পিরিয়ডের পীড়া

পিরিয়ডের পীড়া
পিরিয়ডের পীড়া
মেয়েরা এমনিতেই একটু ভিতু হয়। এক ফোঁটা রক্ত দেখলেই ভয় পায়। সেখানে আচমকা এত রক্ত নার্ভাস করে দেয়। আর যদি সেটা হয় কম বয়সে, তাহলে তো কথাই নেই। আমাদের সমাজে এই বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকেরা কথা বলেন না। মা, বড়ো বোনরাও অনেক সময় চুপ থাকেন। তাহলে শিশু মেয়েটি বিষয়টি জানবে কীভাবে? একজন তার জীবনের প্রথম পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, “আমাদের স্কুলড্রেস ছিল সাদা। ক্লাস এইটে পড়ি। আমাদের ক্লাস নিচ্ছেন যে শিক্ষক, উনি বেশ কড়া। এক মেয়েকে পড়া ধরেছেন। পড়া বলার জন্য সে কিছুতেই দাঁড়ায় না। শিক্ষক তাকে ধমক দিয়ে দাঁড়াতে বললেন। সে ভয় পেয়ে যেই দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে তার জামার পেছন আর পায়জামা লাল হয়ে গেল। ওর পেছনে যারা বসে তারা চিৎকার করে উঠল সমস্বরে। আর তখন সেই শিক্ষক বুঝতে পারলেন না-দাঁড়ানোর কারণ। পরে এসকর্ট ধাই (বাসা থেকে আনা নেওয়ার জন্য যে ধাই ছিল) মেয়েটিকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসে। সেই স্মৃতি আজও আমাকে মর্মপীড়া দেয়।”

পিরিয়ড নিয়ে বিড়ম্বনাতে পড়েনি, এমন মেয়েমানুষ হয়তো হাতে গুনে বের করা যাবে কিনা বলা মুশকিল। মেয়েদের জীবনের স্বাভাবিক অন্যান্য ঘটনার মতো পিরিয়ডও স্বাভাবিক এক ঘটনা। আমাদের দেশের সামাজিক কিছু কারণে এটি মেয়েদের জন্য কখনো কখনো বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। প্রথম পিরিয়ড নিয়ে অধিকাংশ মেয়েদেরই কোনো না কোনো বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে। আগের দিনে বেশিরভাগ কিশোরী প্রথম পিরিয়ড নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছে। কারণ প্রায় কারোই এই পিরিয়ড সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না। ফলে এক ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। কাউকে পড়তে হয়েছে অনেক লজ্জায়। 
মেয়ে সন্তানের জন্য পিরিয়ড সম্পর্কে জানা ও একটা বয়সের পর মোটামুটি প্রস্তুতি থাকা যে, কতটা প্রয়োজনীয় এটা সব নারীই বোঝেন। তারপরও অস্বস্তি কাটে না অনেক নারীরই। অথচ পিরিয়ড নিয়ে প্রথম যদি মায়ের কাছেই শিক্ষা পায় মেয়েটি, তবে তার জীবন কত সহজ হতে পারে। অন্য আরও অনেক বিষয়েই সে পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করার মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে। রিমঝিম আহমেদ নামের একজন একটা লেখায় লিখেছেন ‘আমার লাল মেয়েবেলা’। পড়ে মনে হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ কিশোরী এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টা পার করে।


