ঠোঁটকাটা স্বভাবের মেয়ে।

 

রিপা নিজেই ওর বিষয়ে গল্প বলা শুরু করতো। বলতো, ‘মা জন্মের সময় আমার মুখে দুধ না দিয়ে নিমপাতার রস দিয়েছিলেন। তবে এখন আর সেদিন নেই; হাসপাতালে বাচ্চা হয় বলে এসবের বালাইও নেই। মা প্রায়ই বলেন, পরিচিত কেউ নাকি আমাকে বিয়েই করবে না। আমার মা গ্রামের মেয়ে। তাই তাঁর চলনে-বলনে কেমন যেন একটা গ্রাম্য ভাব আছে। পৃথিবী এখন মেট্রোরেলের গতিতে এগিয়ে চলছে। মা হয়তো তা বিশ্বাস করেন না, নয়তো আমলে নেন না। সবার হাতে মোবাইল ফোন। কেউ কারোর বাড়ি যাচ্ছে না, অথচ সব খবর পাওয়া যায়। ইন্টারনেটের সুবিধা পেয়ে অধুনা সবাই একটা পারস্পরিক অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি করে নিয়েছি। এখন সে দেওয়াল পরিবার থেকে সমাজ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। মা তবুও তাঁর সেই পুরনো চিন্তাভাবনার ভেতরেই ডুব মেরে থাকতে চান।

 

আমি বুঝি, মা’র ভেতরে শিক্ষার আলো নেই। তাছাড়া গ্রামে মানুষ হয়েছেন। ছেলেবন্ধু তাঁর একদম পছন্দ না। আমার মা যে এতো সুন্দরী, অথচ মনে হয় না কখনো কারোর সঙ্গে প্রেমটেম করেছিলেন। বেচারি জীবনে কতো কি মিস করেছেন। তাঁর কাছে জীবনে মানে সংসার, স্বামী আর ছেলেমেয়ে। এসব ভাবনার ভেতর থেকে বের হওয়ার কথা মা’র কখনো হয়তো মনেই হয়নি। আমার কোনো মেয়েবন্ধু নেই। যাদের সাথে চলি তারা ঠিক বন্ধু না, সহপাঠী। বন্ধুত্ব আলাদা জিনিস। কারণ বন্ধুর কাছে মনের সব গোপন কথা খুলে বলা যায়। এরকম আচরণ দেখে অনেকেই জেলাস ফিল করে। কেউ কেউ হিংসায় জ্বলে ওঠে।

 

কমনরুমে প্রায়ই মেয়েদের সঙ্গে ঝগড়া হয়। কেউ কেউ চরম উৎসাহ নিয়ে ফিসফিস করে কতকিছু জিজ্ঞেস করে। যেমন: ‘তোর ব্রা এতো টাইট কেন রে? তোর ফিগারটাও তো খুব সুন্দর!’ মেয়ে হয়ে মেয়েদের থেকে এসব প্রশংসা শুনতে আমার কখনও ভালো লাগে না। বিশেষ করে মৌসুমী আর সালমা এমন টাইপের গল্প করতে পছন্দ করে। গোপনে কি সব বাজে ধরনের বই পড়ে! আমাকে ইশারায় ডাকে। ওরা আকার ইঙ্গিতে কতো কি বোঝাতে চায়। আমি কখনো কারোর মনের মতো হতে পারলাম না!’

 

রিপার আজ ভীষণ মনখারাপ। এই প্রথম কলেজে শাড়ি পরে এসেছে। কলেজের পুকুরের পাড়ে কৃষ্ণচূড়া আর তার পাশের বটগাছের নিচে একাকী বসে কি যেন ভাবছে?


আমি ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটু পর সম্বিৎ ফিরল রিপার। সে আমাকে দেখেই চোখের জল আড়াল করে মেকি হাসি ছড়িয়ে দিল। ইশারায় পাশে বসবার সম্মতিও দিল। তারপর আমি খানিকটা ওর শরীর ঘেঁষেই বসলাম। 


-কি ব্যাপার? বলও তো? তুমি কাঁদছিলে কেন?’


-না, তেমন কিছু না। একটা স্মৃতি মনে পড়েছিল, তাই...।’


-তোমার সেই স্মৃতির কথা আমাকে বলবে না?


