কবিগুরুর জন্মদিন আজ

কবিগুরুর জন্মদিন আজ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্মদিনের আড়ম্বর নিয়ে কবি নিজেই ১৩৪৩ সালে প্রবাসী পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘খ্যাতির কলবর মুখর প্রাঙ্গণে আমার জন্মদিনের যে আসন পাতা রয়েছে সেখানে স্থান নিতে আমার মন যায় না। আজ আমার প্রয়োজনে স্তব্ধতায় শান্তিতে।’

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘হে নূতন’ গানে চির নতুনের মধ্যে দিয়ে তাঁর নিজের পৃথিবীকে আগমনের শুভক্ষণকে তুলে ধরেছিলেন। আজ পঁচিশে বৈশাখ, বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ ও বহুমুখী প্রতিভা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০তম জন্মদিন।

 

 

জন্মদিনের আড়ম্বর নিয়ে কবি নিজেই ১৩৪৩ সালে প্রবাসী পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘খ্যাতির কলবর মুখর প্রাঙ্গণে আমার জন্মদিনের যে আসন পাতা রয়েছে সেখানে স্থান নিতে আমার মন যায় না। আজ আমার প্রয়োজনে স্তব্ধতায় শান্তিতে।’

 

 

১২৬৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে জন্ম নেন বাংলা সাহিত্যের অনন্য দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথম নোবেল বিজয়ী বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মা-বাবার চতুর্দশ সন্তান। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল ব্রাহ্ম আদি ধর্ম মতবাদের প্রবক্তা। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অগ্রণী বাঙালি কবি, কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, সংগীত রচয়িতা, সুরস্রষ্টা, গায়ক, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। সৃষ্টিশীলতার সমান্তরালে তিনি ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি ও সমাজভাবনা সমানভাবেই চালিয়ে গেছেন। বিশ্বভারতী তাঁর বিপুল কর্মকাণ্ডের একটি প্রধান কীর্তি। তাকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়।

 

 

বাল্যকালে প্রথাগত বিদ্যালয়ের শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেননি, গৃহশিক্ষক রেখে বাড়িতেই তার শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন এবং ১৮৭৪ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় তাঁর ‘অভিলাষ’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা। মাত্র ১৭ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টারি পড়তে ইংল্যান্ডে যান। সেখানে তিনি ব্রাইটনের একটি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৭৯ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু সাহিত্যচর্চার প্রতি অধিক আগ্রহের কারণে তাঁর আর ব্যারিস্টারি হয়নি।  প্রায় দেড় বছর ইংল্যান্ডে কাটিয়ে ১৮৮০ সালে কোন ডিগ্রি না নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। ১৮৮৩ সালের ভবতারিণীর সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহিত জীবনে ভবতারিণীর নামকরণ হয়েছিল মৃণালিনী দেবী।

 

 

মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও বিহারীলালের লেখনীর মাধ্যমে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার সূচনা হলেও রবীন্দ্রনাথের হাতেই তা পূর্ণতা পায়। বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ছিলেন মূলত একজন কবি। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন একটা না থাকলেও মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কাব্যরচনা শুরু করেন তিনি। তাঁর প্রকাশিত মৌলিক কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৫২।  প্রায় দুই হাজার গান লিখেছেন, যা এখনো জয় করে চলেছে নবীন, প্রবীণ সকলকেই।

 

 

কবিতা ও গান ছাড়াও তিনি ১৩টি উপন্যাস, ৯৫টি ছোটগল্প, ৩৬টি প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ এবং ৩৮টি নাটক রচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনা রবীন্দ্র রচনাবলী নামে ৩২ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া তাঁর সামগ্রিক চিঠিপত্র উনিশ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। ভাব গভীরতা, গীতিধর্মিতা, চিত্ররূপময়তা, অধ্যাত্মচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোম্যান্টিক সৌন্দর্যচেতনা, ভাব-ভাষা-ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তব চেতনা ও প্রগতি চেতনা রবীন্দ্র কাব্য সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য। তাঁর গদ্য ভাষাও কাব্যিক। ভারতীয় ধ্রুপদী ও লৌকিক সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞান চেতনা ও শিল্প দর্শন তার রচনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল।

 

 

গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান তিনি । বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের লেখা গান। তিনি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডে প্রতিবাদে তিনি সেই উপাধি ত্যাগ করেন।

 

 

রবীন্দ্রসাহিত্য, বিশেষত রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির কাছে আলোকবর্তিকা হয়ে দেখা দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর তাঁর গানই বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে।

 

 

রবীন্দ্রনাথ বাংলা ও বাঙালির অহংকার। অসাধারণ সব সাহিত্যকর্ম দিয়ে তিনি বিস্তৃত করেছেন বাংলা সাহিত্যের পরিসর, সম্প্রসারিত করেছেন বাঙালীর ভাব জগৎ। তাঁর অসাধারণ কীর্তির জন্য তিনি বেঁচে থাকবেন সারাজীবন।