আইন অঙ্গনে নারীদের কথা

আইন অঙ্গনে নারীদের কথা
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন মতে, ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেই মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডের বিধানও রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্মানহানির কারণে ধর্ষণের অভিযোগে আইনের দ্বারস্থ হয়না। এর ফলে দিন দিন ধর্ষণের মাত্রা আরো বেড়েই চলেছে বাংলাদেশে।

আমাদের আশেপাশে অনেক নারীই নির্যাতনের শিকার। সাম্প্রতিক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী স্ত্রী নির্যাতনের হারে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ। আমাদের দেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৫০ শতাংশ নারীই জীবনে কখনো না কখনো সঙ্গীর হাতে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কেবল নির্যাতন নয়, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, যৌন হয়রানি, যৌতুকের কারণে নির্যাতন ও বিভিন্ন সামাজিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে নারীরা। ঘরের বাইরে রাস্তাঘাটে, যানবাহনে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবখানেই লাঞ্ছিত হচ্ছে নারীরা। বলতে গেলে সবখানেই নারীরা এখন নিরাপত্তাহীন।


বাংলাদেশে নারী নির্যাতনকারীর শাস্তির বিধান রয়েছে। চাইলে নারীরা আইনের সহায়তা নিতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে আইনি প্রক্রিয়া দুর্বল হওয়ায় অধিকাংশ নারীই আইনের দ্বারস্থ হয়না। মুখ বুজে সয়ে যায় নির্যাতন। আবার আমাদের এখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্যাতনের শিকার হলেও নারীকেই দেখা হয় দোষী রূপে। ব্যুরো অফ ষ্ট্যাটিসটিকসের এক জরীপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৭২ শতাংশ নারী পারিবারেই স্বামীর নির্যাতন সহ নানা ধরনের নিগ্রহের শিকার হয়ে নিরাপত্তাহীন জীবন যাপন করেন। কিন্তু মোটে দুই শতাংশ নারী আইনের দ্বারস্থ হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র এ ধরনের নারীদের আইনি সহায়তা দেয়।

 


ধর্ষণ


বর্তমানে ধর্ষণ বাংলাদেশের একটি অতি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমরা অনেকেই ধর্ষণের প্রকৃত আইন সম্পর্কে অবগত নই। কখন শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলেও কি সেটা ধর্ষণ বলে বিবেচিত হবে সেই সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা নেই। ধর্ষণের ভুল ব্যাখ্যার কারণে এই অপরাধের মাত্রা আরো বেড়ে গিয়েছে। আবার বাংলাদেশে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন বিরোধী কঠোর আইন থাকলেও এ নিয়ে বিভ্রান্তিও কম নেই।

 


ধর্ষণ নিয়ে আইন কি বলে


বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী হয়েছে ১৬ বা তার কম বছর বয়সী ছেলে ও মেয়ে শিশু হিসেবে ধরা হয়েছে। ফলে যদি কোন পুরুষ ১৬ বছরের কম বয়সের কোন নারীর সাথে তার সম্মতি নিয়েও শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, সেটা ধর্ষণ বলে বিবেচিত হবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী। আর সম্মতি ছাড়া হলে তো সেটা অবশ্যই ধর্ষণ। সেটা বয়স নির্বিশেষে ধর্ষণ।
যদি প্রতারণামূলক ভাবে সম্মতি আদায় করে যৌন সম্পর্ক করা হয়, তাহলে সেটা ধর্ষণ হিসেবে দেখা হবে। এক্ষেত্রে কোন অবিবাহিত নারী আদালতে যদি বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে, এমন অভিযোগ আনতে পারেন তাহলে সেটা ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করবে বাংলাদেশের আদালত।


ম্যারিটাল রেপ: বিয়ের পর স্ত্রীর সম্মতি ছাড়াই জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করাও ধর্ষণ এর মধ্যে পড়ে। এটিকে বলা হয় ম্যারিটাল রেপ। বাংলাদেশের আইনে এমন অপরাধের উল্লেখ নেই। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, বিবাহিত স্ত্রীর সাথে তার অনিচ্ছায় বা জোরপূর্ব শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলেও সেটা যৌন সহিংসতা বা যৌন অপরাধ বা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে না। তবে পৃথিবীর কোন কোন দেশে ম্যারিটাল রেপ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত এবং শাস্তিযোগ্য।

 

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন মতে, ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেই মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডের বিধানও রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্মানহানির কারণে ধর্ষণের অভিযোগে আইনের দ্বারস্থ হয়না। এর ফলে দিন দিন ধর্ষণের মাত্রা আরো বেড়েই চলেছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে শহরে চলাচলেই সবচেয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন নারীরা। তবে গ্রামেও এ হার কম নয়।


নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এ নারীর সকল অধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি নারী নির্যাতনকারীর শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু তারপরও নারীরা দেশে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নারীর প্রতি এ সহিংসতা বাড়ার পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে নির্যাতনকারীর শাস্তি না হওয়া। নারী নির্যাতন-সংক্রান্ত কোন মামলা হলে তা বছরের পর বছর পড়ে থাকে। যেখানে ১০০ দিনের মধ্যে বিচার হওয়ার কথা, সেখানে দেখা যায় পাঁচ থেকে দশ বছর লেগে যাচ্ছে। মামলা হলেও বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে সহিংসতার ঘটনা ঘটার সুযোগ পাচ্ছে।

 

কেবল আইনই নয় নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বৃদ্ধি করতে হবে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। সামাজিক সচেতনতার এই শিক্ষার শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। তবেই দেশে নারীর প্রতি এসব সহিংসতা রোধ করা সম্ভব হবে।