‘আমার সেসব স্মৃতি শোনে তুমি কি করবে? তারচেয়ে এইতো বেশ ভালো আছো বন্ধু।’


প্রকৃতি নির্দিষ্ট একটা সময়ে নিজস্ব রূপ নিয়ে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। প্রকৃতির এই নিজস্বতা যেন প্রতীকী, সেখানে আপন পর বলে কিছুই থাকে না। পাতা ঝরার সময় হলে পাতা ঝরে, কুঁড়ি আসার সময় হলে কুঁড়ি আসে। সে তার নিজস্বতা বজায় রাখে। আমরা প্রকৃতির মতো হতে চেয়ে নিজেদের ক্ষতি বয়ে বেড়াই। এভাবেই হারিয়ে ফেলি আমাদের নিজস্বতা। শেষ সময়ে মেকি যা পাই, ভেবে নেই এই বুঝি ভাগ্যে ছিল। বিধাতা আমার জন্যও তাই রেখেছেন। এ নিয়েই সুখী হতে হবে।’


-রিপা, তুমি নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছো।’


-তা হবে কেন?’


-তুমি কি আমাকে অবিশ্বাস করছো?


-এখানে বিশ্বাস অবিশ্বাসের কি আছে, বল? ‘নিশ্চয়ই তোমার আজ মন শরীর দু’টোই খারাপ? চলো, তোমাকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিই। এখানে এভাবে বসে মনমরা হয়ে বসে থাকলে তোমার শরীর খারাপ করবে। আজ নাকি আর ক্লাস হবে না, আমি টিচার্স রুম থেকে জেনে এসেছি।


‘রিয়াদ, আমি কি তোমার হাত ধরতে পারি?’


রিপার সিল্কি চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম। চিবুকের রেশমি চুলগুলোর কয়েকটা উড়ে এসে ঘামের সাথে নাকের ডগায় লেপটে আছে। আমি হাত দিয়ে ঐ চুলগুলো সরাতে চাইছিলাম। হাত বের করতেই ওর হাতে মৃদু স্পর্শ লাগলো। রিপা অপেক্ষা করছিল হাতটা যেন এগিয়ে আসে।


-কি হলো? তুমি কি আমার কথা শোনোনি!


-কোন কথা?


-আমি যে বললাম, তোমার হাতটি ধরতে পারি?


-তুমি এমন ছেলেমানুষি করছ কেন? শুধু হাত কেন—আমাকেই তো ধরে আছো।


-তোমাকে ধরে আছি মানে? আমি কি তোমার প্রেমিকা, যে তোমার সাথে প্রেম করি?


-হ্যাঁ, প্রেম করো। কেন তোমার মন কি বলে না যে, তুমি আমার প্রেমে পড়েছ? নিজেকে কখনো প্রশ্ন করেছ কি? আমার সাথে তোমার কীসের সম্পর্ক? বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া ছেলেমেয়ের সম্পর্ক বন্ধুত্ব হয় না, রিপা। তবে কিছু সম্পর্ক একেবারে হয় না বললে ভুল হবে।


খ.


রিপা, আমরা কি প্রেমের পথে পা রেখেছি? আমার তো মনে হয় প্রেমের বিষয়ে আমাদের দু’জনের ভাবনার এখনো মিলই হয়নি। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সে খানিকটা মুচকি হাসলো। তারপর বললো, ‘বাদ দাও, বাড়ি যাবার সময় হল।’


বাড়ি ফেরা নিয়ে সেদিনের কাহিনী মনে হলে আমি নিজেই ভীষণ লজ্জা পাই। এমন গল্পে মজেছিলাম সেদিন, নিজেদের বাড়ি পাড় হয়ে চলে গেছি! মনেই হয়নি এতকাল এ রাস্তা দিয়ে চলাচল করেছি। এই রাস্তায় আমার মায়ের শরীরের একটা ঘ্রাণ লেগে আছে। তবুও এই পথ ঘেঁষে নিজের বাড়িটাই পার হয়ে গেলাম বেমালুম! মোহ মানুষকে ডুবিয়ে রাখে পৃথিবী থেকে ।


রিয়াদ পুরুষ মানুষ হিসাবে অত্যন্ত ভদ্র ও মানবিক। তাছাড়া স্পর্শকাতর, সৎ, মেধাবী ও স্পষ্টভাষী। প্রেমিক হিসেবে কাছে চাইলে হয়তো আমাকে আশাহত করবে না। তবুও নিজের ভেতরে একটা ভয় কাজ করে। যদি না করে বসে? সে অপমান আমি কোনোদিনই সইতে পারবো না।


