ধারাবাহিক উপন্যাস

নারীস্থান- শার্লট পারকিন্স গিলমান

নারীস্থান- শার্লট পারকিন্স গিলমান
নারীস্থান- শার্লট পারকিন্স গিলমান
যখন কেউ মা হতে চায় তখন সে তার নিজের মধ্যে বিষয়টি পুষতে থাকে এবং এই মিরাকল তৈরি হয়। আর যে বাচ্চা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় না, সে বিষয়টিকে তার মনে স্থান দেয় না। সে তার হৃদয়ের ভালোবাসা পূরণ করে অন্যদের জন্ম দেওয়া বাচ্চার মাধ্যমে। আমাদের সন্তানদের দিকে তাকিয়ে দেখি। ওরা আমাদের জনসংখ্যার পাঁচভাগের তিনভাগ। আর ওদের জনসংখ্যার মধ্যে শিশু তিনভাগের একভাগ। কত মূল্যবান এই বাচ্চারা! আমাদের কোনো রাজার একমাত্র উত্তরাধিকারি সন্তান অথবা কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তির শিশু অথবা মধ্যবয়স্ক দম্পতির একমাত্র সন্তান- কেউ এই নারীস্থানের বাচ্চাদের সঙ্গে তুলনীয় নয়। এ নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগে আমি যে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছি, সেটা শেষ করতে চাই। ওরা কার্যকরভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফলে খাবারে পরিপূর্ণ, সবার জন্য সমৃদ্ধ জীবন। সবকিছু ওদের প্রচুর রয়েছে। বসবাসের রুম, আলো, বাতাস, নির্জনতা সব।

[মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উনবিংশ শতাব্দীর নারীবাদী লেখক ও সমাজ সংস্কারক শার্লট পারকিন্স গিলমান-এর নন্দিত উপন্যাস ‘হারল্যান্ড’ বাংলায় ‘নারীস্থান’ নামে ধারাবাহিকভাবে ছাপানো হচ্ছে। এ-সংখ্যায় ছাপা হলো ১২ পর্ব।]

১১ম পর্বের পর
এই অসীম বোনসুলভ অনুভূতি, কাজের মধ্যে বিশাল একতা, এসব হজম করা আমাদের সমাজের জন্য কষ্টকর। ওদের এই চেতনাটি জাতীয়তাবোধ, সম্প্রদায়গত বোধ, মানবকিতাবোধ এবং আরো যে কী তা আমি বলতে পারব না! 
আমরা আমাদের সমাজে কী দেখতে অভ্যস্ত! আমরা দেখি একজন মা পুরোপুরি তার শিশুর গোলাপি বোচকাটা নিয়ে ব্যস্ত। অন্যের ব্যাপারে মৌখিক একটা আগ্রহ আছে, কিন্তু তাছাড়া কমন কোনো বিষয় নেই। কিন্তু এই নারীরা সব একসঙ্গে শিশু লালন পালন করছে এবং একটি জনগোষ্ঠী গড়ে তুলছে। এবং সেটা যত্নের সঙ্গে। আমরা সাধারণত আমাদের দেশের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করতে চাই। কিন্তু ওরা দেশের জন্য মাতৃত্ব গ্রহণ করে। এবং সেটা একটা কঠিন কাজ। 
এসব বেশ কিছু বিষয় পড়ে আমি আরো জানার জন্য সোমেলের কাছে গেলাম। সোমেলের সঙ্গে আমি এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম যে, সে পর্যন্ত আমি কোনো নারীর সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠ হইনি। এতটাই নরম মনের সে যে একটা চমৎকার মাতৃত্বের অনুভূমি দিতে পারে, যা সব পুরুষ ছেলেই পছন্দ করে। তথাপি তার বুদ্ধিমত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা যে-কোনো পুরুষের সমমানের। আমরা ইতিমধ্যে অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলেছি। 
আমি বললাম, ‘দেখ, এখানে একটা সময় ছিল যখন প্রচুর সন্তানের জন্ম হয়েছে। এবং সেটাকে পরে নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা এ নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। তোমাদের এ-ব্যাপারে অবস্থান এতটাই ভিন্ন যে, আমি আরো একটু কথা বলতে চাই। আমি বুঝতে পেরেছি যে, মাতৃত্ব তোমাদের কাছে সবচেয়ে বড়ো সামাজিক কর্তব্য। এটি তোমাদের পালনীয়। এটিকে তোমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে সাদরে গ্রহণ করা হয়েছে। তোমাদের মধ্যে যারা শারীরিকভাবে অক্ষম তারা প্রজনন করতে পারে না। যারা বেশি প্রজনন করতে পারে তাদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উৎসাহিত করা হয়, সম্মান দেওয়া হয়। 
কিন্তু একটা বিষয় আমি বুঝতে পারছি না যে, তোমরা এই জন্মনিয়ন্ত্রণ করো কীভাবে? আমি যতটুকু বুঝতে পেরেছি যে তোমরা একেকজন নারী পাঁচটি করে সন্তান জন্ম দাও। তোমাদের এমন অত্যাচারি স্বামী নেই, যারা বাধা দেবে। এবং নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের সন্তানদের ভ্রমণ হত্যা করো না!
