প্রেমিকার জন্য সতেরো বছর চিলেকোঠায় বন্দী!

প্রেমিকার জন্য সতেরো বছর চিলেকোঠায় বন্দী!
প্রেমিকার জন্য সতেরো বছর চিলেকোঠায় বন্দী!
প্রায়শই তিনি চিলেকোঠা থেকে অদ্ভুত সব শব্দ শুনতে পেতেন, এমনকি রাতের বেলা তার বেডরুমের বাইরে অদ্ভুত ছায়াও দেখতে পেতেন। এসব ভূতুড়ে ঘটনা ভেবে সে বছর তিনি লসএন্জেলেসে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ডলিও তার স্বামীর সাথে যেতে রাজি হয়ে যায়, কিন্তু সাথে একটি শর্ত জুড়ে দেয়। তার শর্ত ছিল নতুন বাসায় ও চিলেকোঠা থাকতে হবে।

প্রেম ভালোবাসার জন্য যুগে যুগে মানুষ তৈরি করেছেন একের পর এক ইতিহাস। যেকোন কঠিন অগ্নিপরীক্ষাও যেন ফিকে হয়ে যায় ভালোবাসার রঙের কাছে। প্রেমিকার জন্য আত্মহনন, যুদ্ধ, রক্তপাত এমন অনেক প্রেমের গল্প আমাদের সকলেরই জানা। কিন্তু প্রেমিকার জন্য দীর্ঘ ১৭ বছর চিলেকোঠায় বন্দী থাকা নেহাত মুখের কথা নয়। 


শুনতে অবাক লাগলেও উনবিংশ শতাব্দীর দিকে এমনটাই ঘটেছিলো জার্মানীতে। যেখানে ডলি ওষ্টেরিজ নামে এক ভদ্রমহিলা তার স্বামীকে ফাঁকি দিয়ে তার প্রেমিককে নিজ বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছিল প্রায় ১৭ বছর ধরে। এর শেষটা অবশ্য ছিল অনেকটা ভয়ংকর৷ তবে চলুন শুরু থেকেই শুরু করা যাক। 

 


১৮৮০ সালে জার্মানির একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ডলি ওষ্টেরিজ।  কিন্তু ২০ বছর বয়সে একজন ধনী টেক্সটাইল ফ্যাক্টরীর মালিক ফ্রেড বিলিয়াম অষ্টেরিজের সাথে বিয়ে হয় ডলির। কিন্তু এতো প্রাচুর্যের পরেও ডলি তার বিবাহিত জীবনে সুখী ছিলেন না। কারণ তার স্বামী অনেক বেশি মদ্যপান করতেন। তাই ডলি তার দাম্পত্য জীবনে আশানুরূপ সুখ পান নি কখনোই।


কিন্তু ১৯১৩ সালে ডলির জীবনে হঠাৎই আসে নতুন মোড়। যেন সব কিছু পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া শুরু করে এক নিমিষেই। একদিন শরতের সকালে ডলি তার স্বামীকে বলে তার সেলাই মেশিন ঠিক করার জন্য কারখানার একজন মেরামতকারীকে বাসায় পাঠাতে। যেমন বলা তেমন তার কাজ, ফ্রেড তার ১৭ বছর বয়সী একজন কর্মচারীকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। আর সেই কর্মচারীর নাম ছিল অট্রোস সানহুবার।

 


সানহুবার ঠিক সময়ে পৌঁছে যায় তার বাসায়। সে যখন দরজায় কড়া নাড়ে তখন ৩৩ বছর বয়সী ডলি একটি সিল্কের পোশাক পরে দরজা খুলে দেন। আর সেদিন থেকেই তাদের সম্পর্ক শুরু হয়। প্রথমদিকে ডলি ও সানহুবার হোটেলে দেখা করতেন কিন্তু এভাবে দেখা করলে সমস্যা হতে পারে ভেবে তারা বেশ সাবধান হয়ে যান, এবং সিদ্ধান্ত নেন অষ্টেরিস এর বাসায় তারা শারীরিক সম্পর্ক করবেন।


তবে ১৯১৩ সালে আমেরিকা আজকের মতো ছিল না। তাইতো ডলির প্রতিবেশীরা তাদের দুজনকে খুব সন্দেহের চোখে দেখতো। আর এই ব্যাপারটি তার প্রতিবেশীরা তার স্বামীকে জানিয়েও দিয়েছিল। তাই এ সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য ডলি সানহুবারকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলেন, আর তাকে তাদের চিলেকোঠায় রাখার পরিকল্পনা করেন। এতে তাদের দেখা করতেও যেমন সুবিধা হবে তেমনি ডলির স্বামী কখনোই তাদের চিলেকোঠায় যেত না, তাই ধরা পারারও ভয় ছিল না।


সানহুবার অস্টেরিজের চিলেকোঠায় পাঁচ বছর ধরে এভাবেই ছিল, আর ডলির সাথে নিয়মিত যৌন সম্পর্কে লিপ্ত ছিল। এদিকে ফ্রেডেরও সন্দেহ হতে থাকে, কেননা প্রায়শই তিনি চিলেকোঠা থেকে অদ্ভুত সব শব্দ শুনতে পেতেন, এমনকি রাতের বেলা তার বেডরুমের বাইরে অদ্ভুত ছায়াও দেখতে পেতেন। এসব ভূতুড়ে ঘটনা ভেবে সে বছর তিনি লসএন্জেলেসে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ডলিও তার স্বামীর সাথে যেতে রাজি হয়ে যায়, কিন্তু সাথে একটি শর্ত জুড়ে দেয়। তার শর্ত ছিল নতুন বাসায় ও চিলেকোঠা থাকতে হবে।