রিয়াদকে আমি বিশ্বাস করি; সম্মানও করি। হয়তো এ দু’টো শব্দের ভেতরেই গভীরতম ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে।


বিকেল হলেই রিয়াদ মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে আসে। মা তাকে ভীষণ অপছন্দ করে। সঠিক কারণটা আমি খুঁজে বের করতে পারিনি।’ রিয়াদের খারাপ কোনো দিক আমার চোখে পড়েনি। আমি অনেক ছেলেকেই দেখেছি, মেয়েরা জামার নিচে কোন রঙের ব্রা পরেছে, তা শিকারির চোখে দেখে। বেহায়ার মতো বুকের দিকে তাকায়। এদিক থেকে রিয়াদ সত্যিই ভালো ছেলে। কিন্তু মা তাকে পছন্দ করেন না কেন?
বিষয়টা নিয়ে ভেবেচিন্তে কিছুই পাইনি। রিয়াদ একটা সময় বুঝতে পেরেছ, মা তাকে পছন্দ করে। যদিও আমাকে বলেনি, হয়তো আমার সাথে প্রেম করতে চায়। হয়তোবা রিয়াদ আমাকে ভালোবাসে; আমাকে নিয়ে সংসার করবে।’

 

গ.


আজ দু’দিন হল রিয়াদ কেমন জানি পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমি মনে মনে ভাবলাম, হয়তো মায়ের ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছে। দেখা হলে ক্ষমা চেয়ে নেবো। কিন্তু তা আর হল না। প্যারেন্টস ডে’তে একবার রিয়াদের বাবার সাথে পরিচয় হয়েছিল। সাতপাঁচ ভেবে মনিরামপুরে বইয়ের দোকানে ওর বাবার সাথে দেখা করি।


-কাকা, আমি রিপা। আমাকে চিনতে পারছেন?


-কেন নয়? তুমি আমার মা। ভেতরে এসে বসো, মা।


-কাকা, কিছু মনে করবেন না, প্লিজ। রিয়াদকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। তাই দোকানে চলে এলাম।


-তুমি এসে ভালোই করেছো, মা। আমি মনে মনে তোমাকেই খুঁজছিলাম। কিছু প্রশ্ন করি, মা। রিয়াদ কি তোমাদের বাড়িতে যেতো?’


-হ্যাঁ, যেতো। কিন্তু, কেন বলুন তো, কাকা?


-তোমাদের বাড়ির আশেপাশের মানুষ ভালো দৃষ্টিতে দেখে না। যদিও এটা তোমাকে বলা ঠিক না। তুমি রিয়াদের বন্ধু বলেই বলছি। রিয়াদ আমার সন্তান হলে, কথাটা ওকে সরাসরিই বলতাম। তবে আমি কিছু বললে রিয়াদ ভীষণ কষ্ট পাবে।’


রিয়াদের বাবার কথায় আমি আকাশ থেকে মাটিতে পড়লাম। আমার কাছে সবকিছু অন্ধকার মনে হচ্ছে।

 

তোমাদের মতো আমারও কলেজ জীবন ছিল। রঙিন স্বপ্নও ছিল, ছিল ভালোবাসা। রিয়াদ জেনে গেছে আমি ওর জন্মদাতা পিতা নই। পথে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম ওকে। আমার সংসার করা হয়নি। ছোটবোনের স্বামী মারা যাবার পর আমাদের সংসারে চলে আসে। বাড়িতে সারাদিন বিষণ্ণ হয়ে থাকতো সে। বোনের বিষণ্ণতা দেখে আমার মন খারাপ হত। একদিন শহরে যাবার পথে রিয়াদকে পেলাম। সেই থেকে আমি রিয়াদের বাবা। গ্রামে দুষ্টু মানুষের অভাব নেই। কেউ হয়তো আমার ভালো চায়নি, তাই সত্য কথাটা রিয়াদকে বলে দিয়েছে। অভিমান করে দু’দিন হল বাড়িতে আসে না। কি অবস্থায়, কোথায় আছে, তাও জানি না! থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছি।


তুমি কি জন্য আমার কাছে এসেছো, মা? আমি কি জানতে পারি?’


