‘মুক্তিযুদ্ধে নারী’​​​​​​​

শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় সৈনিক ছিলেন রোকেয়া কবির

পর্ব- ০৩

শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় সৈনিক ছিলেন রোকেয়া কবির
মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া কবির
তিনি দলবল নিয়ে ডামি রাইফেল দিয়ে রাস্তায় মার্চপাস্ট করেন। মার্চপাস্ট করার সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ হাততালি দিয়ে তাদের অভিবাদন জানায় ও উৎসাহিত করে। রাইফেল কাঁধে মার্চপাস্টের ছবি পত্রিকায় ছাপা হলে তিনি পরিচিত হয়ে যান। ব্যাপক পরিচিত মুখ হয়ে যাওয়ায় পরবর্তীতে তাকে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে।

লক্ষ্য প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতার পিছনে রয়েছে হাজারো গল্প। ত্যাগের গল্প, সাহসিকতার গল্প, বীরত্বের গল্প। এই অর্জিত স্বাধীনতা রাতারাতি আসেনি। বহু সাধনার পর অর্জন হয়েছে এই স্বাধীন বাংলাদেশ। মাতৃভূমি বিজয়ের পিছনে রয়েছেন অনেকে। মুক্তিযোদ্ধারা যদি সাহস নিয়ে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাকসেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করতো তাহলে হয়তো আমরা এই স্বাধীন দেশ কখনোই পেতামনা। বাংলাদেশের ইতিহাস এই মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বে গাঁথা ইতিহাস। কেবল অস্ত্র হাতে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ নয় এর পিছনেও ছিলো অনেক সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। 


অনেকে মনে করেন মুক্তিযুদ্ধে কেবল পুরুষরাই মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। কিন্তু তা ঠিক নয়। মুক্তিযুদ্ধে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও ছিলো সক্রিয় ভূমিকা। বাড়ির পুরুষেরা যখন যুদ্ধে তখন তারাও থেমে থাকেননি। কেউ হয়ত সম্মুখ যুদ্ধ করেছেন, আবার কেউ ভারতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, কেউ বা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন, আবার কেউ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, খাবার দিয়েছেন, অস্ত্র লুকিয়ে রেখে তাদের সাহায্য করেছেন। তাই মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান অনস্বীকার্য।এরকমই একজন সাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া কবির। কেবল মুক্তিযুদ্ধে নয় মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকে সংগঠিত বিভিন্ন আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। আজ আমরা রোকেয়া কবিরের সম্পর্কে জানবো।


১৯৫১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনা জেলার কাটলী গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া কবির জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা সৈয়দা বদরুন্নেসা ও বাবার নাম সৈয়দ মোহাম্মদ খান। নয় ভাইবোনের মধ্যে তারা ছয়জনই মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন৷ ছোট থেকেই তিনি বিভিন্ন আন্দোলনের সাথে জড়িত আছেন। ১৯৬২ সালে মাত্র এগারো বছর বয়সে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় নেত্রকোনায় শিক্ষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকে নানা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন রোকেয়া৷ ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০ এর কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন তিনি ছিলেন সক্রিয়। কলেজ জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। 

এরপর ১৯৬৯ সালে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক সম্মানে ভর্তি হন তিনি। এর মাধ্যমে তিনি আন্দোলনের সাথে আরো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। কিছু আন্দোলনে তিনি ভলেন্টিয়ারের দায়িত্বও পালন করেছেন। সে সময় স্কুল-কলেজে ক্লাস হত না। প্রতিদিন মিছিল-মিটিং, পথসভা, পল্টন ময়দানে সমাবেশ হত। ওই বছরই সহপাঠীদের সঙ্গে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। এরপর অসহযোগ আন্দোলনে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন তিনি।   


’৭১ এর মার্চের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টির যৌথ আয়োজনে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়৷ সেখানে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নিতেন রোকেয়া৷ ছাত্রী ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন তিনি৷ প্রায় ৪০ জন মেয়ে এ সময় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলো। ১০ দিন এই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিদিন প্রশিক্ষণের পর বিকেলে কলাবাগান, গ্রিন রোড, মগবাজারের পাড়ায় পাড়ায় বিভিন্ন পেশার মানুষদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দিতেন তিনি। তখন সারা দেশের শহরগুলোতে রাইফেল দিয়ে ট্রেনিং না নিলেও নারী-পুরুষ মিলেই বাঁশের লাঠি, সুপারি ও নারকেলে গাছের অংশ বন্দুকের মতো বানিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। 


এরপর তিনি দলবল নিয়ে ডামি রাইফেল দিয়ে রাস্তায় মার্চপাস্ট করেন। মার্চপাস্ট করার সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ হাততালি দিয়ে তাদের অভিবাদন জানায় ও উৎসাহিত করে। রাইফেল কাঁধে মার্চপাস্টের ছবি পত্রিকায় ছাপা হলে তিনি পরিচিত হয়ে যান। ব্যাপক পরিচিত মুখ হয়ে যাওয়ায় পরবর্তীতে তাকে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে।


ঢাকার পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় ২৯ মার্চ ঢাকা থেকে নদীপথে গ্রামের বাসা কাপাসিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয় তাঁকে৷ এরপর একদিন কমিউনিস্ট পার্টির জ্ঞান চক্রবর্তীর চিরকুট পান তিনি তাতে লেখা ছিল, ‘শহীদুল্লাহর সঙ্গে চলে এসো।’ এরপর আগরতলায় চলে যান তিনি। 


ভারতে গিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাণ্ড পুনরায় শুরু করেন। ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে তিনি হাসপাতালের জন্য নার্স সংগ্রহ করে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন। মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করে তাঁদের প্রশিক্ষণের এবং পরে তাদের দেশের ভেতরে গেরিলা যুদ্ধে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন তিনি। বিভিন্ন ক্যাম্পে শিশু-কিশোরদের স্কুলের ব্যবস্থা করেছেন, তাদের পড়ানোর জন্য ক্যাম্পের মধ্য থেকেই শিক্ষক খুঁজে বের করেছেন৷ তিনি নিজেও গণিত ও ইংরেজি পড়াতেন। ভারতের আগরতলায় ৩০টি শরণার্থী ক্যাম্প ছিলো। এসব ক্যাম্পে তিনি কাজ করেছেন।


রোকেয়া কবির পাক সেনাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ করেননি, তিনি পালন করেছেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের দায়িত্ব। একজন নারী হয়েও তিনি যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যিই বিরল। নিজ দেশে তিনি সাহসিকতার সাথে লড়েছেন। ভারতে ‍গিয়েও তিনি থেমে থাকেননি। একভাবে কাজ করে গেছেন স্বাধীনতার জন্য। দেশ স্বাধীন হলে ২৪ শে ডিসেম্বর আগরতলা থেকে স্বাধীন মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন রোকেয়া কবির৷ বর্তমানে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ-বিএনপিএস এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রোকেয়া কবির৷ তার সর্বাঙ্গীণ সুস্থতা কামনা করছি।