আত্মহত্যার শেষ কোথায়?

আত্মহত্যার শেষ কোথায়?
আত্মহত্যার শেষ কোথায়?
আত্মহত্যার বেদনাদায়ক প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির জীবননাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট ঘনিষ্ঠজন, পরিবার ও সমাজে এক ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে আনে। তাই একমাত্র কার্যকর উপায় হল আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা। আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সকলকেই।

আত্মহত্যা বলতে বোঝায় নিজেই নিজেকে হত্যা করা। স্বেচ্ছায় কোন ব্যক্তির নিজের প্রাণনাশ করা হল আত্মহত্যা। এটি মূলত একটি ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে প্রতি বছর সারা বিশ্বে যে সব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যা ১৩ তম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। 


আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘সেইডেয়ার’ থেকে, যার অর্থ ‘নিজেকে হত্যা করা’।  কেউ আত্মহত্যা করে ফেললে সেখান থেকে ফিরে আসার আর কোন পথ থাকে না। বিশ্বের অনেক দেশেই আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে এক ধরনের অপরাধরূপে ঘোষণা করা হয়েছে। তারপরও দিন দিন এই আত্মহত্যার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর তথ্য মতে, প্রতি বছর সারা বিশ্বে যে সব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যা ১৩তম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে আট লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। অর্থাৎ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একজন মানুষ আত্মহত্যা করেন এবং অগণিত মানুষ আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশেও আত্মহত্যার সংখ্যা কম নয়। 


বাংলাদেশে প্রতিবছর লাখে ১২৮.০৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সারাদেশে আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা ১১ হাজার ৯৫ জন। ওই বছর গড়ে প্রতিদিন আত্মহত্যা করেছেন ৩০ জন। আর এই আত্মহত্যার হার শহরের চেয়ে গ্রামে ১৭ গুণ বেশি। এদের মধ্যে বিষ গ্রহণের মাধ্যমে আত্মহত্যা করেছেন তিন হাজার ৪৬৭ জন, গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ৫৬৭ জন, শরীরে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ৫৯ জন। এক জরিপ অনুযায়ী, সারাবিশ্বে আত্মহত্যায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম। ২০১১ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৩৪তম।  


বাংলাদেশে তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ প্রায় সব ধরণের, সব বয়সের মানুষেরাই আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। কিন্তু এই আত্মহত্যার শেষ কোথায়?


এর শেষ খোঁজার আগে শুরুটা খুঁজতে হবে। নানা গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যাকারীদের ৯০ শতাংশেরই কোন না কোন ধরনের মানসিক রোগের সমস্যা ছিল। এর মধ্যে ডিপ্রেশন, স্কিটজোফ্রিনিয়া নামের জটিল মানসিক রোগসহ মাদকাসক্তি ও অ্যালকোহলে আসক্তি, ব্যক্তিত্বের সমস্যা, মৃগী রোগের মতো শারীরিক কারণে মানসিক সমস্যা ইত্যাদি অন্যতম। প্রায় ২৭% থেকে ৯০% এরও বেশি সময় আত্মহত্যার সাথে মানসিক অসুখের সম্পর্ক থাকে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিষণ্ণতার হার ৪.৬ শতাংশ। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের মধ্যে মানসিক রোগ দ্বিগুণ এবং বিষণ্ণতার হার আগের তুলনায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।


কিন্তু এই ডিপ্রেশন ও বিষণ্ণতার কারণ কি? একাকীত্ব, দ্বিধান্বিত সম্পর্ক, পারিবারিক চাপ, পারিবারিক সুসম্পর্কের অভাব, আর্থিক সমস্যা, কটু কথা, চাকরি না পাওয়া থেকে ডিপ্রেশনের সৃষ্টি হতে পারে। আমাদের দেশে আত্মহত্যার অন্যতম একটি কারণ হল পারিবারিক চাপ। আসলে আমাদের দেশের গুরুজনরা ছোটদের ওপর নিজের আধিপত্য রাখতে খুব পছন্দ করেন। তাই পড়ালেখা হোক বা চাকরি হোক বা বিয়ে, পরিবারের সম্পূর্ণ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ না হলে তাকে শুনতে হয় বিভিন্ন কথা। দেয়া হয় পারিবারিক চাপ। এই পারিবারিক চাপ থেকেও ডিপ্রেশনের মাত্রা অনেক বাড়ে। 


এই ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা থেকে রেহাই পেতে হলে এগিয়ে আসতে হবে পরিবারকে, সমাজকে ও ব্যক্তি নিজেকে। বাবা-মাকে ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে সময় দিতে হবে। বিনয়ী হতে শেখাতে হবে। শুধু জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দিয়ে তার পেছনে সন্তানকে ছুটতে বললে হবে না, কোথায় লাগাম দিতে হবে সেটা তাকে জানানোটাও জরুরি। আপনার আশেপাশে হাসিখুশি মানুষগুলো হয়ত প্রচণ্ড ডিপ্রেশনে ভুগছে, তার মনের ভিতরের সেই ডিপ্রেশন খুঁজে পজিটিভ হাইপ দিয়ে তাকে সঠিক রাস্তা দেখানোটাই সাফল্য, আর এটাই একমাত্র সমাধান। বিভিন্ন ধর্মেও আত্মহত্যাকে মহাপাপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।


আত্মহত্যার বেদনাদায়ক প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির জীবননাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট ঘনিষ্ঠজন, পরিবার ও সমাজে এক ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে আনে। তাই একমাত্র কার্যকর উপায় হল আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা। আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সকলকেই।