এদিকে ডলি সানহুবারকে আগেই সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তারা নতুন বাসায় ওঠার আগেই সানহুবার সেখানে থাকা শুরু করে দেয়। লসএন্জেলেসে যাওয়ার পর তাদের বিবাহিত জীবন আরো খারাপ হতে শুরু করে, কারণ ফ্রেড আগের চেয়েও বেশি মদ্যপান শুরু করে, এমনকি তার ব্যাবহারও দিনকে দিন হিংস্র হতে শুরু করে। এরপর ২২এ আগষ্ট ১৯২২ সালে তাদের মধ্যে প্রচুর ঝগড়া হয়। তাদের দুজনের মধ্যে এতটাই তর্ক শুরু হয়েছিল যে ডলির প্রাণনাশের আশঙ্কায় সানহুবার ফ্রেডের রাইফেল নিয়ে চিলেকোঠা থেকে নিচে দৌড়ে যান, এবং সরাসরি ফ্রেডের বক্ষে তিন রাউন্ড গুলি ছুড়ে দেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মারা যান। 

 


আর এই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ডলি ও সানহুবার একটি গল্প সাজায়। ডলি সানহুবারকে বলে তাকে ঘরে আটকে রাখতে, এতে করে সবাই ভাববে কেউ তাদের বাড়িতে এসে ফ্রেডকে মেরে ফেলেছে, আর ডলিকে রুমে লক করে রেখে গিয়েছে। সানহুবার ডলির কথামতোই সব কাজ করে। ফ্রেডের হাত থেকে ডায়মন্ডের ঘড়ি আর রাইফেলটি নিয়ে চলে যায় চিলেকোঠায়।


সানহুবার যখন চিলেকোঠায় নিরাপদে পৌঁছে যায়, ডলি তখন ইচ্ছে করে জোরে জোরে চিৎকার করতে থাকে। তাদের বাসা থেকে এমন চিৎকারের শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে ডলিকে উদ্ধার করে। পুলিশ বা তার প্রতিবেশীরা কেউই ডলিকে সন্দেহ করেনি, কারণ সে তো বন্দী অবস্থাতেই ছিল। তাই পুলিশ খুনিকে খোঁজা শুরু করে। এতে করে ডলির কপাল খুলে যায়, কেননা সে তার স্বামীর মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি পেয়ে যায়। এবার এদিকে সানহুবারকে তার চিলেকোঠায় লুকিয়ে থাকতে হবে না সে ডলির সাথেই থাকতে পারবে। কিন্তু কিছুদিন পর ডলি তার আইনজীবী হার্মান শর্পেরুর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়,আর সেই মূহুর্তে ডলি এক মারাত্মক ভুল করে বসেন।  তিনি হার্মোনকে তার স্বামীর হীরার ঘড়িটি দেখায়, ডলি তাকে বলে ঘড়িটি সে গদির নিচে পেয়েছে তাই পুলিশকে বলার দরকার নেই। 


এরপর ১৯২৩ সালে ডলি আবারও আরেকজনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। তার নাম ছিল ক্লাম্প। ডলি তাকেও সে খুনের সব কথাগুলো খুলে বলে। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই তাদের খুব খারাপভাবে ব্রেকআপ হয়ে যায়। এরপরে পুলিশ ফ্রেডের ঘড়ির কথা জানতে পেরে যায়। যার জন্য পুলিশ ডলিকে গ্রেফতার করে নেন। কিন্তু তারা কিছুতেই মেলাতে পারছিল না ডলি কিভাবে একা একা নিজেকে রুমে আটকাতে পারে, পুলিশ রাইফেলের কথা জিঙ্গেস করলে ডলি রাইফেলের কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে তাই তারা আবারো ডলিকে ছেড়ে দেন।

 


কিন্তু সেই সময় ডলি আরেকটি ভুল করে বসে সে হার্মানকে সানহুবারের রুম থেকে খাবার আনতে পাঠায়। যখন হার্মান সানহুবারের রুমে যায় তখন সানহুবার তাকে দেখে খুব খুশি হয়েছিল কারণ সে বহুবছর ধরে এই চিলেকোঠায় আছে, দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে অন্য কোন মানুষের সাথে তার কথা হয়নি। কিন্তু হার্মান সানহুবারকে দেখা মাত্রই তাকে চিলেকোঠা থেকে লাথি দিয়ে ফেলে দেয়। এতে  সানহুবার ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে কানাডা চলে যায়।


আর এদিকে ১৯৩০ সালে হার্মান আর ডলির সম্পর্ক খারাপের দিকে যেতেই থাকে, এবং তাদেরও ব্রেকাপ হয়ে যায়। আর তখনই হার্মান পুলিশকে সব কথা খুলে বলে দেয়,এবং কাকতালীয়ভাবে সানহুবার সেই সময় লজ এন্জেলেসে ফিরে এসেছিল। তখনই তার কাছ থেকে রাইফেল উদ্ধার করে পুলিশ। তখন ডলি ও সানহুবারকে গ্রেফতার করা হয়। 


পহেলা জুলাই সানহুবার খুনের জন্য দোষী প্রমাণ হয়েছিল। তবে এই ধরনের অপরাধের সীমাবদ্ধতার বিধি ছিল সাত বছর। সানহুবার প্রেমিকার জন্য ১৭ বছর চিলেকোঠায় বন্দী ছিল ঠিকই, কিন্তু আজও বেশিরভাগ মানুষ তাদেরকে অপরাধী হিসেবেই দেখেন।