'অফিসিয়াল সিক্রেটস' আইন আদৌ কি প্রযোজ্য?   

'অফিসিয়াল সিক্রেটস' আইন আদৌ কি প্রযোজ্য?   
'অফিসিয়াল সিক্রেটস' আইন আদৌ কি প্রযোজ্য?   
সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টের ৩ ও ৫ ধারায় মামলা হয়েছে। যেখানে ধারা ৩ অনুযায়ী , নিষিদ্ধ স্থানে প্রবেশ করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও রাষ্ট্রের শত্রুপক্ষকে সহায়তার কথা উল্লেখ আছে এবং ধারা ৫ অনুযায়ী উল্লেখ আছে বিদেশি শক্তির কাছে রাষ্ট্রের গোপন তথ্য পাচারের বিষয়।

বাংলাদেশের স্বনামধন্য পত্রিকা প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি কক্ষে   প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা করার পর পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয় এবং সর্বশেষ অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা দায়ের করা হয়। যে মামলায় বর্তমানে তিনি কারাগারে বন্দী আছেন।


সরকারি গোপনীয় দলিল চুরি এবং তার ধারা বহির্বিশ্বের সাথে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নষ্ট করার অপচেষ্টার অভিযোগ আনা হয় রোজিনা ইসলামের উপর। এ অভিযোগের ভিত্তিতে  দণ্ডবিধির ৩৭৯ ও ৪১১ ধারা এবং অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টের ৩ ও ৫ ধারায় মামলা হয়েছে  এই সংবাদকর্মীর বিরুদ্ধে।  


'অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট' আইন মূলত কি? 


অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট মূলত  ব্রিটিশ শাসনামলে প্রণয়ন করা একটি আইন। এই আইন প্রণয়ন এর সময়কাল ১৮৯৯ সাল থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত।  এ সময়টাতে লর্ড কার্জন ভারতবর্ষের ভাইসরয় ছিলেন এবং সে সময়টাতেই এ আইন প্রণয়ন করা হয়।

 

কি  আছে এ আইনে? 


এই আইনটির মূলত দুটি দিক রয়েছে। যার মধ্যে প্রথমটি হল গুপ্তচরবৃত্তি এবং দ্বিতীয়টি হল সরকারের গোপন নথি ফাঁস।  


আইনে বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ কোন এলাকায় প্রবেশ করে এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করে যাতে করে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে আঘাত আসতে পারে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে তাহলে তার শাস্তি হবে। এছাড়াও যদি কেউ সরকারের গোপন নথি ফাঁস করে এবং তা পাচারের চেষ্টা করে তবে আইন অনুসারে তার শাস্তির বিধান রয়েছে।

 
আর এক্ষেত্রে গোপন নথি বলতে বোঝানো হয়েছে অফিসিয়াল কোড, পাসওয়ার্ড, স্কেচ, নকশা, প্ল্যান, বিভিন্ন ধরণের নথি। আর এই আইনের অধীনে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড অথবা ১৪ বছর পর্যন্ত সাজা । আর সর্বনিম্ন তিন বছরের সাজার বিধান রয়েছে।

 

সাংবাদিক রোজিনা গ্রেপ্তার এবং অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট 


সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টের ৩ ও ৫ ধারায় মামলা হয়েছে। যেখানে ধারা ৩ অনুযায়ী , নিষিদ্ধ স্থানে প্রবেশ করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও রাষ্ট্রের শত্রুপক্ষকে সহায়তার কথা উল্লেখ আছে এবং ধারা ৫ অনুযায়ী উল্লেখ আছে বিদেশি শক্তির কাছে রাষ্ট্রের গোপন তথ্য পাচারের বিষয়।


কিন্তু গত সোমবার  সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম  সচিবালয়ে গিয়েছিলেন পেশাগত দায়িত্ব পালনের খাতিরে। তাই তার বিরুদ্ধে ৩ ও ৫ ধারায় অভিযোগ আনা কতটা যুক্তিযুক্ত সে প্রশ্ন বিজ্ঞ সমাজের। আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ আইনের কোথাও লেখা নেই, সরকারি গোপন নথি সংবাদপত্রে প্রকাশ করা যাবে না।


কিন্তু অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতায় গোপন ভাবে তথ্য সংগ্রহ এর ভিত্তি বলা চলে।  দুর্নীতি এবং অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ এবং তা জনসাধারণের জন্য তুলে ধরা সাংবাদিকদের অধিকার।  তবে কেন এমন আইনে ধরাশায়ী হতে হচ্ছে একজন সৎ নিষ্ঠাবান নারী সাংবাদিককে। 


অন্যদিকে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ আইন অনুসারে জনগণের স্বার্থে দুর্নীতি অনিয়মের তথ্য প্রকাশে কোন বাঁধা নেই। সেই আইনে তথ্য প্রকাশকারীকে নিরাপত্তা ও পুরস্কৃত করার কথা বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, গ্রেপ্তারের আগে সচিবালয়ের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আটকে রেখে হেনস্তা করার ঘটনায় জনস্বার্থ তথ্য প্রকাশকারী হিসেবে নিরাপত্তা পাওয়া ছিল তার শতভাগ অধিকার।  

 

কিন্তু না এসব আইন অনুসারে কোন পুরস্কার তো দূরে থাক, সাধারণ নিরাপত্তাটুকুও পাননি তিনি। শিকার হয়েছেন নির্মম অত্যাচারের এবং গ্রেপ্তার হয়ে রাত কাটাচ্ছেন কারাগারে যা স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে এক বিরল নজির বলা চলে।  স্বাধীনতার ৫০ বছরেও অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট নামক এ আইনে একজন সাংবাদিক গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা একদমই নতুন। তাইতো সকলের প্রশ্ন, রোজিনা ইসলাম গ্রেপ্তারে  'অফিসিয়াল সিক্রেটস' আইন আদৌ কি প্রযোজ্য ?