কোথায় যাচ্ছি আমরা?

কোথায় যাচ্ছি আমরা?
আলাওলের ‘পদ্মাবতী’তে রাজকন্যার জন্মলাভ হলে সাতদিন ধরে আনন্দোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এদিকে, আধুনিক সাহিত্যেও নারীদের অবদানকে নানাভাবে ছোটো করে দেখার প্রবণতা এখনো দূর হয়নি। এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে অনন্যার চলতি সংখ্যার ‘জেন্ডারভিত্তিক ন্যারেটিভ : গদ্যে নারী-পুরুষ’ প্রবন্ধে।

কী এক বিস্ময়কর উর্বর পলিমাটির এই দেশ! কত সহজেই না সোনার ফসল ফলে আমাদের উর্বর মাটিতে। কিন্তু আমাদের মেধার ফলন কেন এত খারাপ হয় এই মাটিতে? দেখা গেছে, দেশের বাইরে যখন কোনো মেধাবী পা রাখেন, তখন সেখানে প্রায়শই অর্জন করেন অভূতপূর্ব সাফল্য। বিদেশের মাটিতে বিজ্ঞান, রাজনীতি, উদ্যোক্তা-সবক্ষেত্রেই আমাদের সাফল্যের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এক্ষেত্রে রেখে চলেছেন ঈর্ষণীয় অবদান। এর উদাহরণের শেষ নেই। এমনকী নাসার মতো প্রতিষ্ঠানেও বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মাহমুদা সুলতানা জিতে নিয়েছেন নাসার সেরা উদ্ভাবন পুরস্কার। ব্রিটিশ রাজনীতিতে বাংলাদেশি নারী রাজনীতিকদের রয়েছে সুগভীর প্রভাব। 


কিন্তু সমস্যা বাধে দেশের ভেতরে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার থেকে শুরু করে বৃহৎ কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতায়নের জায়গায় নারীরা অর্জন করেছেন সমীহযোগ্য গুরুদায়িত্ব। কিন্তু নারীর ক্ষমতায়নের সার্বিক পরিসংখ্যান অন্য কথা বলে। বাংলাদেশে সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদের সংখ্যা প্রায় ১১ লক্ষ। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৮৩ হাজারের কাছাকাছি। শতকরা হিসেবে মাত্র ৭.৬ ভাগ। উপসচিব পদ থেকে সচিব পদ পর্যন্ত নারীদের সংখ্যা মাত্র ১ শতাংশ বা তারও কম। অথচ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প ও কৃষিখাতে নারীর ভূমিকা ব্যাপক। তৈরি পোশাক খাতের মোট জনশক্তির ৮০ ভাগই নারী।  


এই আধুনিক যুগে এসেও বেশিরভাগ বাবা-মায়ের নিকট কন্যাসন্তান আকাক্সিক্ষত নয়। সাহিত্যকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যেও দেখা যায় সেসময় কন্যাসন্তানের জন্ম অনাকাক্সিক্ষত ছিল না। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চ-ীমঙ্গল (ষোড়শ শতাব্দী), দ্বিজ মাধবের মঙ্গলচ-ীর গীত (ষোড়শ শতাব্দী), আলাওলের পদ্মাবতী (সপ্তদশ শতাব্দী) কাব্যে কন্যার জন্মের কথা আছে; কিন্তু তার কোথাও নিরানন্দের হাহাকার নেই। আলাওলের ‘পদ্মাবতী’তে রাজকন্যার জন্মলাভ হলে সাতদিন ধরে আনন্দোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এদিকে, আধুনিক সাহিত্যেও নারীদের অবদানকে নানাভাবে ছোটো করে দেখার প্রবণতা এখনো দূর হয়নি। এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে অনন্যার চলতি সংখ্যার ‘জেন্ডারভিত্তিক ন্যারেটিভ : গদ্যে নারী-পুরুষ’ প্রবন্ধে।


এক অস্থির-অসহিষ্ণু পাথর-সময়ে বসবাস করছি আমরা। সেই কোন যুগে কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বলে গেছেন, ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে/কে বাঁচিতে চায়/দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে/কে পরিবে পায়’। আমরা বাক-স্বাধীনতার কথা বলি, ভিন্নমত সহিষ্ণুতার কথা বলি। কিন্তু এসব যেন আমাদের সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বুয়েটে আবরারের হত্যাকা-ের নৃশংসতা যেন আমাদের বাকরুদ্ধ করে দেয়। মনে রাখতে হবে, একটি নৃশংসতা আরো দশটি নৃশংসতাকে উস্কে দেয়। এটা অনেক বড়ো অশনি সংকেত। 
ফিরে আসুক ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা। শুভ কামনা রইল।