সুপারহিরো মা রোকেয়া বেগম!

সুপারহিরো মা রোকেয়া বেগম!
সুপারহিরো মা রোকেয়া বেগম!
রোকেয়া বেগম একজন সফল মা। সন্তানদের নিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন শূন্য থেকে। এই কঠিন জীবন যখন তিনি শুরু করেছিলেন তখন তার কাছে কোনো অর্থই ছিলোনা। ছিলো কেবল স্বপ্ন।  সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন। একজন সুপারহিরোর মতো তিনি দুই সন্তানকে লালন করেছেন। মানুষ করেছেন। আজ তার সকল স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। নারী হিসেবে, মা হিসেবে তিনি সার্থক।

জীবনে চলার পথে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। তারপরও সংগ্রাম করে এগিয়ে যেতে হয় আমাদের। এই ঘটনা সবার জীবনেই খুব সাধারণ। কিন্তু মায়েদের জীবনে এই ঘটনা আরও বেশি। এমনই একজন মা হলেন রোকেয়া বেগম। অনেক কষ্ট করে, খেয়ে না খেয়ে ছেলেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। তার জীবনসংগ্রামের গল্প শুনবো আজ।

 

রোকেয়া বেগমের বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার গোটিয়া গ্রামের। দুই ছেলে সুজন আলী ও আবু রায়হান। ছেলেরা ছোট অবস্থায় স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটে রোকেয়ার। বিচ্ছেদের পর দুই সন্তানকে নিয়ে পথে নেমেছিলেন। ছেলেদের মুখে খাওয়া তুলে দিতে মাঠে কাজ করেছেন। কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করেও রোজগার করতে হয়েছে। মা রোকেয়া বেগম ছেলেদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। তার ছেলেরা লেখাপড়া শিখে বড় হবে। তাই তিনি শত কষ্ট করেও ছেলেদের লেখাপড়া চালিয়ে যান।

 

তাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। প্রতিদিন কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে দুই ভাই পড়তে বসত। সেই কেরোসিন দোকান থেকে বোতলে করে নিয়ে আসা হতো। বড় ভাই সুজন আলী বোতল না পেয়ে একদিন দোকান থেকে একটি পুরোনো পেপসির বোতলে করে কেরোসিন নিয়ে আসে। ছোট ভাই আবু রায়হানের পেপসি খুব পছন্দ করতো। বাসায় রাখা পেপসির বোতলে রাখা কেরোসিনকে পেপসি মনে করে খেয়ে ফেলে সে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। তখন তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। প্রতিদিনের খাবার যোগাড়ই রোকেয়ার কাছে কঠিন বিষয় ছিলো তখন।

 

২০০৭ সালে সবাইকে তাক লাগিয়ে সুজন আলী এসএসসি পরীক্ষায় পুঠিয়ার ধোপাপাড়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পায়। তার এই সাফল্যের পর শিক্ষকেরা সবাই বলতে থাকেন, এই ছেলেকে শহরের কলেজে পড়াতে হবে। এবার সুজনের মা কাঁদতে শুরু করেন। এত দিন প্রয়োজনে নিজে না খেয়ে দুই সন্তানকে বাড়িতে রেখে মানুষ করেছেন। এবার তিনি কী করবেন? এমনিতেই ছেলেকে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ানোর মতো সামর্থ্য তার নেই। তার ওপর বিজ্ঞান বিভাগ, খরচ আরও বেশি। আর শহরের কথা তো তিনি ভাবতেই পারেন না।

 

সুজনের পাশের গ্রাম ধোপাপাড়ায় সোহরাব খোকনের বাড়ি। সোহরাব রাজশাহী কলেজে পড়তো। সে ঝুঁকি নিয়ে সুজনকে রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন। সে সময় একটি দৈনিক পত্রিকা থেকে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হতো। ২০০৭ সালের ৪ আগস্ট রাজশাহী জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে খোকনই মা–ছেলেকে নিয়ে আসেন।

 

সেদিন সুজন আলী ও তার মাকে মঞ্চে ওঠানো হয়েছিল। তাদের গল্প শুনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। সবকিছু জেনে নিউ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক সাইফুর রহমান চৌধুরী নিজের মেসে রেখে সুজনকে বিনে পয়সায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এগিয়ে আসেন রাজশাহীর সপুরা সিল্ক মিলসের স্বত্বাধিকারী প্রয়াত সদর আলী। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সুজন আলী রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরকৌশলে পড়ালেখা শেষ করে চাকরিতে যোগ দেন।

 

চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর সুজন আলী মাকে তার কর্মস্থলে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু নিজ গ্রাম ছেড়ে থাকতে মায়ের ভালো লাগে না। তা ছাড়া গ্রামে নিজের কোন বাড়ি নেই। এ নিয়ে মায়ের মনে কষ্ট ছিল। বুঝতে পেরে ছেলে সুজন আলী গোটিয়া গ্রামের বাজারের পাশে এক খণ্ড জমি কিনে মাকে সুন্দর একটি বাড়ি করে দিয়েছেন।

 

বড় ছেলে সুজন আলী এখন চট্টগ্রামের একটি প্রতিষ্ঠানের উপ প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট ছেলে আবু রায়হান পাবনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ছেন। 

 

রোকেয়া বেগম একজন সফল মা। সন্তানদের নিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন শূন্য থেকে। এই কঠিন জীবন যখন তিনি শুরু করেছিলেন তখন তার কাছে কোনো অর্থই ছিলোনা। ছিলো কেবল স্বপ্ন।  সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন। একজন সুপারহিরোর মতো তিনি দুই সন্তানকে লালন করেছেন। মানুষ করেছেন। আজ তার সকল স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। নারী হিসেবে, মা হিসেবে তিনি সার্থক। রোকেয়া বেগমের মতো সকল মা-ই সুপারহিরোর মতো আমাদের জীবনকে সহজ করে দিচ্ছেন, সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের।