নিরজাঃ দায়িত্ব রক্ষার্থে আত্মবলিদানকারী এক নারী

নিরজাঃ দায়িত্ব রক্ষার্থে আত্মবলিদানকারী এক নারী
নিরজা ভানোট
জঙ্গিদের অবস্থার টের পেয়ে, কৌশলে তাদেরকে না বুঝতে দিয়ে দ্রুত ককপিটকে সতর্ক করে দেয় নিরজা । যাতে জঙ্গিরা বিমানটি অন্য কোথাও উড়িয়ে নিয়ে চলে যেতে না পারে,  এবং তিনজন পাইলট, কো-পাইলট ককপিট থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর।  নিরজা ভানোট মাঝরাতে প্যান অ্যাম ফ্লাইট ৭৩ -য়ে ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট -এর ডিউটিতে যাচ্ছেন।  আর কয়েক ঘন্টা পর তার ২৪ বছরে পা দেয়ার কথা।  কিন্তু ২৪ এ পা দেওয়া হলনা তার। কি ছিল তার কারণ? আবার অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে কে এই নিরজা ভানোট? 


আগেই বলে রাখি, ' নিরজা' একটি ভারতীয় আত্মজীবনীমূলক থ্রিলার চলচ্চিত্র। যে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে সাহসী এক ভারতীয় তরুণী নিরজা ভানোটের বাস্তব জীবনের গল্প নিয়ে,  যিনি ১৯৮৬ সালে প্যান অ্যামের ফ্লাইটে ৩৫৯জন যাত্রীর জীবন রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।


১৯৮৬ -র ৫ই সেপ্টেম্বর মাঝরাতে  ডিউটিতে যাওয়ার পথে গাড়িতে প্রেমিকের পাশে বসে নিরজা বলে, ‘আগামীকাল জন্মদিনের দিন যদি ফিরতে না পারি , তাহলে এই হোর্ডিং -এর সামনে এসে আমাকে উইশ করে যেও৷ ’ ঠিক পরের মাঝরাতে হোর্ডিং -এর সামনে আসে ঠিকই কিন্তু উইশ করতে নয়। সেখানে এসে নীরবে কাঁদে তার প্রেমিক। কারণ অন্যদিকে আততায়ীর গুলতি মৃত্যুর মুখে তার প্রেমিকা।  


বিমানটি মুম্বাইয়ের সাহার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে করাচিতে অবতরণ করে, যেখানে  ছদ্মবেশে আবু নিদাল সংগঠনের চার সন্ত্রাসী বিমানটিকে হাইজ্যাক করে। ছিনতাইকারীদের উদ্দেশ্য ছিল বিমানটি ইসরায়েলে নিয়ে কোন দালানে বিধ্বস্ত করা।


জঙ্গিদের অবস্থার টের পেয়ে, কৌশলে তাদেরকে না বুঝতে দিয়ে দ্রুত ককপিটকে সতর্ক করে দেয় নিরজা । যাতে জঙ্গিরা বিমানটি অন্য কোথাও উড়িয়ে নিয়ে চলে যেতে না পারে,  এবং তিনজন পাইলট, কো-পাইলট ককপিট থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।  তাই সন্ত্রাসীরা সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন নাগরিকদের একে একে হত্যা করবে। তারা ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের নির্দেশ দেয় যাত্রীদের পাসপোর্ট সংগ্রহ করে আনার জন্য। কিন্তু নীরজা আর তার সহকারীরা ৪১ জন মার্কিন যাত্রীর পাসপোর্ট  লুকিয়ে ফেলে। এর ফলে মার্কিন নাগরিকদের শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু  দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টা  ৩৬১ জন যাত্রীসহ বিমানে জিম্মি  থাকতে হয় নিরজাকেও। 
আর এই পুরা সময়টায় নিরজাকে দেখা যায় একজন সাহসী, বিচক্ষণ নারী হিসেবে সবটা সামলাতে। 


তবে এখানে তাকে কোন সুপার ওম্যান হিসেবে তুলে ধরেননি পরিচালক। গল্পের নিরজাও আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো। তিনিও জঙ্গিদের ভয় পান। বাথরুমে গিয়ে কাঁদেন। কিন্তু তাদের সামনে এসে নিজের  বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করে যান। এমনকি  জিম্মি থাকা অবস্থায়  যখন, একজন যাত্রী নিজেকে আমেরিকান নাগরিক বলায়  তাকে সাথে সাথে হত্যা করে  জঙ্গিরা। তাতে যথেষ্ট  ভয় পেয়েও  নিজেকে সামলে নেন নিরজা।  