রিয়াদ মাঝে মাঝেই আমাদের বাড়িতে যেতো। মা তাকে অপছন্দ করতো। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো মায়ের উপর রাগ করে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। তবে আজ আপনার সাথে কথা না হলে নিজের ভেতরে একটা ভুল থেকে যেতো। এতে বিষয়টা ভিন্ন রূপ নিতে পারতো। আপনাকে কষ্ট দিলাম, কাকা। এজন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। 


-রিপা, তোমার মতো বিনয়ী মেয়ে আমি দেখিনি। রিয়াদের মুখে তোমার কথা অনেক শুনেছি। মাগো, তোমার মা-বাবাকে মাকে আমার সালাম দিও ।


এসব কথা শোনার পর রিপার মুখ বিষণ্ণতায় ছেঁয়ে গেল। অজান্তেই কোথাও হয়তো আঘাত লেগেছে।


-আমি দুঃখিত। আমার কথায় তুমি হয়তো কষ্ট পেয়েছো।


-আমার একটা অভাব আছে।


-অভাবের কথা কেউ কখনো এমন করে বলেনি।


-পৃথিবীর সমস্ত মানুষের কিছু না কিছুর অভাব থাকে। এই অভাবটাকে আমরা সয়ে যেতেও শিখে ফেলেছি।


-অভাবটা কি আমাকে বলবে, মা?


-আমি কখনো বাবাকে দেখিনি!


কথাটা শোনার পর রিয়াদের পালক বাবার বুকের ভেতরে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা লাগলো। মুখের মলিনতায় যেন হৃদপিণ্ড ছিঁড়ে যাবার উপক্রম। চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে লাগলো অজানা এক আবেগে। এদিকে রিয়াদের বাবার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে মা কিছু একটা আমার কাছে আড়াল করেছেন। রিয়াদকে অপছন্দ করার কারণটাও আড়াল হয়েই রইলো। 


মায়ের কুটিল আচরণে আমার সমস্ত মনোজাগতিক ভাবনার দুয়ার বিধ্বস্ত হতো। আমি চিৎকার করে উঠতাম। আবেগে ভিজে যেতাম। আমি তখন নিষ্পাপ শিশু। আমার রূপ-সৌন্দর্য বেড়ে ওঠেনি। সুডৌল বক্ষও ছিল না। ছিল না গভীরতম নাভি। তবুও আমি তখন এক শিশুকন্যা! আমার বয়স ছয় কি সাতবছর হবে। সে বয়সেও আমার দিকে লিবিডো দৃষ্টিতে তাকাতো। কামুক চোখের সেই অন্ধকার রাতের স্মৃতি আমি ভুলতে পারি না। ওরা মরা গরুর মতো টেনে হিঁচড়ে ধানক্ষেতে নিয়ে গিয়েছিল। মুখগুলো ঝাপসা ফ্যাকাসে। আমি দেখলেও চিনতে পারবো না। একজন চিত্রকর হয়েও আমি সেই পশুদের চিত্র অঙ্কন করতে পারি না। বারুদের মতন জ্বলে ওঠে বুকের ভেতরটা। বুকের ভেতর থেকে পোড়া গন্ধ বের হয়, তবুও কেউ বুঝতে পারে না। কেবল নিজেই বয়ে বেড়াই সেই বিষাদময় করুণ আর্তচিৎকার।


সেদিন আমার চিৎকারে আকাশ কেঁদেছিল, তবুও পশুদের অন্তর কাঁদেনি। সেই বৃষ্টিস্নানেই শরীরে অসুখ বাসা বাঁধে। ও যে কেঁদে উঠার অসুখ!
আমার সেই পুরনো স্মৃতি আমাকে ঘুমাতে দেয় না। আমি কেঁদে উঠি সময়ে-অসময়ে। কাউকে বলতে পারি না, আমার একটা বিষাক্ত শিশুকাল ছিল। স্মৃতির পাতাজুড়ে বেদনাগুলো আমাকে শুধু বিষধর সাপের মতো অবিরত দংশন করে। রিয়াদ জানতে চাইতো আমার কেঁদে উঠার গল্প।


রিয়াদ ফিরে এলে সব বলবো একদিন। শুধু আড়ালে থেকে গেল মায়ের কুটিল আচরণ। মা কি সত্যিই রিয়াদকে চিনতো?