সে এমন ভয়ানকভাবে আমার দিকে তাকাল যে, আমি জীবনেও তা ভুলব না। তার মুখ বিমর্ষ হয়ে গেছে, চোখ দুটো জ্বলছে। সে বলল, ‘সন্তানের ভ্রƒণ নষ্ট করা! তোমাদের পুরুষগুলো সেটা করতে বাধ্য করে!’
‘পুরুষরা,’ আমি বলতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার সামনে গভীর খাদ। কথার কোনো খেই পেলাম না। আমরা তিনজনের কেউই চাই না যে, এই মেয়েরা এমন ধারণা করুক যে, আমাদের মেয়েরা ওদের চেয়ে সমাজে কম মূল্যবান। এখন আমি বলতে লজ্জিত যে, ওই সোমেলের কাছে আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে উত্তর দিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম যে, কিছু অপরাধী, পাগল এবং ধরনের উগ্র ধরনের মেয়েরাই কেবল ভ্রমণ হত্যা করে। আমি বললাম, আমাদের অনেক স্থান আছে যেখানে এ ব্যাপারে সমালোচনা করা হয়। এটা অবশ্য আমি সত্যিই বলেছি। কিন্তু তারপর ওরা যতদিন আমাদের ব্যাপার ভালো করে বুঝতে না পেরেছে, ততদিন আমি আমাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করিনি। 
ঘুরিয়েফিরিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে আমি আবার আগের প্রশ্নে এলাম যে, কী করে ওরা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। 
সোমেলকে তার বিস্মিত হওয়া নিয়ে দুঃখিত এবং লজ্জিত মনে হলো। এখন আমি অতীতের দিকে তাকিয়ে ভাবি, বারবার ওরা আমাদের কথা শুনে ভেতরে ভেতরে কেমন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে, অথচ কতটা ভদ্র আচরণ করেছে।
ঠান্ডা মাথায় সে আমাকে ব্যাখ্যা দিয়েছে। আমি যা বুঝতে পেরেছি তা হলো : প্রথম ওদের নারীরা পাঁচটি করে সন্তান প্রসব করত। একটি জাতি গড়ে তোলার জন্য ওরা কয়েকশ বছর ধরে এভাবেই চলতে থাকে। এরপর একটা সময় ওরা বুঝতে পারে যে, এখন নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। এই ঘটনা ওদের সবার জন্য, সবাই সমানভাবে অনুভব করে। একটা সময় এসে নিজেদের সামর্থ বোঝার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। ফলে কয়েকটি প্রজন্ম গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি নজরে রাখল। 
সোমেল বলল, ‘আমাদের এ-কাজটি সম্পন্ন হওয়ার আগে আমাদেরকে নির্দিষ্ট রেশনের উপর নির্ভর করতে হতো। অবশেষে আমরা সেটি সম্পন্ন করলাম। দেখ, আমাদের একজনের একটি সন্তান আসার পূর্বে উল্লসিত হই। পুরো আগ্রহ ও মনোনিবেশ থাকে ওই নতুন বাচ্চাটির উপর। অতি সতর্কতার সঙ্গে এমন সময়ের ব্যাপারে আমরা শিক্ষাগ্রহণ করেছি। সেসব অল্পবয়েসি মেয়েরা এখনো সন্তান জন্ম দেয়নি, ওরা স্বেচ্ছায় সন্তান জন্ম দেওয়া স্থগিত রাখতে পারে। যখন ভেতর থেকে শিশু জন্ম দেওয়ার তাগিদ অনুভূত হয় তখন সে শারীরিক ও মানসিক কাজে মনোনিবেশ করে।’
সোমেল একটু বিরতি নিল। তার মিষ্টি মুখটা আরো নমনীয় হয়ে উঠল।
‘আমরা অচিরেই বুঝতে পেরেছিলাম যে, মায়ের ভালোবাসা বহু দিক থেকে আসতে পারে। আমার মনে হয় আমাদের সন্তানরা সবার এত ভালোবাসা পায় তার কারণ আমাদের নিজেদের কখনোই এতটা ভালোবাসা ছিল না।’
আমার কাছে বিষয়টা দুঃখজনক মনে হলো। তাই আমি বললাম, ‘আমাদের দেশেও এটি আমাদের জন্য একটা তীক্ষè এবং কঠিন বিষয়। এটিকে আমার কাছে এতটা শোচনীয় মনে হয় যে, বর্ণনা করা যায় না। গোটা মায়ের জাতি যেন ভালোবাসা ক্ষুধায় ভুগছে।’
তখন সে হাসল এবং আমি ভুল বুঝেছি বলে উল্লেখ করল। বলল, ‘বিষয়টা তুমি বুঝতে পারোনি। আমরা প্রত্যেকে লক্ষ লক্ষ সন্তানের মা। ওদের সবাইকে সমান ভালোবাসতে হয় এবং সেবা করতে হয়। ওরা ‘আমাদের সন্তান’।’
ওদের কথা আমার চিন্তার বাইরে। অসংখ্য নারী শুধু বলে, ‘আমাদের সন্তান’। আমার কাছে মনে হয় পিঁপড়া বা মৌমাছি কথা বলতে পারলে হয়তো এভাবে বলতো ‘আমাদের সন্তান’। 
কিন্তু ওরা সেটাই রপ্ত করেছে। 
যখন কেউ মা হতে চায় তখন সে তার নিজের মধ্যে বিষয়টি পুষতে থাকে এবং এই মিরাকল তৈরি হয়। আর যে বাচ্চা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় না, সে বিষয়টিকে তার মনে স্থান দেয় না। সে তার হৃদয়ের ভালোবাসা পূরণ করে অন্যদের জন্ম দেওয়া বাচ্চার মাধ্যমে। 
আমাদের সন্তানদের দিকে তাকিয়ে দেখি। ওরা আমাদের জনসংখ্যার পাঁচভাগের তিনভাগ। আর ওদের জনসংখ্যার মধ্যে শিশু তিনভাগের একভাগ। কত মূল্যবান এই বাচ্চারা! আমাদের কোনো রাজার একমাত্র উত্তরাধিকারি সন্তান অথবা কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তির শিশু অথবা  মধ্যবয়স্ক দম্পতির একমাত্র সন্তান- কেউ এই নারীস্থানের বাচ্চাদের সঙ্গে তুলনীয় নয়।  
এ নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগে আমি যে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছি, সেটা শেষ করতে চাই।  
ওরা কার্যকরভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফলে খাবারে পরিপূর্ণ, সবার জন্য সমৃদ্ধ জীবন। সবকিছু ওদের প্রচুর রয়েছে। বসবাসের রুম, আলো, বাতাস, নির্জনতা সব। 
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পর ওরা মনোযোগ দেয় ওদের দক্ষতা ও মানের উপর। প্রায় ১৫শ বছর ধরে ওরা অবাধে এই কোয়ালিটি তৈরি করার জন্য কাজ করেছে। আপনি কি মনে করেন যে, ওরা সত্যিই খুব চমৎকার মানুষ?
