শরণার্থী-মা আলদাসের অলিম্পিকে আসার গল্প 

শরণার্থী-মা আলদাসের অলিম্পিকে আসার গল্প 
সানদা আলদাস
সার্বিয়ার ১০ বছরের প্রতিদ্বন্দ্বী মারিকা পেরিজিকের কাছে হেরে গেছেন তিনি। সার্বিয়ান জুডোকা দুইবারের ইউরোপিয়ান জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন। দুই বার জুডোর সিনিয়র গ্র্যান্ডসে ব্রোঞ্জ জিতেছেন। সহজেই হারিয়েছেন আলদাসকে। তবুও একজন শরণার্থী ও তিন সন্তানের মা হয়ে টোকিও পর্যন্ত আসতে পেরেই দারুণ খুশি আলদাস।

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির শরণার্থী দলের হয়ে অলিম্পিকে অংশ নিয়েছিলেন সানদা আলদাস। অলিম্পিকে পদক না জিতলেও বিশ্বমঞ্চে এক অন্য মাত্রার সাফল্য দেখিয়েছেন তিনি। নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে অন্য দেশের শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নেয়া থেকে অলিম্পিকে আসার গল্প সত্যিই চোখে জল এনে দেয়। জীবনের এই কঠিন যাত্রায় তার স্বপ্ন একটিই ছিলো- অলিম্পিকে অংশ নেয়া। নানা প্রতিকূলতার মাধ্যমে তিনি এই স্বপ্ন পূরণ করেছেন। চলুন আজ আলদাসের গল্প জেনে নেয়া যাক।

 

৩১ বছর বয়সের সানদা আলদাস তিন সন্তানের জননী। মাতৃভূমি সিরিয়াতেই তার বেড়ে ওঠা। দামেস্কে বেড়ে ওঠা আলদাস জুডো খেলতেন ৭-৮ বছর বয়স থেকেই। একটা পর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন সিরিয়ার জাতীয় জুডো দলেও। তখনই স্বপ্ন দেখতেন একদিন অলিম্পিকের মতো বড় পর্যায়ে খেলবেন। স্বামীর সঙ্গে দামেস্কে বাস করতেন আলদাস। কিন্তু গৃহযুদ্ধের কারণে সিরিয়া রূপ নেয় বিভৎস এক নগরীতে। গৃহযুদ্ধের বীভৎসতায় টিকতে না পেরে ২০১৫ সালে স্বামী ফাদিয়া দারিশ ও এক সন্তানকে নিয়ে নেদারল্যান্ডস পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। সিরিয়া থেকে ছিন্নমূল হয়ে সেখানে যাওয়া এরপর শরণার্থী শিবিরে বাস করাটা সহজ ছিল না। সেখানে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির জটিলতা একা হাতে সামলেছেন। এরমধ্যে অনুশীলনও জারি রেখেছিলেন। এটা সম্ভব হয়েছিল তার স্বামীর জন্য। কারণ ফাদিয়া নিজেই স্ত্রীর জুডো কোচিং করিয়েছেন। ছয়মাস শরণার্থী শিবিরে থেকে কষ্ট করেছেন। এরপর অন্য জীবন। এসময় তিনি মানিসিক স্বাস্থ্যটা ধরে রাখার চেষ্ট করতেন।

 

ছয় মাস শিবিরে কাটানোর পর পরিবারসহ চলে যান আমস্টারডামে। জুডো ততদিনে প্রায় অতীত হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে। এর মধ্যে গর্ভে আসে দ্বিতীয় সন্তান। সেখানে তার আরও দুই সন্তানের জন্ম হয়। তবে স্বপ্নটা যেহেতু মাথায় গাঁথা, সন্তান জন্মের পর ঠিকই আবার জুডোয় মনোনিবেশ করেন আলদাস। এদিকে তার স্বামী দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন নেদারল্যান্ডসে জুডো কোচিংয়ের লাইসেন্সের জন্য। 

 

ডাচদের মাটিতেই বেড়ে উঠেছে আলদাসের অলিম্পিকে অংশগ্রহণের স্বপ্ন। পরিবার থিতু হওয়ার পরই কঠোর অনুশীলন শুরু করেন। ক্রমশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মতো ফিটও হয়ে  ওঠেন। আইজেএফের শরণার্থী দলের হয়ে ২০১৯ সালের পর ২০২১ সালেও আলদাস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার সুযোগ পান। একপর্যায়ে জায়গা মিলে যায় টোকিও অলিম্পিকের শরণার্থী দলেও। ২৯ জন শরণার্থীর মধ্যে জুডোকা নেওয়া হয় ৬ জন।

 

যদিও সার্বিয়ার ১০ বছরের প্রতিদ্বন্দ্বী মারিকা পেরিজিকের কাছে হেরে গেছেন তিনি। সার্বিয়ান জুডোকা দুইবারের ইউরোপিয়ান জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন। দুই বার জুডোর সিনিয়র গ্র্যান্ডসে ব্রোঞ্জ জিতেছেন। সহজেই হারিয়েছেন আলদাসকে। তবুও একজন শরণার্থী ও তিন সন্তানের মা হয়ে টোকিও পর্যন্ত আসতে পেরেই দারুণ খুশি আলদাস। তিনি প্রমাণ করেছেন, মনোবল আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সবকিছুই সম্ভব। পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর কাছে এক আদর্শে পরিণত হয়েছেন তিনি।