এমনকি তখনও এ কে -৪৭ -এর নলের মুখে দাঁড়িয়ে যাত্রীদের  জল-খাবারের ব্যবস্থা করেন এবং জঙ্গিদের বলেন,  ' আপনারা আপনাদের ডিউটি পালন করছেন। আপনাদের মতো আমিও আমার ডিউটি করছি৷’ কিন্তু জঙ্গিরা মাথা ঠাণ্ডা রাখেনা। ঘটনা শুরুর ১৬ ঘণ্টা পর ছিনতাইকারীরা গুলি করা আর বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো শুরু করে। আর ঠিক সে সময় নিরজা বুদ্ধি করে একটি জরুরি নির্গমনের দরজা খুলে দেয়। যদিও প্রথমে বেরিয়ে নিজের প্রাণ রক্ষা করার  সুযোগ তার ছিল । কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি সর্বক্ষণ চেষ্টা করেছেন তার দায়িত্ব পালনের। তিনি সবার আগে যাত্রীদের বের হতে সাহায্য করতে থাকে এবং একসময় তিনটি শিশুকে গুলি থেকে আড়াল করতে গিয়ে নিরজা নিজের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেন।


অন্যদিকে নিরজার ব্যক্তিগত জীবনের বাধাগুলোও খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেন পরিচালক।  নিরজার জন্মও একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে যেখানে মেয়ে সন্তানের তুলনায় ছেলেসন্তানকেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ  মনে করা হয়।
তবে নিরজা একজন সাহসী, স্বাধীনচেতা মেয়ে। তার ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে কিছু অন্ধকার অতীত। বিমানের মধ্যকার সেই  সাংঘাতিক ক্রাইসিসের সময় , মুখে রক্তের ছিটে নিয়ে তাকে ভাবতে দেখা যায় সেই অন্ধকার অধ্যায়ের কথা মনে করতে। 


সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে পণের জন্য এবং ঘরের কাজে তেমন  পারদর্শী না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে স্ত্রীর ওপর অত্যাচার চালাতো তার স্বামী। এমনকি নিরজার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি  এক চিঠিতে স্বামী নিরজাকে লিখেছিল, ‘তুমি কী? সামান্য একটা গ্র্যাজুয়েট ছাড়া আর কিছুই তো নও।’  আর তারপর  নীরজা সেই চিঠি পেয়ে প্যান অ্যাম এয়ারলাইন্সে এয়ারহোস্টেস হওয়ার জন্য আবেদন করে। দশ হাজার আবেদনকারিণীর মধ্যে থেকে ৮০ জন নির্বাচিত হয়। মায়ামিতে  ট্রেনিং শেষে এয়ারহোস্টেস নয়, প্যান অ্যাম তাকে ‘ফ্লাইট পারসার’ পদে নিয়োগ করে। বিমানসেবিকাদের মধ্যে যিনি প্রধান, তিনিই ফ্লাইট পারসার।
 

নিরজা তার কাজকে,  তার দায়িত্বকে খুব ভালোবাসে। তার  মা তার চাকরি নিয়ে খুশি ছিলেন না। সবসময় বলতেন, মডেলিংটাতো ভালই ছিল, বিমানসেবিকার চাকরিটাতো ছেড়ে দিলেই পারিস, কিন্তু নিরজা একটা উত্তরই দেয়,  "আই লাভ মাই জব "। 


নিরজার এমন সহজ সরল, সাধারণ অভিনয়ই মন কেড়েছে দর্শকদের।  আর সে দায়িত্বটা পালন করেছেন নিরজার চরিত্রে 'সোনাম কাপুর'। নিঃসন্দেহে সোনম কাপুর এর বেস্ট অভিনয় ছিল এ সিনেমাতে।  তবে বড় দায়িত্ব তো পালন করেছেন পরিচালক 'রাম মাধানী '। খুব সহজ ও সাবলীল ভাবে তুলে ধরেছেন প্রতিটা দৃশ্য। হোক সেটা বিমানের মধ্যকার সময় অথবা নিরজার ব্যক্তিগত জীবনের দৃশ্যগুলোতে।  তথাকথিত নারীকেন্দ্রিক সিনেমাগুলোর মতো মসলা যোগ করা,  অ্যাকশন দৃশ্য, ভয়হীন দৃঢ় কণ্ঠ এমন কোন বৈশিষ্ট্য দেখা যায় নি। আর সেটাই সবথেকে বেশি সাহায্য করেছে দর্শকদের মন জয় করতে।


সোনাম কাপুর এর পাশাপাশি অন্যান্য প্রধান  চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গেছে  হরিশ ভানোট (নিরজার বাবা) চরিত্রে যোগেন্দ্র টিকু। নিরজার মা রামা ভানোট এর চরিত্রে শাবানা আজমি। সিনেমার শেষ দৃশ্যে নীরজার নামে ট্রাস্ট ঘোষণা করেন মা।  চলচ্চিত্রটি নীরজার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে, যিনি  বীরত্ব, সাহসী কর্ম বা আত্মত্যাগের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান  অশোকচক্রের সাথে মরণোত্তর সম্মান পেয়েছিলেন।