ওদের স্বাস্থ্য, সেনিটেশন, শারীরিক কালচারÑ সবকিছু একেবারে নিখুঁত করে তুলেছে বহুকাল আগে। অসুস্থতা ওদের কাছে প্রায় অজানা শব্দ। অসুস্থতা এতটাই অনুপস্থিত যে চিকিৎসা বিজ্ঞান বাস্তবে ওদের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়া শিল্প। অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন জন্ম, শক্তিশালী, যতেœ লালিত এবং খাঁটি জীবনযাপনে ওর অভ্যস্ত। 
যদি মনস্তত্বের কথা বলি, তাহলে এমন একটি জিনিস নাই, যা আমাদের হতবাক করেনি। যখন বেশি বেশি করে ওদের সম্পর্কে জানলাম, ওদের সবকিছুতে সুনিপুণ মুনশিয়ানা দেখলাম, তখন ওদের কাজ পছন্দ না করে উপায় নেই। আমাদের মতো অপরিচিত একটি সম্প্রদায়, বিপরীত লিঙ্গের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ওরা প্রথম থেকেই আমাদের বুঝতে পেরেছিল।
ওরা গভীর, বিস্তৃত জ্ঞান দিয়ে ওদের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যাগুলো দূর করেছিল। আমি আশা করি, পরে সেসব নিয়ে আলোচনা করব। ওদের জাতির ভালোবাসা পাওয়া সন্তানগুলিকে আমাদের সন্তানদের সঙ্গে তুলনা করলে বলা যাবে গোলাপের সঙ্গে খড়ের নাড়ার তুলনা। ওদেরকে একরকম ওভাবেই রোপণ করা হয়েছে। তারপরও সেটা দেখলে মনে হয় না। ওরা বহু শতক ধরে মানসিকশক্তি, ইচ্ছাশক্তি, সমাজের প্রতি আত্মত্যাগের যে শিক্ষা গ্রহণ করেছে তা সফল হয়েছে। 
এই চমৎকার ভূমিতে, এই বুদ্ধিমতী নারীদের মাঝে আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের মানসিকতা নিয়ে হঠাৎ ঢুকে পড়েছিলাম। এখন ওদের কাছ থেকে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ পেয়েছি, ওদের কাছে পোষ মেনেছি ভেবে ওরা আমাদের দেশ দেখাতে, মানুষ চেনাতে আমাদের বের করে আনল।


অধ্যায় ৭ 
আমাদের ভদ্রতা জ্ঞান অনেক বেড়েছে। আমরা যথেষ্ট মানিয়ে নিয়েছি ভেবে আমাদের কেচি দেওয়া হলো। আমরা যতটা সম্ভব নিজেদের চুল কাটলাম, দাড়ি ছোট করলাম। মুখভরা দাড়ির চেয়ে ছোট ছোট করে কাটা দাড়ি অনেক আরামদায়ক। স্বাভাবিক কারণেই ওদের কাছে রেজর নেই।   
টেরি অবজ্ঞার সুরে বলল, ‘এত বয়স্ক নারীদের দেশে, ওদের কাছে কিছু রেজর তো থাকা উচিত ছিল।’ এ সময় জেফ যুক্তি দিয়ে বলল যে, নারীদের মুখে যে একেবারেই পশম নেই তা সেও কখনো দেখেনি। বলল, ‘আমার কাছে মনে হয় পুরুষ ছেলের কোনো রকম সান্নিধ্য না থাকার জন্য এখানকার নারীরা আরো বেশি রমণীয় হয়ে গেছে।’ 
‘সেটা একটি কারণ হতে পারে,’ টেরি অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্বীকার করলো। ‘কম মেয়েলি বিষয়টি আমি খুব বেশি দেখিনি।    মাতৃত্ববোধ বলতে আমি যা বুঝি তা হলো একজন মায়ের একটি বাচ্চা থাকলেই হলো না।’
মাতৃত্ব সম্পর্কে টেরির যে ধারণা তা হলো মায়ের কোলে একটি বাচ্চা, অথবা হাঁটুর কাছে একদল বাচ্চা এবং সেই বাচ্চাদের ভেতরে মা পুরোপুরি ডুবে থাকবে। কিন্তু মায়েরা সমাজে শিল্প-সংস্কৃতি ও সমাজে প্রভাব বিস্তার করবে, শিশুকে সার্বিকভাবে নিরাপদ করবে আর সেটাই হবে শিশুর প্রকৃত যতœ ও প্রশিক্ষণ-এমন ধারণা টেরির ভেতর নেই। 
আমরা ওদের দেওয়া জামাকাপড়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। ওদের দেওয়া জামাকাপড় আমাদের নিজস্ব জামা কাপড়ের মতোই আরামদায়ক। এবং অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেখতে খুবই সুন্দর। পকেটের ক্ষেত্রে ওরা কোনো কিছু অপূর্ণ রাখেনি। সেগুলো সুন্দর করে সেলাই করা। সেগুলো এত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে যাতে হাত রাখতে সুবিধা হয় আর শরীরের জন্য অস্বস্তি না হয়। সেই সঙ্গে মজবুত, চমৎকার ডিজাইন ও নিখুত সেলাই।
আমাদের প্রথম স্বাধীন চলা ছিল দেশব্যাপী ব্যক্তিগত ভ্রমণ। চারপাশে কোনো গার্ড নেই। আমাদের একেকজনের সঙ্গে শুধু আমাদের একজন বিশেষ শিক্ষক। জেফ বলল, সে জাভাকে তার খালার মতো ভালোবাসে। তার কথা হলো জাভার মতো এমন হাস্যোজ্জ্বল, আন্তরিক একজন খালা সে কখনো দেখেনি। সোমেল এবং আমি দুজন দুজনের প্রতি ভীষণ আন্তরিক। দুজনই আমরা মিশুক প্রকৃতির। কিন্তু টেরি আর মোয়াদিনের সম্পর্কটা ফানি। টেরির সঙ্গে মোয়াদিন বেশ ধৈর্যশীল এবং শিষ্টাচারপূর্ণ। তার ধৈর্য আর ভদ্রতা অনেকটা একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ কূটনীতিকের একজন স্কুল বালিকার সঙ্গে যেমন হয়, ঠিক তেমনি। টেরির সব উদ্ভট কথায় সে চুপ করে থাকে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্মতি দেয়। ভদ্রতার সঙ্গে হাসে। জেফ আর আমি ওদের কা- দেখে নীরবে হাসি।   
টেরি কখনোই মেয়েটির উন্নতমানের বিষয়টি বুঝতে পারেনি। মোয়াদিন যখন আর তর্ক করেন না, তখন টেরি মনে করে ওকে ঠকিয়ে দিয়েছে। মোয়াদিনের  হাসি দেখে টেরি মনে করে তার বুদ্ধি এবং রসিকতার কারণে সে হাসছে। 
টেরির আমার প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধ আছে, এটা আমি বিশ্বাস করতাম না। আমি নিশ্চিত, জেফও তাই মনে করত। কিন্তু একথা আমরা অন্য কারো সঙ্গে কখনো আলাপ করিনি। যদিও আমরা ওর অপারগতাগুলো জানতাম। কিন্তু অন্য লোকদের সঙ্গে আমরা ওর তুলনা করে দেখেছি, ও সম্পূর্ণ আলাদা টাইপের। আমরা ওর নৈতিকতা সম্পর্কে জানতাম। সেগুলো ওর ব্যর্থতার চেয়ে অনেক বড়ো। আমাদের দেশের মেয়েমানুষদের মধ্যে ওর একটা উচ্চআসন ছিল। দৃশ্যত ও ছিল জনপ্রিয়। এমনকি তার স্বভাব সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও কেউ তাকে খাটো করে দেখত না। তার স্ফূর্তিবাজ স্বভাবের জন্য সুনামও ছিল। একটা ভিন্ন আকর্ষণ ছিল। 
মোয়াদিন বেশ বড়োসড়ো একজন নারী। সে অনুযায়ী তার শক্তিও আছে, যা বোঝা যায় না। তার চোখ তীরন্দাজের মতো তীক্ষè। সে তার দায়িত্বের ব্যাপারে ভীষণ সচেতন ছিল। 
আমরা যখন নিজেরা একজায়গায় হতাম, টেরি তখন মোয়াদিনকে বলত মাউদ। বলত, মাউদ মানুষটা ভালো, কিন্তু একটু ধীরজ। কিন্তু ওর কথা সম্পূর্ণই ভুল ছিল। জেফের জন্য নিয়োজিত শিক্ষককে টেরি কখনো বলত জাভা, কখনো মোচা বা  প্লেন কফি। যখন নেতিবাচক কিছু বলত, তখন ডাকত চিকোরি (এক ধরনের ফুল) বা পোস্টাম। কিন্তু সোমেল এ ধরনের কৌতুকের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। তাকে বড়োজোর বলা হতো ‘সাম এল’। 
একদল মেয়ের সঙ্গে দেখা হলো। ওরা খুবই আনন্দিত এবং উল্লসিত। একদিন টেরি অদ্ভুত সব এক শব্দের নাম দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাদের একটির বেশি নাম নেই?’ 