ঋতু বা পিরিয়ড একটি অতি স্বাভাবিক ঘটনা। নয় থেকে চৌদ্দ বছর বয়সের মধ্যে এটি হয়ে থাকে। তবে কারও আট-নয় বছর বয়সেও হতে পারে। তাদের কোনো মানসিক প্রস্তুতি হওয়ার আগেই শুরু হওয়া বিষয়টি হয় বড়ো বিড়ম্বনার। পিরিয়ড না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। প্রথম পিরিয়ড হলে একটা মেয়ে আতঙ্কিত হয়। মেয়েরা এমনিতেই একটু ভিতু হয়। এক ফোঁটা রক্ত দেখলেই ভয় পায়। সেখানে আচমকা এত রক্ত নার্ভাস করে দেয়। আর যদি সেটা হয় কম বয়সে, তাহলে তো কথাই নেই। আমাদের সমাজে এই বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকেরা কথা বলেন না। মা, বড়ো বোনরাও অনেক সময় চুপ থাকেন। তাহলে শিশু মেয়েটি বিষয়টি জানবে কীভাবে?
একজন তার জীবনের প্রথম পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, “আমাদের স্কুলড্রেস ছিল সাদা। ক্লাস এইটে পড়ি। আমাদের ক্লাস নিচ্ছেন যে শিক্ষক, উনি বেশ কড়া। এক মেয়েকে পড়া ধরেছেন। পড়া বলার জন্য সে কিছুতেই দাঁড়ায় না। শিক্ষক তাকে ধমক দিয়ে দাঁড়াতে বললেন। সে ভয় পেয়ে যেই দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে তার জামার পেছন আর পায়জামা লাল হয়ে গেল। ওর পেছনে যারা বসে তারা চিৎকার করে উঠল সমস্বরে। আর তখন সেই শিক্ষক বুঝতে পারলেন না-দাঁড়ানোর কারণ। পরে এসকর্ট ধাই (বাসা থেকে আনা নেওয়ার জন্য যে ধাই ছিল) মেয়েটিকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসে। সেই স্মৃতি আজও আমাকে মর্মপীড়া দেয়।” 
রোজার সময় পিরিয়ড নিয়ে নারীদের অস্বস্তির শেষ নেই। ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী নারীদের পিরিয়ড-ঋতুস্রাব বা মাসিক চলাকালে রোজা রাখতে হয় না। সে ক্ষেত্রে দিনের বেলায় খাওয়া-দাওয়া নিয়ে ভীষণ বিড়ম্বনা পোহাতে হয় তাদের, বিশেষ করে কোনো কিছু খাওয়ার সময় পরিবারের পুরুষ সদস্যরা যখন তাকিয়ে থাকেন। 
পিরিয়ড বিষয়ে নারীদের মধ্যে বিভিন্ন কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতার কারণে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতসহ ঘরে বাইরে প্রতিনিয়তই নারীরা সম্মুখীন হচ্ছে বিড়ম্বনার।
বেসরকারি এক সংস্থার একটি জরিপে দেখা গেছে, পিরিয়ডকালীন পরিচ্ছন্নতার অভাবে দেশের ৯৭ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময়ে সার্ভিক্যাল ইনফেকশনের সমস্যায় ভোগে। পিরিয়ডজনিত জটিলতার কারণে প্রতিমাসে গড়ে ছয়দিনে কাজে অনুপস্থিত থাকে গার্মেন্টেসে কর্মরত নারীরা। 
পিরিয়ড নিয়ে নারীরা নানাধরনের ব্যঙ্গ, হাস্যরসাত্মক ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। এ বাস্তব উদাহরণগুলো অহরহ আমাদের চোখে পড়ে। এর পেছনে যেমন সমাজের অবস্থা দায়ী, এর পাশাপাশি দায়ী শিক্ষাক্ষেত্রে পিরিয়ডসংক্রান্ত সঠিক তথ্যগুলো বইয়ের অন্তর্ভুক্ত না করা।
এখন পর্যন্ত নারীরা দোকানে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে সংকোচবোধ করেন। তাই চক্ষুলজ্জার কারণে অনেকেই নিজে দোকানে গিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে চায় না। কোনো নারী দোকানে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে গেলে দোকানদার তার দিকে আড়চোখে তাকায় না, এমন ঘটনা খ্বু কম।
পিরিয়ড নিয়ে আমরা সকলে মুক্তভাবে আলোচনা করতে পারছি না বলেই, আজও আমরা নানাধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি, সংকোচে ভুগছি, চক্ষুলজ্জাকে মেনে নিচ্ছি। কিন্তু পিরিয়ড কোনো সঙ্কোচের বিষয় না, পিরিয়ড একটা নারীর জীবনের স্বাভাবিক বিষয়, বলা যায়, পিরিয়ড না হওয়াই চিন্তার বিষয়। মেয়েদের মাতৃত্বজনিত কারণে এটি মেয়েদের স্বাভাবিক জীবনের অংশ আর তাই পিরিয়ডের মতো জরুরি বিষয় নিয়ে লজ্জা, ট্যাবু না রেখে সন্তানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে হবে।