‘হ্যাঁ, অবশ্যই আছে,’ মোয়াদিন বলল। ‘আমাদের অনেকেরই বর্ণনামূলক নাম আছে। ওই নামগুলো আমাদের অর্জন করতে হয়। তা আবার কখনো কখনো চেঞ্জ হয় অথবা নামের সঙ্গে আরো কিছু যুক্ত হয়। তবে জীবনটা যদি অস্বাভাবিক সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে তখন। যেমন আমাদের ল্যান্ড মাদার। তোমরা যাবেক বলো প্রেসিডেন্ট বা রাজা। শিশুকালে তার নাম ছিল মেরা। অথবা মেরা নামে তাকে ডাকা হতো। আমাদের এখানে মেরা শব্দের অর্থ চিন্তাশীল। পরে তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় দু-দু মেরা। যার অর্থ জ্ঞানী চিন্তাশীল। এখন তাকে আমরা ডাকি ও-দু মেরা। যার অর্থ গ্রেট বুদ্ধিমতী চিন্তাশীল। তোমাদের সঙ্গে শীঘ্রই তার সাক্ষাৎ হবে।’ 
‘তার মানে তোমাদের কোনো পদবি বা উপাধিযুক্ত নাম নেই?,’ টেরি জানতে চাইল। ‘কোনো পারিবারিক উপাধিযুক্ত নাম নেই?’ 
‘কেন থাকবে? আমরা সবাই এক উৎস থেকে এসেছি। আমরা সবাই প্রকৃতপক্ষে একই পরিবারের মানুষ। চিন্তা করে দেখ, আমাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এই একটা সুবিধা আমাদের দিয়েছে।’ 
আমি বললাম, ‘কিন্তু সব মা-ই কি চায় না তার বাচ্চার নামের সঙ্গে নিজের নামটাও থাকুক?’
‘কেন চাইবে, বাচ্চার তো নিজের নাম আছেই।’
‘এই কারণে চাইবে যে, কেউ বাচ্চাটির নাম শুনলেই বুঝবে যে, অমুকের বাচ্চা।’
 সোমেল উত্তরে বলল, ‘আমরা খুবই যতেœর সঙ্গে সব রেকর্ড রাখি। আমাদের প্রত্যেকে প্রথম মায়ের কাছ থেকে কীভাবে এসেছি, তা জানা আছে। সেটাই আমাদের বংশানুক্রম। বহু কারণে আমরা এই ক্রমানুসরণ করে থাকি। সে কারণে কে কোন মায়ের সন্তান সেটা জানা জরুরি নয়।’
অন্য অনেক কিছুর মতোই আমরা এক্ষেত্রেও বুঝতে পারলাম, খাঁটি মাতৃতান্ত্রিক এবং পুরুষতান্ত্রিক স্বভাবের মধ্যে পার্থক্য কী। অদ্ভুতভাবে এখানে দেখা যায় ব্যক্তিগত গর্ব বলতে তেমন কিছু নেই। 
জেফ জানতে চাইল, ‘তোমাদের অন্যান্য কর্মকা-ের বেলায় ব্যাপারটা কেমন? বই, মূর্তি এসব তৈরি করে তোমরা তার উপর স্বাক্ষর করো না?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা সবাই গর্বিত মানুষ। সবার মধ্যে আত্মতুষ্টি আছে। তুমি একটি বাড়ির উপর, একটি ফার্নিচারের উপর অথবা একটি পাতিলের উপরও ছোট স্বাক্ষর দেখতে পাবে। তা নাহলে যে কেউ ভুলে যেতে পারে যে, কাকে আমাদের কৃতজ্ঞতাটা জানাব। এজন্য আমরা জানতে চাই।’ 
‘তুমি এমনভাবে কথা বলছ যে একটি কাজ কেবলে করা হয়েছে সেটির গ্রাহকের জন্য, যে তৈরি করেছে তার কোনো গর্বের বিষয় নাই,’ আমি বললাম।
‘ব্যাপার দুটোই। আমরা আমাদের কাজটির ব্যাপারে গর্ববোধ করি,’ সোমেল বলল।   
... (চলবে )